উপন্যাস

সম্রাট শাহজাহানের গুপ্তধন (চতুর্থ পর্ব)

তপোব্রত ভাদুড়ি April 15, 2023 at 8:02 pm উপন্যাস

[আগে যা ঘটেছে : মুম্বই মেলে হাওড়ায় আসার পথে অপরাজিতার এক সহযাত্রীর সুটকেস চুরি হয়। লোকটিকে রেলপুলিশের কাছে ডায়রি করতে পরামর্শ দিয়ে ট্যাক্সিতে বাড়ি ফেরার পথে হুমকি চিরকুট পায় অপু। পরে হৃষীকেশ কাকুর কাছে গিয়ে অপু আর ওর মাসতুতো ভাই তপু জানতে পারে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মিলিটারি অফিসার ড্যানিয়েল রিচার্ডসনের ডায়রিতে লিপিবদ্ধ সুজার চিঠির কথা, যার মধ্যে ছিল সম্রাট শাহজাহানের গুপ্তধনের সংবাদ। অন্যদিকে রায়পুরের সিমরন হেরিটেজ হোটেলে পাওয়া যায় ডেরেক রিচার্ডসনের লাশ। অপুদের প্রতিবেশী লালবাজারের পুলিশ অফিসার রিজওয়ানুর রহমানের চেষ্টায় ডেরেকের ভাড়াটে খুনি ধরা পড়লেও আসল অপরাধী থেকে যায় অধরা। রহস্য আরও ঘনিয়ে তোলে ডেরেক রিচার্ডসনের একটা নোটবুক।]

....................

সাপ্তাহিক উপন্যাস 

তৃতীয় পর্বের পর 

..................... 

‘কিথে যাওগে?’ — বৃদ্ধ সর্দারজি ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করলেন। অপরাজিতা জবাব দিল, ‘সুকিয়া স্ট্রিট।’ তর্পণ বলল, ‘আমিও এখুনি হৃষীকেশ কাকুর কথাই ভাবছিলাম।’ 


ট্যাক্সির জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে অপু বলল, ‘কেসটা ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে।’ 

তপু সায় দিয়ে বলল, ‘আমার তো গোড়া থেকেই সব কেমন গোলমেলে লাগছে। ভিকটিমের ফোন থেকেই কালপ্রিট কল করে খুনিদের সুপারি দিয়েছে— এর তো কোনও মাথামুন্ডুই বোঝা যাচ্ছে না। তারপর নোটবুকের স্ক্রিবলগুলো — ’ 

অপু জিজ্ঞাসা করল,  ‘লবণ সত্যাগ্রহের সঙ্গে ডেরেক রিচার্ডসনের কোনও কানেকশন আছে বলে তোর মনে হয়?’ 

তপু বলল, ‘দ্যাখ, সত্যি বলতে ওগুলো আমার কাছে তেমন পরিষ্কার নয়। তবে লোকটা যে বেশ আধ্যাত্মিক টাইপের ছিল, সে নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।’

অপু ব্যঙ্গের সুরে বলল, ‘আধ্যাত্মিক টাইপের?’ 

তপু জোর দিয়ে বলল, ‘তা নয় তো কী! ডিভাইন চক্র-টক্র ওসব মিস্টিক ব্যাপার৷ মূলাধার-অনাহত-সহস্রার। আমি পড়েছি। তন্ত্রে আছে।’ 

অপু বলল, ‘আমার মোটেও তা মনে হয় না। তন্ত্রসাধনা করলে কেউ অ্যাগনস্টিক হয়? আর ওই যে অ্যারাবিয়ান কুইন? সেটাও তাহলে বলতে চাস কোনও তূরীয় ব্যাপার?’ 


বাকি রাস্তা অপু আর একটাও কথা না বলে চোখ বন্ধ করে থাকল। তপু বুঝল, কিছু একটা নিয়ে ও গভীরভাবে চিন্তা করছে। এখন আর ওকে বিরক্ত করা ঠিক হবে না। কানে ইয়ারফোন গুঁজে তপু আপন মনে বেগম আখতারের গজল শুনতে লাগল। 

