মুক্তগদ্য

প্রলাপ (শেষ কিস্তি)

প্রজ্ঞা দেবনাথ Mar 19, 2022 at 10:19 am মুক্তগদ্য ৩৯

[১১]


একদিন একটা পাখির বাসার গল্প লিখব ভাবলাম। যেটা শুরু হবে দুই বিহঙ্গের প্রথম দেখা দিয়ে আর শেষ হবে গাছের ডালে ফাঁকা বাসায় দু-চারটে ভাঙা ডিমের খোলা পরে থাকার ছবি দিয়ে। কিন্তু ঠিক কীভাবে দুটিতে মিলন হবে কিংবা কী দিয়ে ওরা বাসা বাঁধবে - এসব ভাবতে পারছি না। তার থেকেও বড়ো কথা, কেন হঠাৎ বাসা ছেড়ে ওরা চলে যাবে সেটাও স্পষ্ট নয়। একবার ভাবলাম খলনায়ক হিসাবে একটা ভয়ঙ্কর সাপকে গল্পে নিয়ে আসব। তারপর মনে হল অমন তো কত গল্পই না আছে। আবার মনে হল পাখিদুটোর কিছু সাংসারিক কলহ বাঁধিয়ে দিই। বাচ্চাদের সমান ভাগে দায়িত্ব নিয়ে আলাদা হয়ে যাক তাদের আকাশ। কিন্তু সেটা বড্ড বাংলা সিরিয়ালের মত ঠেকল। গল্পটা তাই আর লেখাই হল না।


আর একদিন তো একেবারে কোমর বেঁধে বসলাম মিষ্টি একটা প্রেমের গল্প লিখব বলে। ছোটবেলার ইশকুল থেকে তাদের গল্প শুরু হবে। তারপর নানা চড়াই-উতরাই পেরোতে হবে ওদের। বিচ্ছেদ হবে, অভিমান আসবে, জীবন সংগ্রামের বাস্তব আসবে। সব কিছুর পরে গল্পের শেষ দৃশ্যটা ছবির মত চোখে ভেসে উঠল যেন! পড়ন্ত বিকেলের রোদে ওদের ছোট্ট ফ্ল্যাটের দক্ষিণের বারান্দায় মেয়েটির কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে ছেলেটি। মেয়েটি তখন তাকে পড়ে শোনাচ্ছে, 'রক্তকরবী'। এবার যেই লিখতে বসলাম আর হিসেব মেলাতে পারলাম না। একবার মনে হল ছেলেটিকে করে দেব উচ্চাকাঙ্ক্ষী, জনপ্রিয় নাট্যাভিনেতা; আর মেয়েটি হবে আদর্শবাদী নাট্যকর্মী। কিন্তু সেটা লিখতে গিয়ে ছোটবেলার গল্পগুলো একেবারে গুলিয়ে গেল। ওটা বাতিল করে ছেলেটিকে বানালাম নিবিষ্টমনা এক প্রেমিক, আর মেয়েটিকে দিয়ে দিলাম স্বৈরিণীর চরিত্র। তাতে অন্য গোল বাঁধল। কিছুতেই আর ছেলেটির ভাঙা মন জোড়া দিয়ে মেয়েটিকে আত্ম-প্রতিফলনের পরীক্ষায় ফেলে নায়িকা বানাতে পারলাম না। এবারেও তাই স্কুল ফেরত পাশাপাশি সাইকেলের গতিপথেই গল্প থেমে গেল ।


একদিন আর ভাবলাম না, সোজা লিখতে বসে গেলাম। এক পরিবারের গল্প। তার শুরুটাই হল ঠাকুমা আর নাতির মিষ্টি একটা কথোপকথনে। তারপর তাদের বাড়িটা কেমন সেই লেখা এল। পরিবারের আটজন সদস্যের নাম, বয়স সব এল। বাগানের রঙিন ফুলেদের বর্ণনা লিখছি। হুট করে মাথায় চলে এল, এই গল্পের শেষটা হওয়া উচিত ঠাকুমার ফাঁকা পানের ডিবের গন্ধ শুঁকে নাতির স্মৃতিচারণায় ডুবে যাওয়া দিয়ে। ব্যাস! সবটা মাটি হয়ে গেল। এবার আর মাথাতেই এলনা যে এটা আদৌ ছোটোগল্প হবে না বড়ো? পরিবারের সকলের আলাদা একেকটা গল্প নিয়ে মালাটা গাঁথব, নাকি সবাইকে এক সুতোয় জুড়ে বুনতে বসব? মনে হল অবিবাহিত বড়োপিসি আর মায়ের একটা দারুণ বন্ধুত্বের কাহিনি তৈরি হোক, কিন্তু তাতে বাধ সাধল ঠাকুমা আর নাতির প্রথমে বলে ফেলা কিছু কথা। এবার যদি ওই কথাগুলোই বদলে যায় তাহলে তো গোটা ভাবনার প্রায় সবটাই ছেঁটে ফেলতে হবে। তখন এটা তো আর সেই গল্পটা থাকবে না, একদম অন্য একটা গল্প হয়ে যাবে। আবার কলম থেমে গেল। নাতির আর ছেলেবেলার সাদাকালো টিভিতে হিন্দি গানের অনুষ্ঠানের কথা মনে করতে বসা হল না।


