ভ্রমণ

লাট্টু পাহাড়ের দেশে

অনীশ দাস Jan 10, 2021 at 5:08 am ভ্রমণ ১৮৯

এক ভাইরাসের জন্য সমগ্র জগতের ঘড়ি যেভাবে বন্ধ হয়ে গেছে, তাতে নিজেকে সেই খাঁচার পাখির মতো মালুম হচ্ছে। এই আধমরা হয়ে বেঁচে থাকার জীবনে যদি কেউ জিজ্ঞেস করে, "তুমি কী চাও?" আমি একমুহূর্তও না ভেবে উত্তর দেব, "দাদা, আমি বাঁচতে চাই, বাঁচতে দাও..." এমতাবস্থায়, একটু অক্সিজেনের খোঁজে, হঠাৎ চার বন্ধুতে ঠিক করলাম কোথাও ঘুরতে যাওয়া যাক। কোথায় যাওয়া যায় ভাবতে ভাবতে হঠাৎ নাম এল, শিমুলতলা।

অবশেষে পঁচিশে ডিসেম্বরের বিকেলে সবাই যখন চার্চে যায়, কেক খেয়ে বড়দিন পালন করতে থাকে, আমি তখন বাক্স-প্যাঁটরা গুছিয়ে রওয়ানা দিলাম হাওড়ার উদ্দেশে। অবশেষে রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে হাওড়া থেকে যাত্রা শুরু। ট্রেন পৌঁছাবে পরদিন ভোর ৪টে ২০ মিনিটে। এই হতভাগা ভাইরাস এখানেও শান্তি দিল না। এমনিতে সরাসরি শিমুলতলা পৌঁছানো যায় হাওড়া থেকে, কিন্তু আজকের এই "নিউ নর্মাল" সময়ে সব সাধারণ ট্রেন বন্ধ করে কিছু সংখ্যক স্পেশাল ট্রেন চলার কারণে আমাদের নামতে হল ঝাঁঝায়। ঝাঁঝা থেকে শিমুলতলা অটোয় ৪০-৪৫ মিনিটের রাস্তা। মনে মনে প্রার্থনা করছি যাতে দেড়-দু ঘণ্টা লেট করে পৌঁছানো যায়, কিন্তু বিধি বাম। হতচ্ছাড়া ট্রেন লেট তো দূর, প্রায় চল্লিশ মিনিট আগে পৌঁছে দিল ঝাঁঝায়। অগত্যা দু ঘণ্টা স্টেশনে বসে থেকে প্রায় ছটার সময়ে বাইরে বেরোলাম। তারপর সেখান থেকে অটো নিয়ে সোজা যশোদা ধাম। 

বহু চেষ্টা করেও আমি বোধহয় এই অটোর রাস্তাটা জীবনে ভুলতে পারব না। স্টেশন থেকে বেরিয়ে দু মিনিটের মধ্যেই জঙ্গলের রাস্তায় ঢুকলাম, আর অটোর দুদিক প্লাস্টিক দিয়ে ঢাকা থাকা সত্ত্বেও মনে হল যেন পাশে বরফ পড়ছে। একরকম জমে গিয়ে পৌঁছলাম যশোদা ধামে। সেখানে গিয়ে শুনি আর-এক বিপদ! একটাও ঘর ফাঁকা নেই। কী আর করা যাবে, এটা তো ওই "উঠল বাই, তো শিমুলতলা যাই" টাইপের ব্যাপার, তাই এসব খুবই স্বাভাবিক। হঠাৎ করে ওই যশোদা ধামের ম্যানেজার বজরংজি আমাদের বললেন, "আইয়ে হামারে সাথ, দেখতে হ্যায় হাম।" দু-তিন মিনিট দূরে একটা বাড়ির সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দিলেন। জানলাম, সেটা কলকাতার একজনের বাড়ি, ফাঁকা থাকে, তাই ওটায় ব্যবস্থা করা যেতে পারে। অবশেষে সেই বাড়িতেই থাকার ব্যবস্থা হল।


যত বেলা বাড়ল, ছোট গ্রামটা ধীরে ধীরে যেন জেগে উঠল। প্রাতরাশ সেরে ঘরে এসে একটু পরিষ্কার হওয়ার পালা। ইতিমধ্যে অটোর ব্যবস্থা করা হল, যে সারাদিন আমাদের ঘুরিয়ে দেখাবে শিমুলতলা। ঘুরতে বেরিয়ে যেটা প্রথমে লক্ষ করলাম, সেটা হল রাস্তা। ছোট্ট গ্রামটার সরু গলি থেকে বড়ো রাস্তা সব একদম ঝকঝকে এবং নতুন। ওরকম গ্রাম্য জায়গায়, যেখানে আমি দুদিনে একটা ডাক্তারখানা দেখিনি, সেখানে রাস্তাঘাট এত চকচকে এবং অক্ষত হবে, সেটা না দেখলে বিশ্বাস করা একটু কষ্টকর। এরকম সুন্দর রাস্তা দিয়ে প্রায় ৪০-৪৫ মিনিটে আমরা গিয়ে পৌঁছালাম আমাদের প্রথম গন্তব্যে। 