***

হৃষীকেশ কাকু পড়ার ঘরেই ছিলেন। পর্দা সরিয়ে ওদের ঢুকতে দেখে বললেন, ‘একেই বলে টেলিপ্যাথি! আমার মন বলছিল, তোমরা আজ আসবে।’ অপু পাখার নিচে চেয়ারটা টেনে এনে বসল। তপু বলল, ‘আমরা লালবাজারে গিয়েছিলাম। ওখান থেকে সোজা আসছি।’ কাকু বললেন, ‘আমারও অনেক খবর দেওয়ার আছে। আগে তোমাদেরগুলো শুনি।’ অপু চোখের ইশারায় তপুকে বলল বলতে। তপু গড়গড়িয়ে সব বলতে শুরু করল। 


কিছুক্ষণ পরে ফাল্গুনিকাকা ঢুকলেন দুহাতে রেকাবিভর্তি ফল আর মিষ্টি নিয়ে। হৃষীকেশ বললেন, ‘বাকি কথা পরে হবে। আগে তোমরা খেয়ে নাও।’ অপু তপুকে বলল, ‘তুই আমার মিষ্টিটা তুলে নে।’ ফাল্গুনিকাকা বললেন, ‘খুব ভালো ক্ষীরকদম। কানাইলাল ঘোষের। একটা খেয়ে দেখো।’ 


তপু বলল, ‘তুমি কিছু বলবে বলছিলে।’ 

হৃষীকেশ বললেন, ‘ডায়রিটা পড়ে শেষ করেছি। ধরে ধরে পুরোটা কপি করতে গিয়ে এত সময় লাগল। ড্যানিয়েল রিচার্ডসনের সম্পর্কে আরও কিছু খবর পাওয়া গেছে।’ 

অপু বলল, ‘ড্যানিয়েল কি শাহজাহানের গুপ্তধন পেয়েছিলেন?’ 

হৃষীকেশ বললেন, ‘সম্ভবত না। ডায়রিটা অবশ্য আঠারশো বেয়াল্লিশের। তবে তার মাঝখানে এলোমেলোভাবে কয়েকটা পাতায় অন্য বছরের কিছু এন্ট্রি আছে। বিশেষ করে শেষের দিকে। মিউটিনির কথাও দু-তিনটে জায়গায় পেয়েছি।’

কথা বলতে বলতে উঠে দাঁড়ালেন হৃষীকেশ। আলমারি থেকে ডায়রিটা বার করে আবার চেয়ারে এসে বসলেন। অপুদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘হিন্দু কলেজে ডেভিড লেস্টার রিচার্ডসন নামে এক মিলিটারি ক্যাপ্টেন মধুসূদনকে কয়েকবছর পড়িয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে ড্যানিয়েলের কোনও যোগসূত্র ছিল কি না জানতে পারিনি। তবে বেঙ্গল আর্মির উইলিয়াম হেনরি স্লিম্যানের সঙ্গে ড্যানিয়েল কয়েকবছর কাজ করেছিলেন। শ্রীপান্থর ঠগী  বইটা পড়েছ তো? সেই স্লিম্যান। ড্যানিয়েল এখানে তেসরা নভেম্বর লিখেছেন, ঠগীদের পাকড়াও করতে গিয়েই সুজার চিঠিখানা ওঁর হাতে আসে।’


ডায়রি খুলে তেসরা নভেম্বরের পাতাটা বার করে হৃষীকেশ অপুদের দেখালেন। তারপর আবার বলতে লাগলেন, ‘এইট্টিন ফিফটি সিক্সে স্লিম্যান দেশে ফেরার জন্য জাহাজে চাপেন। জাহাজেই মৃত্যু হয়। ড্যানিয়েল তখন লখনউতে। মিউটিনির বছরে তিনি ছিলেন ফৈজাবাদে। ডায়রির একেবারে শেষপাতায় মোতি মহলের একটা বিউটিফুল স্কেচ আছে। তলায় তারিখ দিয়েছেন আঠাশ বারো সাতান্ন।’ 


খাওয়া শেষ করে অপু মোবাইল থেকে কাকুকে নোটবুকের ছবিগুলো দেখাল। হৃষীকেশ মন দিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলেন। 

তপু বলল, ‘তোমাকে এগুলো হোয়াটস্যাপ করে দেব?’ 

কাকু বললেন, ‘দরকার নেই। আমার মনে থাকবে।’ 

অপু ফোন রেখে বলল, ‘তুমি কিছু বুঝতে পারলে?’ 