বারবার এমনটাই হয়। লিখতে বসে উঠে পড়তে হয়। কত কত গল্প যে শুরু হয়েই শুধু থেমে গেছে তার ইয়ত্তা নেই। ছোট থেকেই অঙ্কে কাঁচা বলে যোগ-বিয়োগ-গুণ-ভাগ সব একেবারে তালগোল পাকিয়ে যায়। ত্রৈরাশিক, ভগ্নাংশ ইত্যাদি কঠিন ধাপ বাদ দিয়ে গল্পের গরু এক বিরাট লাফে পৌঁছে যায় সোজা উত্তরে। কষ্ট করে অঙ্কটা কষতে আর ইচ্ছে করে না, বা ইচ্ছে করলেও বোকাবোকা সব ভুল হয়ে যায়। যদি সত্যিই তালি দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছানো যেত তাহলে কি কেউ আর কষ্ট করে মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে যাত্রাপথ বেছে নিত! এইখানেও ঠিক তাই হয়। যেই মনে গেঁথে যায় যে এই গল্পের শেষ তো এমনটা ছাড়া আর কিছু হতেই পারে না, অমনি বাকি সব নগণ্য হয়ে যায়। তখন মনে হয় যাই লিখি না কেন, যে স্রোতেই গল্পকে ভাসিয়ে দিই না কেন - গল্পের ময়ূরপঙ্খী নৌকাখানা তো আমার চেনা তীরেই নোঙর ফেলবে। সেই ভাবনা বড়ো সোয়াস্তি দেয়। মনে হয় জীবনের কোনো একটা খেলায় তো অন্তত জিতে যাচ্ছি। উত্তর বলছে মোটের উপর সব ভালো হবে বা ভালো হতে পারে। এবার যদি প্রশ্ন আর উত্তর মেলাতে গিয়ে এমন কোনো শাখাপ্রশাখার জন্ম হয় যারা বিস্তার গোটা ভিতটাকেই ফাটিয়ে ফেলার শক্তি রাখে, তাহলে তো বৃথায় যাবে সব চেষ্টা। এইখানেই ঘুরেফিরে আটকা পড়ি। গল্পের শুরুটা আর শেষটা তো জানা - মাঝের আখ্যানটা লিখে ফেলাই বুকে পাথরের মত চেপে বসে। অর্ধেক হয়ে পাতার পর পাতা জুড়ে জায়গা করে নেয় গল্পাংশ। একদিন শুধু এদের জুড়ে দিয়ে দেখব কেমন লাগে! পূর্ণাঙ্গ গল্প হয়ে ওঠার ক্ষমতা না থাকলেও অক্ষম গল্পকারের বাজে বকার মন্তাজ হয়েই না হয় কোনো ধুলোমাখা তাকের কোণে ওরা সামান্য একটু জায়গা করে নেবে। দেখাই যাক না। তাই ভেবেছি আবারও কাল গল্প লিখতে বসব। এবারে লিখব একটা কুকুরছানার গল্প। শুরুতেই তাকে ড্রেনের ধারে কুড়িয়ে পাবে একটা বাচ্চা মেয়ে। শেষ দৃশ্যটা যে মাথার এক কোণে উঁকিঝুঁকি মারছে সেটা স্পষ্ট বুঝতে পারছি। কিন্তু না! এক্ষুণি খিল দেব সেই দরজায়। কিছুতেই চোখের আয়নায় ফুটে উঠতে দেওয়া যাবে না তাকে। দরজা বন্ধ। জানলা বন্ধ। ঘুলঘুলিতেও এই‌ চাপা দিলাম। প্রাণপণে চেষ্টা করলে ঠিক পারব। একদম যে পারিও না তা তো নয়। এই যেমন এই লেখাটা, এর আসলে শেষ কোথায়? এর শেষটা তো একবারও মাথায় আসেনি। অনেক আগেই কি শেষ হয়ে গেছে, না শেষের এখনও অনেক দেরি আছে?‌ সত্যিই আমার জানা নেই।


