উপন্যাস

সোনার বাড়ি জমি (পঞ্চম পর্ব)

সরোজ দরবার Aug 14, 2021 at 4:15 am উপন্যাস

ধারাবাহিক উপন্যাস

******************************

আগের কথাএত দুঃখ কষ্ট, অভাব, না পাওয়া, এত কিছুর মধ্যেও মানুষ কী চায়? শেষমেশ বাঁচতে চায়, বেঁচে থাকতে চায়। কথাটা ভারী সহজ, আবার ভারী কঠিনও। এই সহজ কথাখানা আবার বড় মানুষেরা খুব ভালো করে জানে। তারা নানাভাবে মানুষের এই সহজ বেঁচে থাকাটাকেই বানচাল করে দিতে চায়। সোনাপুর গাঁয়েও ঢুকে পড়েছে এমন সব মানুষেরা। আবার সেমিমার বাবা কিংবা বরুণের পিসিমার মতোও কেউ কেউ তো রয়ে গেছেন। দড়ি টানাটানি খেলায় এবার টান পড়বে কোনদিকে? 

******************************


[আট]

জলখাবারের ডাক নিয়ে বরুণ এসে কাঁধে হাত রাখাতে, সেমিমা এতটাই অন্যমনস্ক ছিল, যে, হঠাৎ খুব ভয় পেয়ে, সে বরুণের মুখের দিকে এক লহমা তাকিয়ে, তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল। 

সেই মুহূর্তে বরুণের ভালো লাগল খুব। এমন একটা ভালো লাগা, যা সে বলে বোঝাতে পারবে না। সেমিমার শরীরের উষ্ণতা সে এই প্রথমবার টের পাচ্ছে এমন তো নয়। কবুতরি নরম ওমে আগেও সে গলে গলে ফিয়েছে। আগেও তাদের একান্ত মুহূর্তগুলোয় পাতার উপর জলের মতো টলটলে হয়ে বরুণের গায়ে লেগে থেকেছে সেমিমা। সময় গড়িয়ে গেলে কখন যেন একসময় টুপ করে ঝরে যায় জলের বিন্দু। পাতা তখন দূর থেকে দেখে তার সেই জলের কণাটিকে। বরুণও তেমন করেই সেই সব মুহূর্তে তাকিয়ে দেখে সেমিমাকে। এ অভিজ্ঞতা নতুন কিছু নয় তার কাছে। সেমিমা তবু আজ যেভাবে সপাটে তাকে দু-হাতে বেঁধে ফেলল, এর ভিতর যেন নতুন কিছু-একটা আছে। কী যে সে জিনিসটি, বরুণ বুঝতে পারে না। জীবনে প্রথম ঘটে যাওয়া অনেক কিছুই এরকম মালুম হয় না। পরে, বহুদিন পরে সেই স্মৃতি ফিরে এলে সেই প্রথম ক্ষণটির মূল্য বোঝা যায়। কোনোদিন এই সকালের কথা মনে হলে বরুণও হয়তো টের পাবে প্রথম বৃষ্টির ফোঁটা শুকনো মাটিকে কী আশ্লেষে স্পৃষ্ট করে।    

ধীরে ধীরে ঘোর কাটে বরুণের। সে সেমিমার মাথায় দু-বার হাত বুলিয়ে নরম করে প্রায় ফিসফিসিয়ে বলল, ওরে ছাড় ছাড়। এখানে কোথা থেকে কেউ দেখে ফেললে বেফালতু চারটে কথা হবে। 

সেমিমা নিজেকে সংবরণ করে। বরুণ বলে, তোর মুখটা এমন ফ্যাকাশে হয়ে গেছে কেন? সেমিমা জবাব দেয় না। বরুণ বলে, বুঝেছি। আবার এটা ওটা ভাবছিস নির্ঘাত। ভয় পেয়েছিস তো! 

সেমিমা হাসে। সে হাসিতে ক্লান্তি আছে, ভরসাও। 

তার এই ভয় পাওয়ার কথা বরুণ জানে। সেমিমা ভয় পায়। সবকিছু নিয়েই ভয় পায়। অন্তত না পাওয়ার কোনও কারণ নেই। বরুণ নিজেও পায়। সেমিমাকে নিয়ে। তাদের সম্পর্ক নিয়ে। সাহস করে সে-ও বলতে পারে না, ভয়ের কিছু নেই, সব ঠিক হয়ে যাবে। এই না বলতে পারাটাই তো একরকমের মস্ত ভয়। বরুণ বোঝে। সেমিমাও। কিছুক্ষণ তারা দুজনেই একে অন্যের হাত ধরে নীরব হয়ে থাকে।  

তারপর বরুণ বলে, চল, নিচে যাই। পিসিমা গরমাগরম লুচি ভেজেছে। তারপর সে নিজেই নিজেকে শুনিয়ে বলতে থাকে, লুচি ভাজার গন্ধটা এমন না, আপনি আপনিই খিদে পেতে থাকে। আলুভাজার গন্ধটাও। অদ্ভুত ব্যাপার। শহরে খেয়াল করে দেখবি, আলাদা করে যেন এই গন্ধটা টের পাওয়া যায় না। এই যে এখন খিদে-খিদে পাচ্ছে, সেটাও হয় না। অভ্যেসে একটা খাবার খেতে হয়, তাই খাওয়া। 

সেমিমা বোঝে, এই-ই আসলে ঘরের টান। মানুষ যে দেশের বাড়ি যায়, শত ঝঞ্ঝাট পেরিয়েও ঘরে ছুটে ছুটে আসে, সেই ঘর আসলে কী! একটা কাঠামো হলে তো হয়েই যেত, তার টান আর ততখানি কী! এই যে সকাল সকাল আলুভাজা, ময়দাভাজার গন্ধটা, এইটাই আসলে বরুণের দেশের বাড়ি। 

গ্রামের আর শহরের জলখাবারে অবশ্য অনেক ফারাক। সেমিমা প্রশ্ন করে, হ্যাঁরে, তোদের বাড়িতে জলখাবারে রোজ লুচি, আলুভাজা হয়? 

বরুণ মাথা চুলকোয়। বলে, সেরকম না। আজ তুই গেস্ট, অতিথির খাতিরে আমাদের সবার জবরদস্ত পেটপুজো। 

সেমিমা বলে, নর্মালি কী হয়? 