হৃষীকেশ কাকু বললেন, ‘সময় নিয়ে ভালো করে ভাবতে হবে। তবে অ্যারাবিয়ান কুইনটা একটু খটকা লাগছে। ইংরেজিতে তিনটে আলাদা অ্যাডজেকটিভ আছে, জানো তো? অ্যারাবিয়ান, অ্যারাবিক আর অ্যারাব। অ্যারাবিয়ান শব্দটার ব্যবহার হয় ভৌগোলিক ব্যাপারের ক্ষেত্রে। অথবা আরব দেশের কোনও নামজাদা জিনিস বোঝাতে। যেমন ধরো, অ্যারাবিয়ান ওশ্যান, অ্যারাবিয়ান পেনিনসুলা, অ্যারাবিয়ান নাইটস কিংবা এই যে — অ্যারাবিয়ান ডেটস্। আর অ্যারাবিক কথাটা মূলত ভাষার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কিং, কুইন, পোয়েট, লিডার— এইরকম পদের আগে বসবে অ্যারাব। ইতিহাসে এক অ্যারাব কুইনের কথা পড়েছি বটে৷ তাঁর নাম হচ্ছে মাওয়িয়া। কিন্তু অ্যারাবিয়ান কুইন বললে বুঝতে হবে কুইন এখানে মেটাফর। অন্য কিছু।’

অপু বলল, ‘রিজওয়ানুর কাকুর থেকে রিচার্ডসনদের ঠিকানাটা জোগাড় করে এনেছি। তোমাকে কি দিয়ে যাব?’ 

হৃষীকেশ বললেন, ‘ভেরি গুড। দাঁড়াও, আমি লিখে নিচ্ছি।’ 

ঠিকানা লিখতে লিখতে কাকু বললেন, ‘আমার কলেজের ক্লাসমেট অমলকান্তির বাড়ি ইলিয়ট লেনে। জিপিওতে কাজ করে।’ 


অপুকে ওর নোটবুকটা ফিরিয়ে দিয়ে হৃষীকেশ বললেন, ‘তোমাদের আরও একটা কথা বলার আছে। ডায়রিটা যার কাছ থেকে পেয়েছি, পরশু বিকালে তার কাছে একটা খোঁজ নিতে গিয়েছিলাম। সামান্য হাজারখানেক টাকার জন্য এমন অমূল্য একটা জিনিস হঠাৎ বিক্রি করে দিল কে। নিতাই আমাকে লোকটার নাম বলতে না পারলেও পদবিটা বলতে পেরেছে। রিচার্ডসন।’

***

ঘড়িতে এখন কাঁটায় কাঁটায় দুটো। ইলিয়ট রোডে হৃষীকেশ প্রায় আট বছর পর এলেন। শেষবার এসেছিলেন অমলের ছোটো ছেলের মুখেভাতে। লম্বা রাস্তা। এ-মুড়ো থেকে ও-মুড়ো অনেকটা৷ তবে ষোল বাই দুই খুঁজে বার করতে খুব বেশি সময় লাগল না। রিচার্ডসনদের ফ্ল্যাট কল্পতরু অ্যাপার্টমেন্টের চারতলায়। কলকাতায় আজকাল এই ধরনের বড় বড় অ্যাপার্টমেন্টে বেশিরভাগ সময়ে সিকিউরিটি গার্ড থাকে। এখানে নেই। হৃষীকেশ লিফটে চড়ে সোজা উঠে গেলেন উপরে। 


সিঁড়ির ঠিক পাশের ফ্ল্যাটটাই থ্রি এ। দরজার গায়ে নামধাম কিছু লেখা নেই। তবে পেরেকের দাগ দেখে বোঝা যাচ্ছে, এককালে নেমপ্লেট লাগানো ছিল। খুব সম্ভবত অল্পদিন আগেই সেটা খুলে নেওয়া হয়েছে। যে কারণে নেমপ্লেটের জায়গাটা এখনও একদম সাফসুতরো। 


ডোরবেল বাজানোর মিনিট পাঁচেক পরে একটা লোক দরজা খুলল। বছর চল্লিশ বয়স। অবাঙালি। লম্বাচওড়া পেশিবহুল চেহারা। গায়ের রং শ্যামলা। সারা মুখে বসন্তের দাগ। দুচোখে একটা শিরশিরানি-ধরানো ঠান্ডা চাহনি। 

—ক্যা চাহিয়ে?

হৃষীকেশ বললেন, ‘আমি ড্যানিয়েল রিচার্ডসনের সঙ্গে একটা দরকারে দেখা করতে এসেছি।’

—ড্যানিয়েল? ইঁহা ইস নাম কা কোই নেহি রহতা হ্যায়।

হৃষীকেশ বললেন, ‘ও হো। ভুল বলেছি। ড্যানিয়েল না, ডেনিস। ডেনিস রিচার্ডসন। আছেন?’