আসলে গল্পের শেষটুকুর মধ্যে যে মায়া, যে টান থাকে তা তো বাকি গোটা গল্পটার মধ্যে থাকে না। যখন একখানা গল্প পড়তে শুরু করছি, লাইনের পর লাইন ধরে এগোচ্ছি - তখন তো আমি জানি যে এর ইতি টানা আছে। নিবিড় অপেক্ষায় প্রতিটা শব্দ গিলতে থাকি শুধু সেই ভরসাতেই। এখন সেই ভরসা ভাঙি কেমন করে! বরং এক কাজ করি। সুতোগুলোকে জড়ানোর চেষ্টাটাই ছেড়ে দিই। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রেখে দেব আমার চিন্তাসূত্রের মতই। আলাদা করে জট ছাড়িয়ে, নিটোল বুনোটে ভরাট করার চেষ্টা করব না আর। যে যার মত করে বুঝে নেবে। এক-এক জনের কাছে কোনও একটা সুতোর রঙ বা বুনন ধরা পড়বে এক-এক রকমভাবে। সবাই সবার নিজের মতো করে বুঝে নেবে। একজন যেটাকে দেখবে কালো, অন্যজন হলফ করে বলবে ওটা ফিরোজা। একজনের মনে হবে ছবিটা আনন্দের, আর‌ একজন বলবে এ তো ফাঁকা পাতা - ছবি কই! আমি এবার থেকে শুধু উচ্চারণটুকুই করব। সেটার‌ প্রকাশ স্পষ্ট হবে না অস্পষ্ট, তার দায়ভার ছেড়ে দিলাম যারা শুনতে আসবে তাদের‌ উপরেই।


.................. 


[১২] 


পাঁচিলের দুইধারে দাঁড়িয়ে ঘাড় বেঁকিয়ে কোন্দল বাঁধাল দুটো হুলো। 'অ্যাঁও অ্যাঁও' করে তর্জনে গর্জনে আশেপাশের সব ক'টা বাড়ির লোকের দুপুরের তন্দ্রা ঘুচিয়ে দিল। এ যেন এদের একটা রুটিন ঠিক করা আছে। ঠিক এই জায়গাতেই আজব রোল তুলবে। আর সময়টাও বেছে রাখা আছে যেন! হয় দুপুরে গেরস্তবাড়িতে ভাতঘুম আসবার মুহূর্তে আর নয়তো মধ্যরাতে, যখন সকলে সবে ডুব দিয়েছে স্বপ্নের সমুদ্দুরে। সকলেই মোটের উপর কম বেশি গজগজ করে, আবার পাশ ফিরে শুয়ে পড়ে। একজনেরই অসুবিধা হয় সবচেয়ে বেশি। পাঁচিলের ডানপাশে যে বাড়িটা, ওখানে মাস সাতেক আগে ভূমিষ্ট হয়েছে একটি ছোটো মানুষ। বাকিরা পাশ ফিরে কানে চাপা দিয়ে শুয়ে পড়তে পারলেও সে বেচারি পড়ে বড্ড ফাঁপরে। তার ঘুম যে সবসময়ই কাঁচা। পাকা ঘুম কাকে বলে সে যে এখনও জেনে উঠতে পারেনি। তাই কোন্দল বাঁধতেই হাত পা ছুঁড়ে কঁকিয়ে ওঠে সে। দিন হোক বা রাত। আর ঠিক এই কারণেই হুলোগুলোকে প্রাণ ভরে গাল দেয় ছানাটির মা। প্রথম 'অ্যাঁও' উচ্চারণেই প্রমাদ গোনে সে। তড়িঘড়ি এক গেলাস জল নিয়ে ছোটে জানলার ধারে। জল ছুঁড়ে মারে, চাপা গলায় হুশ হুশ করে। কিন্তু কাজের কাজ হয় না। জানলার শিকের উপস্থিতি‌ সেই জলকে মূল গন্তব্যে ঠিকমতো পৌঁছে দিতে পারে না। আর এক গেলাস আনতে যাওয়ার আগেই কেঁদে ওঠে সাত মাসের পুঁটুলিটা। আর যাওয়া হয় না। তাড়াতাড়ি জানলা দিয়ে, বিছানায় পা ছড়িয়ে বসে ছেলে কোলে নেয়। কান্না থামাতে তার কচি মুখে স্তন গুঁজে দেয়। সন্তানকে বুকে চেপে মনে মনে শাপশাপান্ত করতে থাকে হুলোদুটোর। তাদের চোদ্দগুষ্টিকে পারলে ধরে এনে মনের ঝাল মেটায়। দিন নেই, রাত নেই মরাকান্না জুড়লেই হল! এখনও হম্বি তম্বি চলছে। ছেলে দুধের নেশায় একবার করে চোখ বোজে, আবার ওই বিদঘুটে আওয়াজে চমকে উঠে ড্যাবড্যাবিয়ে চায়। এই তো প্রায় আধঘন্টার চেষ্টায় একটু ঘুম পাড়ানো গেছিল। আবার, আবার বসে থাকো তাকে কোলে নিয়ে। 