এমনিতে এখানে লোকে মুড়ি খায়, বরুণ জবাব দেয়। তারপর আর-একটু খোলসা করে বলে, আমাদের বাড়িতে নানারকম জিনিস দিয়ে মুড়ি খাওয়াই হয়। নারকেল কোরা তার মধ্যে আমার ফেভারিট। তবে, তুই যদি ইন জেনারেল বলিস, তাহলে মুড়ি-তরকারি কিংবা মুড়ি চানাচুর। যারা মজুর খাটতে যায় মাঠে, সকালে সামান্য কিছু খেয়ে মাঠে নেমে পড়ে। তারপর সকালটা পড়লে মুড়ি, তরকারি, পেঁয়াজ, লঙ্কা খেয়ে আবার সেই দুপুর অব্দি কাজ। আর, বিকেলে যদি কেউ মুড়ি খায়, এখন অনেকেই তার সঙ্গে আলুর চপ খায়। 

সেমিমা মোটামুটি বুঝে নেয়, সব গ্রামেরই ছবিখানা এক। তার নিজের গ্রামে সে যে ক-বার গেছে বা এর আগে সে কাজের খাতিরে যে যে গ্রামে ঘুরেছে, দেখেছে, ভাত ছাড়া, মোটের উপর মুড়িই দ্বিতীয় খাদ্য। রুটি, পরোটা, পাঁউরুটির তেমন চল নেই। যেমনটা আবার শহরের ঘরে ঘরে দেখা যায়। টোস্ট ইত্যাদি তো নয়ই। আর লুচি হয় অতিথি এলে, তাও বর্ধিষ্ণু পরিবারে; তবে, একবার গল্প খুঁজতে গিয়ে একটা গ্রামে গিয়ে সে শুনেছিল, সকালের জলখাবারে পান্তা খাওয়ার কথা। বরুণ, এমনিতে এ গাঁয়ে বড়োবাড়ির ছেলে, তার চিন্তাভাবনার মধ্যেও একটা বর্গের সীমাবদ্ধতা আছে। চিঁড়েভাজা খাওয়ার কথাও তো ও বলল না,  সেমিমার ঝুলিতে কিন্তু সে খবরও আছে।

সেমিমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেয় তাড়া দেয় বরুণ। - আর দেরিস করিস না, চল। পেট চুঁই চুঁই করছে আমার। তারপর বলে, খেয়ে নিয়ে বেরোব কিন্তু। কালকের কথাটা মনে আছে তো! 

সেমিমার হঠাৎ মনে পড়ে যায়। কাল জাদুবুড়োর কাছ থেকে ফেরার সময় বরুণ আবদার জুড়েছিল। গ্রামের সীমান্তে মাঠের আলপথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে মাঠের সমুদ্রে হারিয়ে যাবে দুজনে। ধান-ওঠা মাঠের সেই ধূ-ধূ সীমানার ভিতর দাঁড়িয়ে চুম্বনে মিলিয়ে যাবে দুই নারী পুরুষ। সেমিমা কপট রাগ দেখিয়ে বলেছিল, খুব না! যদি কেউ দেখে ফ্যালে। লজ্জা করবে না বুঝি! বরুণ একটু সাহসী হয়ে বলেছিল, দেখে তো দেখুক। 

এই গ্রাম, সোনাপুরের সহনীয় হাওয়া-বাতাস, যে বাতাস তার ছোটোবেলার সঙ্গী, যে বিরাট ব্যাপ্ত প্রান্তরের উদারতা একটা গ্রামসমাজের ভিতর চারিয়ে আছে, তা যেন বরুণকে সাহস জুগিয়েছিল। নইলে সে শহরে এমন প্রস্তাব তো করতে পারেনি। কোনোদিন বলেনি যে, চল কোনও ফ্লাইওভারের উপর দাঁড়িয়ে চুমু খাই। সেখানে হাজার চোখ। মিডিয়া। সোশাল মিডিয়া। কখন কোন মুহূর্ত যে কার কেরদানিতে হেডলাইন হয়ে যায়, তার ঠিক নেই। এখানে বরং সে নিজেকে অনেক সহজ, স্বাভাবিক মনে করতে পারছে। যেন অনেকখানি ভার নেমে গেছে বলে ডানা মেলা সম্ভব হয়েছে। 

সেমিমা এই বরুণকে যেন নতুন চিনল। জন্মভিটের পুরুষ, তার তো রূপ খানিক আলাদা হবেই। যদিও প্রস্তাব পাওয়ার মুহূর্তে বরুণকে সে নিবৃত্ত করেই বলেছিল, ঘরের ছেলের খুব সাহস দেখি! আচ্ছা সে দেখা যাবেখন। 

সেই কথাটা বরুণ এক রাতেও ভোলেনি। যদিও সেমিমা ভান করল, তার যেন কিছুই মনে নেই। সে তাই পালটা প্রশ্ন ছুড়ে বলে, কী কথা?

“জল ভর সুন্দরী কইন্যা জলে দিছ মন।

কাইল যে কইছিলাম কথা আছে নি স্মরণ।।”

“শুন শুন ভিন দেশী কুমার বলি তোমার ঠাঁই

কাইল বা কি কইছলা কথা আমার মনে নাই।।”

“নবীন যইবন কইন্যা ভুলা তোমার মন।

এক রাত্তিরে এই কথাটা হইলে বিস্মরণ।।” 


বরুণ বলে, আমি জানি, তোর মনে আছে। ফালতু আমার সঙ্গে তামাশা করছিস। সেমিমা এবার হেসে ফ্যালে। বলে, এত স্মৃতিশক্তি তোর কোথা থেকে আসে রে! একবার মাথায় ভূত চাপলে বেরোয় না। কেস খেয়ে মরবি কিন্তু, এই বলে দিলাম।

“লজ্জা নাই নির্লজ্জা ঠাকুর লজ্জা নাইরে তর। 

গলায় কলসী বাইন্দা জলে ডুব্যা মর।।”    

উঁ, এত্ত সহজ! মরলে মরব! তোর ভিতরেই ডুবে মরব। বরুণ বলে। তারপর বেশ মোলায়েম করে বলে ওঠে,