লোকটা বলল, ‘সাহাব আভি ডাগদরকে পাস গ্যায়ে হ্যায়। বাদ মে আইয়ে।’

—আচ্ছা৷ আমার কার্ডটা রাখুন। উনি ফিরলে দেবেন। 

হাত বাড়িয়ে ভিজিটিং কার্ডটা নিয়ে লোকটা দুম করে দরজা বন্ধ করে দিল। হৃষীকেশ সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালেন। 


***

হৃষীকেশ কাকুর বাড়ি থেকে গতকাল একটা বই নিয়ে এসেছে অপু। স্টাডিজ ইন মুঘল ইন্ডিয়া। যদুনাথ সরকারের। বেশ ছিমছাম টানটান লেখা। একটুও খটমট নয়। প্রথম চ্যাপ্টারটা সম্রাট শাহজাহানের ডেলি রুটিন নিয়ে। সকাল থেকে অনেকটা পড়া হয়ে গেছে। তপুকেও কাকু একটা বই পড়তে দিয়েছেন। আ টিয়ারড্রপ অন দ্য চিক অফ টাইম। ওরা ঠিক করেছে, নিজেরটা পড়া হয়ে গেলে বইদুটো পালটাপালটি করে পড়বে। 


তপুর কথা মনে হতেই হঠাৎ শ্রীমান তর্পণের ফোন। 

—উঠেছিস?

অপু বলল, ‘হুঁ, কী বলবি বল।’

—সূর্যের সারথি। তিন অক্ষরে। বলতে পারবি চট করে? আনন্দবাজারের শব্দছক করছিলাম। মাঝখানে র-এ হ্রস্ব উ দিয়ে উপরে-নিচে আছে — ছিল ড্যাশ, হয়ে গেল একটা বেড়াল। মানে রুমাল।

—অরুণ।

—শিওর তো? আচ্ছা, এখন রাখলাম। 


ঠাকুরঘর থেকে সকালবেলার পুজো সেরে মা একটু আগে নিচে নেমেছে। অপুর ঘরে উঁকি দিয়ে বলল, ‘চিঁড়ের পোলাও খাবি?’ অপু বলল, ‘যা হোক একটা কিছু খেলেই হয়।’ মায়ের পিছু পিছু ও রান্নাঘরে এসে দাঁড়াল। 

—কী রে? বলবি কিছু?

—আরবি বললেই সবচেয়ে আগে তোমার কী মনে হয়?

—কেন? আরবি ঘোড়া। আমার দাদামশায়ের ছিল। দিদিমার কাছে গল্প শুনেছি। দাদামশাই নাকি রাজশাহিতে ঘোড়ায় চেপে রুগি দেখতে যেতেন।


ঘরে এসে তপুকে ফোন করল অপু।

—তুই আজ বিকালে ফ্রি আছিস?

—হ্যাঁ, কেন বল তো?

—চারটের সময় হেস্টিংসে একবার আসতে পারবি? দরকার আছে।

—আচ্ছা, পৌঁছে যাব।


***

আজ শনিবার। রেসকোর্সের সামনে থইথই ভিড়। অপুদের দেখে একগোছা ক্যাটালগ হাতে এগিয়ে এল দুটো ছেলে। একখানা ক্যাটালগ কিনে উলটেপালটে দেখতে দেখতে অপু বলল, ‘যা সন্দেহ করছিলাম তাই। তোর ডিভাইন চক্র। বারো নম্বরে। আর এই যে — মহাত্মা গান্ধির ডান্ডি সত্যাগ্রহ।’


(চলবে)


আগের পর্বগুলি পড়ুন

১) সম্রাট শাহজাহানের গুপ্তধন (প্রথম পর্ব) 

২) সম্রাট শাহজাহানের গুপ্তধন (দ্বিতীয় পর্ব) 

৩) সম্রাট শাহজাহানের গুপ্তধন (তৃতীয় পর্ব)

.............................. 

[অলংকরণ : বিবস্বান] 



#ধারাবাহিক উপন্যাস #রহস্য উপন্যাস #তপোব্রত ভাদুড়ি #সম্রাট শাহজাহানের গুপ্তধন #silly পয়েন্ট

Leave a comment

All fields are required. Comment will appear after it is approved.

trending posts

newsletter

Connect With Us

today's visitors

46

Unique Visitors

181448