হঠাৎ কী হল কে জানে, ক্যাঁওম্যাও আওয়াজ করে রণে ভঙ্গ দিয়ে পালায় দুই হুলো। মনে হয় কারোর জল গায়ে লেগেছে, বা কারোর লাঠির চোখরাঙানি ভয় ধরিয়েছে। আবারও একবার বিড়ালদুটোর উদ্দেশে নিঃশব্দ সুধাবাক্য বর্ষিত হয়। এখন এমন সম্পর্ক, অথচ আজ থেকে প্রায় বছরখানেক আগের দৃশ্যটা কিন্তু ছিল অন্যরকম। মা ষষ্ঠীর বাহনেরা দলে দলে ভোগ পেত দু-তিনদিন অন্তর। এই হুলোদুটিও নিঃসন্দেহে সেই দলে ছিল। আসলে তখন তো গোটা মানুষটা পেটের গহ্বরে সাঁতরাচ্ছে দিনরাত। তাকে রক্ষা করার জন্য হাতের‌ মুঠোয় কোনো অস্ত্র ছিল না। শরীরের ভিতরের অবলা প্রাণটাকে রক্ষা করতে তাই নানাবিধ টোটকা মেনে নিতে সেইসময় তেমন কোনও দ্বিধা হয়নি। এখন বিষয়টা পাল্টে গেছে। যে ছিল অন্তরালে, সে তো এখন জলজ্যান্ত হাতের নাগালে। মায়ের বুকের ওম‌ তাকে ঘিরে থাকে সর্বক্ষণ। আজ তাকে রক্ষা করার উপায় নিজের হাতেই। তাই এখন আর মা ষষ্ঠীর বাহনকে অবজ্ঞা করতে তেমন বুক কাঁপে না।


একে তো বারেবারে ঘুম পাড়াতে হাত, ঘাড়, পিঠ, কোমর সব ধরে যায়। তার উপরে সারাদিনের ঝঞ্ঝাট মিটিয়ে একটুখানি রং-তুলি হাতে বসতে পেরেছিল ছানার‌ মা। হয়তো আঁকা হত, হয়তো বা হত না। তবু, চেষ্টা তো করা যেত। দুপুরের সময়টা ঘন্টাদুয়েক ঘুমায় ছেলেটা। সেই অবসরে একটিমাত্র মরচে পড়ে যাওয়া শখের গা থেকে ধুলো ঝাড়ার চেষ্টা। আর তারপর সামান্য একটু বিশ্রাম। এবার যেটা হল তাতে বেছে নিতে হবে শখ আর বিশ্রামের মধ্যে যে কোনও একটিকে। আর সদ্যোজাতের মায়ের কাছে শখের চেয়ে ক্ষণিক আরামের প্রতি টানটাই যেন বেশি অনুভূত হয়।  যদ্দিন পেটের ভিতর ছিল, আরাম করতে দিয়েছে ভরপুর। শখের ডালিও একেবারে শূন্য হয়ে ছিল না। সংসারের কাজের অবসরে, আরামের অবসরে বহুদিনের অনভ্যাসের তুলি আবার উঠে এসেছিল হাতে। মধ্যবিত্ত সংসারে সারাজীবন গৃহিণীকে খেটে মরতে হলেও যেই সে ধারণ করে বংশের বাতি - কিছুদিনের জন্য আদর-আহ্লাদ বেড়ে যায় তার, সে পরিবার পরিজনের কাছেই হোক বা নিজের কাছেই হোক। তখন আপনিই মেলে সংসারের কাজকে অবজ্ঞা করে আরাম নেওয়ার অনুমতি। সেই সূত্রেই আবার কী মনে করে আঁকা শুরু হয়েছিল নতুন উদ্যমে। মনে মনে ঠিক করে নিয়েছিল আর কোনোদিন হাত থেকে নামবে না তুলি। আঁকাবাঁকা হোক, নিটোল হোক, এবরোখেবড়ো হোক, রংচটা হোক, বিচ্ছিরি হোক কী ভালো - যাই হোক না কেন, পাতার পর পাতা আঁকা চলতেই থাকবে। মনের সুপ্ত‌ বাসনা আর কিছু দিতে পারুক বা নাই পারুক - আঁকা ছবিগুলো ছেলের জন্য সওগাতে রেখে যেতে পারবে। কিন্তু পৃথিবীর আলোতে ছেলেটার চোখ ফোটার পর থেকেই সেই সংকল্পে পড়েছে একমুঠো ছাই। প্রথম দুটো মাস তো রুদ্ধশ্বাসে কেটে গেছে। বিনিদ্র দিবারজনীর নানা সময় এই বলে নিজেকে বোঝানো হয়েছে যে ক'টা দিন তো কষ্ট করতেই হবে।‌ ছোট থেকেই তো আমাদের শুনতে হয়, 'মা হতে গেলে কষ্ট করতে হয়।'