“কোথায় পাব কলসী কইন্যা কোথায় পাব দড়ি।

তুমি হও গহীন গাঙ আমি ডুব্যা মরি।।”


সেমিমা আশিরনখ শিহরিত। এই কথা তুই কী করে জানলি? প্রশ্ন করে সে। বরুণ বলে, তব্বে! কী ভেবেছিস, আমি এতই ওঁচা। সেমিমা বলে, না না সিরিয়াসলি। এ তো তোর জানার কথা নয়। বরুণ এবার বলতে থাকে- এই তো সকালে বেরিয়েছিলাম। জাদুবুড়োর সঙ্গে ফের দেখা। বলে, একা একা ঘুরতেচ ঠাকুর, কইন্যা গেল কোথায়? বললুম, কইন্যা গেছে ঘুমের দেশে। এখনও জাগেননি। শুনে জাদুবুড়ো হাসে। বলে, শোনো, কইন্যা কি এমনি এমনি জাগে? তাকে জাগাতে জানতে হয়। দেখোনি, রূপকথার গল্পে ঘুমন্ত সব রাজকন্যেকে কেমন রাজপুত্তুর এসে সোনার কাঠির ছোঁয়ায়া জাগায়। তেমন করে জাগাতে হয়। আমি বললাম, সে আমি এখন সোনার কাঠি পাব কোথায়! জাদুবুড়ো হাসে। বলে, সবই আছে চোখের সামনে, কেবল খুঁজে মরো ঠাকুর। চিনলা না কিছুই। আমি বললাম, সে নয় খুঁজে দেখবখন, এখন তুমি দুটো মন্ত্র শিখিয়ে দাও না কেন? তখন বলল, আচ্ছা এই দুটো কথা শিখিয়ে দিচ্ছি, বোলো গিয়ে কইন্যার কানে কানে। ফুল হয়ে সে ফুটে উঠবে। দেখবে, তার গা থেকে বেরুবে আশ্চর্য বাস। কত ভোমরার দল গুনগুনিয়ে উঠবে তার চারপাশে। কিন্তু সবাইকে সে মধু বিলোবে না। সে শুধু জেগে অপেক্ষা করবে কখন তুমি আসবে, সেই জন্য।  

সেমিমা দেখে বরুণকে। তার প্রেমিকটিকে যেন সে প্রতি মুহূর্তে নতুন করে চিনছে। যেন নতুন একটা পালার খোঁজ পেয়েছে সে। ছত্রে ছত্রে আবিষ্কার করছে অজানা মাধুর্য। সেই নরম সকালের ভিতর দাঁড়িয়েই তীব্র আশ্লেষে সে ফের জড়িয়ে ধরে বরুণকে। 

তুমি হও তরুরে আমি হই লতা।

তুমিরে ভমরা বন্ধু, আমি বনের ফুল।

নয়নের কাজলরে বন্ধু আরে বন্ধু তুমি গলার মালা।।      


**

পিসিমা এমন করে খেতে দিচ্ছেন, যেন এক যুগ হল তাদের পেটে কিছু পড়েনি। বরুণ একটাও কথা না বলে গপাগপ পেটে চালান করছে। ও জানে, এখানে ওজর আপত্তি চলবে না। সেমিমা প্রথমে বেজায় গাঁইগুঁই করল। সত্যিই এই এতগুলো লুচি তার পক্ষে খাওয়া সম্ভব নয়, তাও এই সাতসকালে। পিসিমা তাতে বেজায় রেগে গেল। এবং আগেকার দিনে লোকেরা যে খান দশেক লুচি এমনিই খেয়ে নিতে পারত, সেই কথা বারবার বলতে বলতে অতি কষ্টে একটা লুচি তুললেন তার পাত থেকে। এবং তারপর সেই অব্যর্থ বাণ নিক্ষেপ, নিজের মা দিলে কি আর না করতে পারতে! বরুণ এই শুনে একটু থমকায়। তারপর কিছু না বলে, ফের খাবারে মন দেয়। অগত্যা সেমিমাই বলে, কী যে বলেন না পিসিমা। আচ্ছা বেশ আমি সব খেয়ে নিচ্ছি। 

খেতে খেতে তার মনে পড়ে, বাড়িতে একবার ফোন করতে হবে। এমনিতে সে ফিল্ড স্টাডিতে যাচ্ছে বললে আগে অনেক ঝামেলা হত। ধীরে ধীরে ব্যাপারটা সয়ে গেছে। এখন তো ওরা সবাই বরুণকেও চেনে। বরুণের সঙ্গে বরুণের দেশের বাড়ি যাচ্ছে শুনে গোড়ায় মা-বাবা একটু অবাকই হয়েছিল। তবে, আপত্তি করেনি। এখানে এসে অবশ্য একবার কথা হয়েছে। এমনিতে নিশ্চিন্তই, তাও একবার কথা বলে নিতে হবে।  

বেশ ভারিরকম জলখাবার পর্ব চুকিয়ে ওরা যখন বাইরে এল, তখন বেলা চড়তে শুরু করেছে। নরম রোদের ভিতর এবার কড়া পাক ধরেছে। রোদের রং-ও এসময় বদলায়। হলদেটে ভাব কেটে একটা সাদাতে উজ্জ্বল ছোঁয়া মিশতে থাকে। অথবা, এটাই অতিউজ্জ্বল হলদে। রোদের রং খুব আশ্চর্য জিনিস। ঘড়ি না দেখেও বলে দেওয়া যায়, বেলা কতটা গড়াল।