সেই বাণী অনুসরণ করে দাঁতে দাঁত চেপে কষ্ট করে যাওয়ার চেষ্টা চলেছে অবিরত। তারপর ছানাটার ঘুমের সময়কাল একটুখানি ঠিক হতেই আবার নিজের জন্য ওটুকু করার চেষ্টা শুরু করেছিল। তা কোনোদিন হয়, বেশিরভাগ দিনই হয় না। তার জন্য কখনও রাগ হয়, কখনও দুঃখ। এই যেমন এখন রাগ আর দুঃখ দুটোই একসঙ্গে হানা দিল। গাল বেয়ে নেমে এল জলের ধারা। কেউ দেখতে পেলেই এক্ষুনি শুনতে হত, 'ছেলে কোলে করে কাঁদতে আছে? অমঙ্গল হয় যে!' তা ভাগ্যি কেউ এদিকপানে উঁকিঝুঁকি মারতে এল না এখন। নিভৃতে বসে নিঃশব্দ কান্না অচিরেই পরিণত হল ফোঁপানিতে। তা সেই মৃদু আওয়াজেও জট পাকাবার আগেই ছেলের তন্দ্রা গেল কেটে। আবার সে কান্না জুড়ল। এবারে আর কাকে দোষ দেওয়া যায়? সমস্ত রাগটাই গিয়ে পড়ল কচি মানুষটার উপরেই।

 'মেরে ফেল আমায়, মেরে ফেল। এক ফোঁটা যদি শান্তি থাকে জীবনে! ঘুমা না! আর কত জ্বালাবি আমায়। জ্বালিয়ে পুড়িয়ে শেষ করে দিবি বলেই তো এসেছিস!'  