গতকাল ঘোরার আনন্দে গ্রামের অনেকটাই দেখে ফেলেছিল সেমিমা। তবে, বলতে গেলে সেগুলো সবই দর্শনীয় স্থান। অন্য শহরে পর্যটক গেলে যেমন বিশেষ বিশেষ চিহ্নগুলো দেখায়। দার্জিলিং যাও তো এতগুলো পয়েন্ট দেখো, বেনারস যাও তো দেখে এসেও এই ওই। বোলপুর যাবে, তো এইখানে এই আর ওইখানে সেই। একটা এলাকার সঙ্গে প্রাথমিক পরিচয়ের অবশ্য এইটেই রীতি। তারপর পরতে পরতে চেনা বাকি থাকে। বরুণও তাকে ট্যুরিস্ট গাইডের মতো করে গ্রামের আটচালা, মন্দির, পিরের ঘর এইসবই কাল তাকে দেখিয়েছিল। আজ তারা বড়ো রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে গ্রামের দিকে এগোচ্ছে। সেই সূত্রে বেশ কিছু চেনা হচ্ছে নতুন করে। চোরপলতে গাছ আগে কি কখনও দেখেছে সেমিমা! মনে করতে পারে না! মস্ত খিরিশ কি কুল গাছ থেকে মনে হয় যেন তারা গ্রামের প্রাচীন বাসিন্দা। জাদুবুড়োর মতোই। কত বছরের গল্প তাদের কাষ্ঠল শরীরে জমা হয়েছে। এইসব প্রাচীন বৃক্ষের সামনে দুদণ্ড দাঁড়িয়ে পড়ে সেমিমা। আর তার মনে হয়, ইশ গাছেরা যদি কথা বলতে পারত! মানুষের সমাজের এমন নিরপেক্ষ দর্শক আর কোথায়! এরা কথা বলতে পারলে, কত ইতিহাস এমনিই লেখা হয়ে যেতে পারত। 

বরুণের পরিচিতরা তাদের ঘুরতে দেখে কেউ হাসছে। কেউ কুশল জিজ্ঞেস করছে। কেউ কেউ আবার একটা প্রশ্ন জুড়ে দিচ্ছে সেমিমাকে ইঙ্গিত করে। বরুণ হেসে হেসে গ্রামসম্পর্কের সম্ভাষণে তাঁদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল সেমিমার।

হাঁটতে হাঁটতে তারা দক্ষিণ সীমান্তে মাঠের ধারে এসে পৌঁছায়। 




[নয়]

কিস্‌সার ভিতর ভিতর কিস্‌সা গুঁজে দেওয়া আমাদের স্বভাব। আমরা মানে এই যারা আমরা গল্প বলি আর কি! আমি এ জিনিস শিখেছি আমার পুর্বপুরুষের কাছ থেকে। তাঁরা বলতেন, দেখো গল্প আর কতটুকু! ধরো সীতাহরণ পালা মানুষের সামনে বলছ তুমি। তাতে আছেটা কী! সোনার হরিণ এল। সীতা বায়না করল। নিমরাজি হয়েও বেরোতে হল রামকে। তারপর মায়াহরিণের কাজকারবার। লক্ষ্মণকে সীতার ভর্ৎসনা। অতঃপর বনদেবতার ভরসায় সীতাকে রেখে লক্ষ্মণের যাওয়া। ওদিকে তখন মারীচবধ আর এদিকে রাবণের সীতাহরণ। শুধু এইটুকুন গল্প যদি বলো তাহলে মানুষের চোখে কি জল আসবে! না বুকের ভিতরটা কেঁপে কেঁপে উঠবে! কিছুই হবে না। কথা হল, এই গল্পখানাই কে কীভাবে বলছে। যেভাবে বলছে, তার উপরই বিচার হয়, কে কীরকম গল্প বলিয়ে।

তো আমার পূর্বপুরুষ বলতেন, কিস্‌সার ভিতর কিস্‌সার গলি পাকড়াও করো। দেখবে, তাহলে গল্পের চেহারা পালটে যাচ্ছে। নীতি-যুক্তির দরজা খুলে যাচ্ছে। মানুষ নিজের মনের কাছাকাছি গল্প পেলে, আসল গল্পটাকে আরও আপন বলে জাপটে ধরতে পারে। 

যাই হোক, এইসব বিদ্যে জাহির করে লাভ নেই। আজকাল কোনও গুপ্তবিদ্যেরই আর কদর তেমন নেই দেখছি। তবু আমার মতো মুখ্‌খু যারা, তারা আজও ওই এক জিনিস ঘষে ঘষে চলেছে। অদৃষ্ট কে খণ্ডায় বলুন!

তা যে কথাটা বলতে এই আজাইরা প্যাঁচাল পাড়া, সেটা বলেই ফেলি বরং। এই সোনাপুরের আর একটা গুহ্যকথা আপনাদের শোনাই। বহুদিন হল এখানে প্রেমের সুস্থ সুন্দর হাওয়া বয় না। আপনি যদি আসেন এদিকে অবশ্য দেখবেন, ছেলেমেয়েরা ঘোরাঘুরি করছে  জোড়ায় জোড়ায়। কেউ কেউ একটু ফাঁকফোঁকর দেখে নিয়ে কিঞ্চিৎ শারীরিক হতেও চেষ্টা করছে। কিন্তু সর্বক্ষণ তাদের মাথার উপর একটা ভয়ের খাঁড়া নাকি নেচে বেড়ায়। বিয়ে-থা সবই হয়। ওই খাঁড়াখানাকে সাক্ষী রেখেই হয়। বহুকাল আগে নাকি এখানে দুজনকে – প্রেমিক-প্রেমিকা – বলি দেওয়া হয়েছিল। নরবলি শুনে চমকাবেন না মশাই! সেই সেবার রেললাইনের উপর ঘুমন্ত শ্রমিকদের উপর দিয়ে যে রাষ্ট্রের চাকা গড়িয়ে গেল, সে-ও আসলে নরবলিই। আমাদের চোখে যত আলোই ফুটুক না, এই ঝকঝকে দেশের ভিতরও নরবলির কিছু ব্যবস্থা করাই থাকে। বছর বছর সেখানে বলি হয়। কাগজে সে সব বেরোয় আর আমরা চা খেতে খেতে পড়িও।

 তো ওই প্রেমিক আর প্রেমিকার কিস্‌সায় কী একটা যেন গড়বড় ছিল। সেটা আমি আর এদের পেট থেকে বের করতে পারিনি। হয় ওদের ধর্মে মিলছিল না। নয় জাতে মিলছিল না। এমনিতে এমন শান্ত চমৎকার গ্রাম সোনাপুর। সেবার সামান্য একটা প্রেম-বিয়ে করে উত্তাল হয়ে উঠেছিল। তারপর শোনা যায় এক রাতের আঁধারে দুজনকে ভয়দেবীর কাছে বলি দেওয়া হয়। আর রক্তমাখা খাঁড়াটাকে ঝুলিয়ে দেওয়া গাঁয়ের আসুথ গাছের ডালে। যাতে সেই খাঁড়া দেখে বেজাতে কি বিধর্মে বিয়ে করতে সবাই ভয় পায়। এই ভয়দেবীর মন্দির নেই। অথচ খুব জাগ্রত দেবী তিনি। এ গাঁয়ে সকলেই মনে মনে তাঁকে মানে। 

অনেকদিন হল সেই খাঁড়াটাকেও আর দেখা যায় না। এ গাঁয়ের বুড়ো হুজুরেরা বলে, আগে যেটা সামনে ছিল এখন সেটা বায়ু হয়ে শরীরের ভিতর ঢুকে পড়েছে। আমি বলি, কী কাণ্ড! এ কী ভেলকি নাকি! বুড়ো হুজুরেরা আর কথা না বাড়িয়ে বিড়ি ধরায়। আমিও আর বিশেষ কিছু জানতে পারি না। শুধু ওই ভয়ের খাঁড়া ঘিরে যে একটা রহস্য আছে সেটাই আপনাদের বলে দিলাম। আর কথা বাড়াব না। সেমিমা আর বরুণ ওদিকে হাঁটছে, আমরা বরং পা চালিয়ে ওদের কাছে পৌঁছে যাই।        

বরুণের মুখে প্রেমের আশ্চর্য দুই পঙক্তি শোনার পর থেকেই সেমিমা ভিতরে ভিতরে যেন কেমন উন্মনা হয়ে আছে। যেন তার ভিতরে শান্ত সরোবরে কেউ ঢিল ছুড়েছে। সেখানে এখন তিরতিরে ঢেউ। সেই অতল সরোবরে তার বরুণকে ডুবিয়ে নিতে ইচ্ছে করে। বরুণ ডুববে, ভাসবে। অকূল দরিয়ার বুঝি কূল নাই রে। চিরকালের নারীরও বাসনা যেন এই গহীন গাঙ হয়ে ওঠা। চিরকালের পুরুষের কামনা সেই গাঙে ডুবে মরা। এই সহজ স্বীকারোক্তির তুল্য প্রেমের কথা আর কোথায়! বহু অলংকার, ছন্দ, মাত্রার নিক্তিমাপা হিসেবে গাঁথা কবিতা যা না বলে উঠতে পারে, এই দুই পঙ্‌ক্তি তা অনায়াসে বলে ফেলে। সরল বলেই তাদের এমন হিরের মতো দ্যুতি। অথচ কোথায় এখন তা আর বলা হয়! ক-টা আর জাদুবুড়ো আছে যে, বরুণদের মতো এখনকার ছেলেকে প্রেমের এই মন্ত্রগুপ্তি শিখিয়ে দেবে। কানের ভিতর দিয়ে যে-কথা মরমে পশিবে আর জাগিয়ে তুলবে ভিতরের সরোবর। ইচ্ছে করবে, ওই সরোবরের উপর একখানা জলটুঙ্গী ঘর বানাতে। তারপর সেই ঘরে তার প্রেমিকটিকে নিয়ে আমোদে কেটে যাক একটা নেশা-ধরা বিকেল। বরুণকে এই মুহূর্তে বুকে চেপে ধরতে ভারি ইচ্ছে করে সেমিমার।

-হ্যাঁ রে, এই সোনাপুরে যদি আমরা থেকে যাই তো কেমন হয়? 

সেমিমার প্রশ্নে একটু হকচকিয়ে যায় বরুণ। বলে, সে কি, চাকরির কী হবে তবে? তোর রিসার্চ? সেমিমা উত্তর দেয় না। নীরবে হাঁটতে থাকে। তারপর আবার বলে,

-ধরেই নে না, থেকে যাচ্ছি। পিসিমার তো আপত্তি নেই দেখলাম।

-পিসিমার আপত্তির কথা হচ্ছে নাকি?

-তাহলে বাকি কী থাকল? খাওয়া-দাওয়া? সে নয় তুই চাষ-আবাদ করবি।

-আমি!

-আমিও করব। জানিস তো, কৃষি ব্যাপারটা কিন্তু গোড়াতে মেয়েরাই শুরু করেছিল। পরে তোরা সব দখল নিলি। আর আমাদের চাষাবাদটা কিচেন গার্ডেন বলে চালিয়ে দিলি।

-সে নয় হল। কিন্তু গবেষিকা হঠাৎ চাষ করবে কেমন করে? সে কি চাষের কিছু জানে?

-শিখে নেব। তুইও শিখে নিবি। তুই সকাল সকাল চলে আসবি। আমি একটু বেলার দিকে তোর খাবার নিয়ে আসব। ওই আল ধরে একজন পল্লিকবি গান গেয়ে চলে যাবে। তুই খেতে খেতে শুনবি।

-ঠিক যেন সিনেমার মতো!

বলে হেসে ফ্যালে বরুণ। বলে, শোন নাটকে-সিনেমায় গ্রামকে এমন করে দেখায় যে, মনে হয় এমনি করে আজীবন থেকে যাই। কিন্তু গ্রামের জীবন সহজ নয়। অনেক কষ্ট করে থাকতে হয়। বাকি সব সুবিধা অসুবিধা ছাড়, নেটের স্পিড নিয়ে যা ঝামেলা, তাতেই গ্রামে থাকার শখ তোর দুদিনে উড়ে যাবে।

সেমিমা খেয়াল করে, কী এক অজ্ঞাত কারণে সে এখানে আসা ইস্তক মোবাইল থেকে প্রায় নিজেকে দূরেই সরিয়ে রেখেছে। নেট খোলা তো দূর অস্ত। বোধহয়, বরুণের সঙ্গে বরুণের গ্রামে আসার এই যে মুহূর্তটা, সেটাই সে প্রাণপণে শুষে নিতে চাইছে। তাই প্রযুক্তির যন্ত্রণা থেকে নিজেকে খানিক সরিয়েই রেখেছে।

বরুণ বলে, আমি গ্রামে বড়ো হয়েছি ঠিকই। কিন্তু এখন সব অভ্যেস পালটে গেছে। আর কি অমন কষ্ট করে থাকতে পারব? পিসি না থাকলে এ গ্রামে আর আসা হবে কিনা কে জানে!