অবলা জীব কি আর এই বকার মর্ম বোঝে? সে শুধু বোঝে এই মানুষটা তো সম্পূর্ণটাই আমার। এর সবটার উপরেই আমার অধিকার। একেই যে মা বলে ডাকতে হবে তা তো এখনও ওর কাছে স্পষ্টই নয়। সে শুধু বোঝে নিজের চাহিদাটুকু, খিদেটুকু, আরামটুকু। সে বোঝে এই মানুষটাই একমাত্র, যে পারে ওই সমস্ত কিছু তার হাতের ছোট মুঠোর মধ্যে এনে দিতে। তাই এত কটুবাক্য শুনেও তার কোনো হেলদোল হয়না। বরং উল্টে সদ্য উঠি-উঠি দাঁত দিয়ে পরম আনন্দে মায়ের স্তন চেপে ধরে। যন্ত্রনায় কঁকিয়ে উঠে বিষম রাগে মা ঠাস করে একটা চড় কষায় তুলোর চেয়েও নরম আলতো গালে। যন্ত্রণায় চিৎকার করে ওঠে ছেলে - গালে লাল দাগ বসে যায়। মেরেও যেন শান্তি হয় না, সারা শরীরে রাগের কম্পন ঘটিয়ে ফুঁসতেই থাকে। নিজের জন্য এতটুকু করার অধিকার নেই তার? এতটুকু! জ্বালাময় চোখের চাহনিকে উপেক্ষা করে এদিকে কেঁদেই চলে ছেলে। আর সেই কান্নার ভাষাই সম্বিত ফেরায় মায়ের। ছোঁ মেরে সে সন্তানকে আবার বুকে তুলে নেয়। পাগলের মত দেহের সমস্ত শক্তি দিয়ে চেপে ধরে একরত্তিকে। ছেলের ওপর জন্মানো রাগ হাজার গুণ বেড়ে গিয়ে নিজের উপরে আছড়ে পড়ে। নিজেকে পৃথিবীর নিকৃষ্টতম মা বলে মনে হয়। মনে হয়, এতো বড়ো অপরাধ ভগবান যেন ক্ষমা না করেন। আদরে, সোহাগে ভরিয়ে ঘুম পাড়ানোর তিন নম্বর চেষ্টায় মনোনিবেশ করে ছানার মা। মাথায় হাত বুলিয়ে, গায়ে সুড়সুড়ি দিয়ে সাত রাজার ধন এক মানিকের চোখে ঘুম আনার গান ধরে। ছানার চোখেও ঘুম আসে, আর এদিকে বিছানার সামান্য আরাম মাকেও হাতছানি দেয়। মনে মনে ঠিক করে আজ একটু ঘুমিয়ে নিই, কাল ঠিক আঁকতে বসব। বসবই। আজ শুধু একটু বিশ্রাম করে নিই। নিজের জন্য তো করতেই হবে কিছু, করতেই হবে। ভালো-মন্দ, রঙিন-বেরঙিন, গোটা-আধা যেমনটি হোক না কেন করতেই হবে। আজ একটু শুয়ে নিলে তেমন কোনো ক্ষতি নেই। এই ভেবে চোখ বোজে ছানার মা। তন্দ্রা লাগে, একেবারে‌‌ ঘুমের গভীরে তলিয়ে না গেলেও অসম্ভব আরামে, আলস্যে বিছানাটা আরও আঁকড়ে ধরে। আর ঠিক তখনই আবার বাইরে যুদ্ধ ঘোষণা হয়। 'অ্যাঁও, অ্যাঁও'! কিছু বুঝে ওঠার আগেই পাশে শুয়ে থাকা ছানাটা নড়ে ওঠে। এরপর কী হতে চলেছে জেনেও চোখ খুলতে ইচ্ছে করে না তার। ধীরে ধীরে কান্না শুরু হলেও চুপ করে বিছানায় স্থবির হয়ে থাকে সদ্যোজাতের সদ্য-মা। হুলোদের ডাকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে ওটুকু ছেলের চিল চিৎকার। সবটা শুনতে পেলেও উপরের দাঁতে ঠোঁট কামড়ে নিস্পন্দ হয়ে পরে থাকে বালিশ জড়িয়ে। নাহ, এটুকু আরাম যে তাকে নিজের বরাতে ছিনিয়ে নিতেই হবে। কিছুতেই এখন চোখ খোলা যাবে না। কিছুতেই না। এটুকু স্বার্থপরতার জন্য সারাটা জগৎ তার দিকে আঙুল উঁচিয়ে আসুক। সে নিজেও খানিকক্ষণ পর নাহয় শাস্তি দিক নিজেকে। কিন্তু এই মুহূর্তে কিছুতেই ক্লান্তিতে, শ্রান্তিতে, আরামে বুজে থাকা চোখের পাতা সে খুলবে না। আর একটুক্ষণ এই আরামটুকু আঁকড়ে থাকতেই হবে তাকে। আর একটুখানি। আর পাঁচটা মিনিট। পাঁচ না হোক, অন্তত আর দুটো মিনিট? 


পূর্ববর্তী পর্বগুলি পড়ুন : 


প্রলাপ (প্রথম কিস্তি) 

প্রলাপ (দ্বিতীয় কিস্তি)

প্রলাপ (তৃতীয় কিস্তি) 

প্রলাপ (চতুর্থ কিস্তি) 

প্রলাপ (পঞ্চম কিস্তি)

........................... 

অলংকরণ : ঐন্দ্রিলা চন্দ্র


#সিলি পয়েন্ট #ওয়েবজিন #Web Portal #গদ্য #প্রলাপ #সিরিজ #প্রজ্ঞা দেবনাথ #ঐন্দ্রিলা চন্দ্র

Leave a comment

All fields are required. Comment will appear after it is approved.

trending posts

newsletter

Connect With Us

today's visitors

53

Unique Visitors

121577