বরুণের কথায় যুক্তি আছে ঢের। কিন্তু সেমিমা আপাতত তাতে কান দিচ্ছে না। তার মাথায় ঘুরছে বরুণের বলা সেই দুটো আশ্চর্য পঙ্‌ক্তি। সেমিমার ভাবতে কী যে ভালো লাগে, যে, এমন দিন তো ছিল, যখন মানুষের মুখে মুখে ফিরত এইসব গান। ভালোবেসে মানুষ স্মৃতিতে ধরে রেখেছিল এইসব আশ্চর্য পদ। লেখাজোকার বালাই ছিল না। আর সেই অর্থে লেখাপড়া জানতই বা ক-জনা! কিন্তু তাতে গানে ভাটা পড়েনি। বাঙালির ঘরে যেমন এমনিই ফুটত কুন্দ কি গন্ধরাজ, আর তার গন্ধে বেভুল হত প্রাঙ্গনের বাতাস, এইসব গানের সুর মধু হয়ে তেমনই ঝরে পড়ত। এতটুকু কৃত্রিমতা নেই। আনন্দ করে মানুষ গান গাইছে, কৃষক তার লাঙলে হেলান দিয়ে সে গান শুনছে- এর ভিতর যে অনুরাগ জড়িয়ে আছে, তাকে ভারি খাঁটি, ভারি আপনার মনে হয় সেমিমার। সে যেন দেখতে পায় সেইসব দিন যখন গোলায় গোলায় ধান আর গলায় গলায় গান। পূর্ব ময়মনসিংহের ঘন সবুজ গাছাগাছালির বন, দিগন্ত ছাওয়া হাওর, ঝিল-বিল, সুজলা-সুফলা শস্যশ্যামলা মাটি যেন বলছে, গাও গাও, গেয়ে ওঠো তোমার প্রাণের গান। নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জের মাটি বলছে, আমিই এর জন্মভূমি, আমিই এর শ্রোতা। সেই আদর পেয়েই সরল কোনও কৃষক গেয়ে উঠছে,

পূবেতে বন্দনা করলাম পূবের ভানুশ্বর।

একদিকে উদয়রে ভানু চৌদিকে পশর।।

দক্ষিণে বন্দনা গো করলাম ক্ষীর নদী সাগর।।

যেখানে বানিজ্‌জি করি চান্দ সদাগর। 

উত্তরে বন্দনা গো করলাম কৈলাস পর্‌বত।

যেখানে পড়িয়া গো আছে আলীর মালামের পাথ্‌থর।।

পশ্চিমে বন্দনা গো করলাম মক্কা এন স্থান

উর্‌দিশে বাড়ায় ছেলাম মমিন মুসলমান

সভা কইর‍্যা বইছ ভাইরে ইন্দু মুসলমান।

সভার চরণে আমি জানাইলাম ছেলাম্‌।।         


অবাক হয়ে সে গান শুনছে জমিদারের এক গোমস্তা। সে তো বেরিয়েছে খাজনা সংগ্রহে। গ্রামে গঞ্জে ঘুরে ঘুরে তার কাজ। যত ঘোরে, তত ঘোর লেগে যায়। যত শোনে, তত শুশ্রূষা বাড়ে। কোথা থেকে এল এই গান? যেন গাঁয়ের পুষ্করিণীতে থাকা সুশ্রী জল। কোনোদিন কেউ ফিরে দেখেনি সেই জলের আয়নায় কেমন ভেসে ওঠে বাংলার মুখ। একবার সে মুখ দেখলে, পৃথিবীর রূপ আর দেখতে সাধ হয় না। এমনই সে মোহনিয়া রূপ। গোমস্তা শোনে, আর কেবলই পুথির খোঁজ করে। কে লিখে রেখেছে এই গান? উত্তর আসে, কেউ লেখেনি। এ গান রচেছে দ্বিজ কানাই। এই যে হিন্দু, মুসলমান পাশাপাশি থাকার কথা এল, এই যে কৈলাস আর আলীর মালামের পাথ্‌থরকে বন্দনা করা হল একসঙ্গে, এত সহজ করে, এমন সুন্দর সহাবস্থানে, এ তো যেন সিন্দুকে তুলে রাখা তুলোট কাগজে লেখা আত্মপরিচয়। গোমস্তা অস্থির হয় পুথি সংগ্রহে। কিন্তু পুথি মেলে না। মানুষই শুনে শুনে স্মৃতিতে ধরে রেখেছে। তাদের কাছ থেকেই জোগাড় করতে হবে যা কিছু। 

গোমস্তা চন্দ্রকুমার যেন জীবনের একটা উদ্দেশ্য খুঁজে পেল এতদিনে। আইথর গ্রামের সাধারণ ছেলে সে একজন, ভাগ্যবিড়ম্বিত জীবন তার। তাতে এর থেকে ভালো কাজ আর কী হতে পারে! পড়াশোনা বেশিদূর হল না। একসময় মুদি দোকানেও কাজ করেছে। কিন্তু কাজে মন সায় দেয় না তেমন। তারপর এই গোমস্তার চাকরি। ঘুরে ঘুরে কাজ। আর সেইটেই কাজে লেগে গেল। অমূল্যধনের সন্ধান যেন পেল সে। তবু এ জিনিস ছেলের হাতের মোয়া তো আর নয়। যে এই গেলুম আর পেলুম। চন্দ্রকুমার ঘোরেন আর ঘোরেন। এই একটু পান তো ওই একটু পান। জাদুবুড়ো তাকে বলে, যাও হে, মস্‌কা গ্রামের সেক আসফ আলীর কাছে। ওই গ্রামেরই উমেশচন্দ্র দে-র কাছে যেতে যেন ভুলো না। কিন্তু তাতেও যে পালা অধরা থাকে। সবটা নাগালে আসে না। জাদুবুড়ো বলে, তাহলে তোমারে যেতে হবে গেরালির নসু সেকের কাছে। জাদুবুড়োর নির্দেশ পেয়ে দোরে দোরে ঘোরেন চন্দ্রকুমার। তাঁকে দেখে অবাক হয় সকলে। তুমি তো ভদ্দরলোক? এইসব পালা নিয়ে তুমি করবেটা কী? চন্দ্রকুমার বলেন, দাও না। যা মনে আছে, তাই আমায় দাও। লোকে বলে, না তুমি চাষাভুষো, না গায়েন। দ্বিজ কানাই ছিলেন নমঃশূদ্রদের বামুন। তাঁর একটা গানের দল ছিল। তাঁরই পালা এই বাদ্যানির গান। কিন্তু সে নিয়ে তোমার কাজ যে কী-বা, তা তো বুঝি না, লোকে বলে। চন্দ্রকুমার অনুনয় করেন। বলেন, সে কাজের কথা নয় বুঝিয়ে একদিন বলবখন। দেখো, একদিন এইসব চাষাভুষোর গান সাত সমুদ্র তের নদীর পারের মানুষকে অব্দি বশ করে ফেলবে। এখন স্মৃতির পুঁটুলিখানা খোলো দিকি একবার। মাধুকরীতে এসেছি। দাও, আমারে গান দাও। তোমাদের স্মৃতি দাও। পালা জোগাড় করেন চন্দ্রকুমার। 

হামরা বেদে চুরি করে নিয়ে গেছে এক ফুটফুটে শিশুকন্যা। দেখতে দেখতে ষোল বছর বয়স হল সেই মেয়ের। রূপ আর যৌবন তাকে ঢেলে দিয়েছে ভগবান। তেমনই সে গুণবতী। বেদের দলের খেলায় লোক টানার চুম্বক এই কন্যা। চন্দ্রকুমার লোকের মুখে মুখে যত তার কথা শোনেন তত যেন নেশায় পড়ে যেন। বাদ্যানির গান তাঁকে আচ্ছন্ন করে রাখে। একদিন সেই মেয়েকে দেখে একেবারে প্রথম দেখাতেই প্রেমে পড়ে গেল নদ্যার ঠাকুর। কন্যারও বুকের ভিতর আকুলিবিকুলি। সন্ধেবেলা জল সইতে গেছে, নদ্যার ঠাকুর এসে বলে, 


জল ভর সুন্দরী কইন্যা জলে দিছ ঢেউ

হাসি মুখে কওনা কথা সঙ্গে নাই মোর কেউ।।

কেবা তোমার মাতা কইন্যা কেবা তোমার পিতা।

এই দেহে আসিবার আগে পূর্ব্বে ছিলি কোথা।

সুন্দরী সেই কন্যা জবাব দেয়,

নাহি আমার মাতা পিতা গর্ভ সুদর ভাই।

সুতের হেওলা অইয়া ভাইস্যা বেড়াই।।

কপালে আছিল লিখন বাইদ্যার সঙ্গে ফিরি।

নিজের আগুনে আমি নিজে পুইর‍্যা মরি।।            

কন্যার দুঃখ বোঝে নদ্যার ঠাকুর। লোকমুখে শুনতে শুনতে কন্যার দুঃখ যেন প্রাণে বাজে চন্দ্রকুমারেরও। এর কাছ থেকে একটু শোনেন। ওর কাছ থেকে একটু। আর সারা দিনরাত যার নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা সেই সুন্দরী কন্যার নাম, তিনি দেন মহুয়া। বাদ্যানির গান পালার নাম রাখলেন ‘মহুয়া’। এর ভিতরে আছে প্রেম। এর ভিতরে আছে প্রেমের অজেয় শক্তির কথা। এ এক আশ্চর্য মাদকতা, অপূর্ব নেশা। কিন্তু জাদুবুড়ো, নানা বয়ানে যে হেরফের হয় কিছু কিছু! বুড়ো বলে, তা কি আর হবে না চন্দর। এ কি আর কোথাও লেখাজোকা আছে! ফিরেছে লোকের মুখে মুখে। দু-একটা কথা পালটে গেছে। দরকারে জুড়েছে। প্রয়োজনে বাতিল হয়েছে। পালা লিখেছে কোনও বামুন, বন্দনা লিখেছে কোনও মুসলমান বয়াতি। সব মিলেমিশেই সে আছে। ফুলগাছের স্বভাব রে ভাই। কোথাও একটু বড়ো, কোথাও একটু ছোটোটি হয়ে থাকা। কিন্তু ঋতু এলে সেই একই ফুল ফুটবে। সেই একইরকম বাসে বনের বাতাস ব্যাকুল হবে। চন্দ্রকুমার স্বস্তির শ্বাস ফেলেন। আর পালা সংগ্রহ করতে দৌড়ান। কেন্দুয়ার ওখানে এক গ্রামে কয়েকজন রমণী তাঁকে পালা শোনাবে কথা দিয়েছে। কথা দিয়েছে পদমশ্রী গ্রামের পাষাণী বেওয়া। সাউদ পাড়ার জামালদি সেক। ফুরসত নেই চন্দ্রকুমারের। ভগবান যেন তাঁকে দিয়ে এই কাজটি করিয়ে নিতেই ইচ্ছে করেছে। 

নইলে কেমন করেই বা কেদারনাথের সঙ্গে যোগাযোগ হবে। কেদারনাথ মজুমদার। তিনি তখন একটা পত্রিকা সম্পাদনা করেন, নাম ‘সৌরভ’। বাংলার এই লোকজীবন তার সংস্কৃতি নিয়ে তাঁর বেজায় ঝোঁক। এমনিতে পড়াশোনা বেশিদূর এগোয়নি, কিন্তু নিজে নিজে সংস্কৃতে পণ্ডিত হয়েছেন কেদার। বেজায় পড়াশোনা তাঁর। সেই কেদারনাথই চন্দ্রকুমারকে দিয়ে প্রথমে এক নিবন্ধ লেখাবেন। বাংলার মহিলা কবিদের নিয়ে। তা পড়ে এদিকে চমৎকৃত হবেন দীনেশচন্দ্র সেন। তারপর তিনিই ব্যবস্থা করে চন্দ্রকুমারকে নিয়োগ করবেন পালা সংগ্রহের কাজে। জাদুবুড়ো বলবে, গোমস্তাগিরি করে মনের শখ মিটত কই! এতদিনে কাজের কাজখানা পেলে তো! চন্দ্রকুমার হাসে। সত্যিই কাজের কাজটি হচ্ছে। এক অচেনা বঙ্গ তার হাত দিয়ে দেখছে জগৎ। যেখানে বল্লালি হিঁদুয়ানির ছোঁয়া নেই। যেন কোনও সোনার বাড়ি জমির খোঁজ পেয়েছে সে। আর তাই-ই তুলে আনছে। তারপর তো এসব নিয়ে হইহই পড়ে যাবে। আর তার নেপথ্যে রয়ে যাবে আইথরের সেই ছেলেটা।      

সেমিমা নিজে যে কতবার ভেবেছে, চন্দ্রকুমার-কে নিয়ে সে একটা আস্ত বই লিখবে। কী আশ্চর্য ক্ষমতাই না ছিল মানুষটার। কতদিন সে প্রেসিডেন্সির পাশে পুরনো বইয়ের দোকানে উঁকিঝুঁকি দিয়ে খুঁজেছে, যদি একেবারে একটা অচেনা কিছু হাতে চলে আসে। এমন একটা পুথি, যার খোঁজ এখনও সারস্বত মহল পায়নি। বা, বহুকাল আগে তা প্রচল ছিল, এখন আর নেই, কেবল জেগে আছে লোকস্মৃতিতে। বইপাড়ায় একবার সেই বই টাটকা হয়ে ফিরে এলেই রইরই পড়ে যাবে। কিন্তু পোড়া শহরে সেইসব আর সত্যি হয় না। কেবল সস্তার রচনাবলি বিকোয় ফুটপাথ জুড়ে। 

সেমিমা অবিশ্যি এখানে ওখানে ঘোরে। কিস্‌সার সন্ধান পেলেই আঠার মতো সেঁটে থাকে। যদি কিছু হাতে চলে আসে, একেবারে অচেনা কিছু। একটা আনকোরা চাবি। তা দিয়েই হয়তো নতুন একটা দরজা খুলে যাবে, কে বলতে পারে! রবি ঠাকুর কি আর সাধে বলেছেন, দেশবাসীর পক্ষে দেশের কোনও বৃত্তান্তই তুচ্ছ নয়। 

জাদুবুড়ো, সে কথা শুনে বলে, এইটা একেবারে ঠিক কথা কয়েছ জননী। একটা খড়কুটোর গপ্পোও তুছ নয়। সে আর বরুণ তখন আলের ধরে ধরে বিপুল প্রান্তরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ মাঠের ধারে বুড়োর সঙ্গে দেখা। বরুণকে দেখেই একগাল হেসে বলে, কী কেমন মন্ত্র! কন্যা জেগেছে তো! সেমিমার গাল লজ্জারুণ। তার মনে পড়ে সোনার কাঠির কথা। ছোটোদের কাছে রূপকথা একরকম। বড়োদের কাছে এলে তার মানে বদলে যায়। সেখানে ছোটদের রূপকথার সোনার কাঠি জড়িয়ে যায় পুরুষের সঙ্গে। পুরুষ তা দিয়েই তো ঘুম ভাঙায় রাজকন্যের। এই ঘুম ভাঙার অর্থটুকু যুবতী জানে। জানে সেমিমা। তার গা শিরশির করে। সে বরুণের হাতে চাপ দেয়। বুড়ো যা বলেছে বরুণ তা বুঝেছে কি-না কে জানে! কিন্তু এখন সে নিজে যারপরনাই অস্বস্তিতে পড়ে। 

হেসে প্রসঙ্গে চাপা দিয়ে তাই বলে, জাদুবুড়ো, এই মাঠে-ঘাটে কতকিছু ছড়িয়ে আছে বলুন। এদিক ওদিক দেখতে দেখতে হয়তো কোনও দারুণ জিনিসের খোঁজ পেয়ে যাব। জাদুবুড়ো রাজি হয়। বলে, চন্দ্রকুমারের গল্প। তার পালা খোঁজার কিস্‌সা। বয়ানের হেরফের, মাধুকরী করে করে আস্ত পালা জোগাড়ের সেইসব সংগ্রাম। বলে, কেবলই খুঁজতে হয় জননী। খোঁজার তুল্য জিনিস নাই। চন্দরকুমারও তো এই করে করেই পেয়েছিল কত পালার খোঁজ। 

এতক্ষণে যেন কী-একটা খেয়াল হয় সেমিমার। সে বলে, কিন্তু জাদুবুড়ো, চন্দ্রকুমারের গল্পের ভিতর আপনি ঢুকে পড়লেন কী করে? আপনি কি নিজে সেসময় ছিলেন নাকি? বুড়ো এবার খলখলিয়ে হাসে। বলে, আবার ধরা পড়ে গেছি। তোমারে ফাঁকি দেয় সাধ্যি কার! 

তারপর বলে, থাকব না তো যাব কোথায়! সেদিনও ছিলাম, আজও আছি। আছি যে, এই তো মস্ত রহস্য। বলতে বলতে বুড়ো ওদের ফেলে উলটোদিকের পথ ধরে। 

সেমিমা আর বরুণ অবাক হয়ে বুড়োর চলে যাওয়া দেখে। দেখে এক রহস্যমানুষের মিলিয়ে যাওয়া। তারপর তারাও মিলিয়ে যায় প্রান্তরের সীমাহীনে।


[চলবে] 


আগের পর্বগুলি পড়ুন : সোনার বাড়ি জমি (প্রথম পর্ব)  

                          সোনার বাড়ি জমি (দ্বিতীয় পর্ব)

                               সোনার বাড়ি জমি (তৃতীয় পর্ব)

                               সোনার বাড়ি জমি (চতুর্থ পর্ব)

.........................................................................

অলংকরণ : ঐন্দ্রিলা চন্দ্র

সজ্জা : বিবস্বান দত্ত 



#ধারাবাহিক উপন্যাস #সোনার বাড়ি জমি #সরোজ দরবার #সিলি পয়েন্ট #ওয়েবজিন #silly পয়েন্ট #Web Portal

Leave a comment

All fields are required. Comment will appear after it is approved.

trending posts

newsletter

Connect With Us

today's visitors

46

Unique Visitors

181448