ব্যক্তিগতভাবে পাহাড়, ঝরনা, জলপ্রপাত, এসব জায়গা আমার প্রচণ্ড প্রিয়। তাই প্রথম যে জায়গায় গেলাম, সেখানে যাওয়ামাত্র আমি শিমুলতলার প্রেমে পড়লাম, বা বলা ভালো প্রেমে পড়তে একপ্রকার বাধ্য হলাম। কাছাকাছির মধ্যে আমার দেখা অন্যতম সেরা জলপ্রপাত এটি। হ‍্যাঁ, আপনি ধারারা জলপ্রপাতে ভুটান সীমান্তের বিন্দু-ঝালংয়ের মতো স্রোত বা বরফশীতল জলধারা পাবেন না হয়তো, কিন্তু যা পাবেন তা নেহাত মন্দ না। বিস্তীর্ণ অঞ্চল রয়েছে, জলপ্রপাতের মৃদু শব্দ রয়েছে, বেশ মনোরম একটা দৃশ্য রয়েছে যা নিঃসন্দেহে যে-কোনো কলকাতাবাসীর চোখের পক্ষে অতীব আরামদায়ক।


জলপ্রপাত তো হল, এবার একটু পাহাড় না হলে ঠিক জমছে না। ধারারা থেকে ফিরে আবার সেই অটো ধরলাম। জঙ্গল ও গ্রামের মধ্যে দিয়ে সরু রাস্তা চলে গেছে, আমরাও যথারীতি টুকটুক করে সেই রাস্তা দিয়ে চলতে থাকলাম। তবে এবারের যাত্রা স্বল্পক্ষণের। মিনিট কুড়ি যেতেই দেখতে পেলাম সুন্দর এক পাহাড়। তার নামটাও ভারী সুন্দর, লাট্টু পাহাড়। পাহাড়ের গা বেয়ে গোল হয়ে রাস্তা চলে গেছে কিছুদূর অবধি। আমাদের অটো সেই অব্দি পৌঁছে দিল। তারপরের পথটুকু সিঁড়ি ধরে যেতে হবে। যদিও গুনিনি, তাও আন্দাজ ৬০-৭০টা সিঁড়ি উঠে পৌঁছলাম লাট্টু পাহাড়ের চূড়ায়। চূড়ায় একটা ছোট শিবমন্দির। যাত্রাপথের বিবরণ তো দিলাম, তবে এই যাত্রার সবথেকে ভালো জায়গা হল এই চূড়াটি। লাট্টু পাহাড়ের চূড়া থেকে চারপাশটা অদ্ভুত সুন্দর লাগে। মৃদু বাতাস, মিঠে রোদ আর এরকম মনোরম পরিবেশের মেলবন্ধন লাট্টু পাহাড়ের সৌন্দর্য কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। এখান থেকে পরিষ্কার দেখা যায় শিমুলতলা রাজবাড়ি ও তার চারপাশ। পাহাড়ের মাথায় কিছুক্ষণ কাটিয়ে নেমে এসে চললাম সেই রাজবাড়ির উদ্দেশে। রাজবাড়ির বিশেষ কিছুই অক্ষত নেই এখন। শুধু বাইরে থেকে দেখা এবং মাত্র ১০-১৫ পা অব্দি সিঁড়ি দিয়ে ওঠা সম্ভব।


ফিরে এসে দেখি গরমাগরম মাংস ভাত আমাদের পেটে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। সেগুলির অপেক্ষার অবসান ও আমাদের তৃপ্তির ব্যবস্থা করে, ফিরে চললাম বাড়িটিতে। এই এতদিন বাড়িতে বসে থেকে কি আর এত হাঁটাহাঁটি সহ্য হয়? অতএব লম্বা এক ঘুম। ঘুমিয়ে উঠে দেখি সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা বাজে। ভাবলাম একটু বাইরে যাওয়া যাক, কিন্তু বাইরে বেরিয়ে মনে হল যেন রাত বারোটা বাজে। চারিদিক শুনশান, প্রায় সব দোকান বন্ধ। অতএব মিনিট দশেক থেকেই আবার ঘরে।


পরদিন আমাদের গন্তব্য হলদি ঝরনা। রওনা দেওয়ার কিছু সময়ের মধ্যেই আমরা রাস্তা থেকে মেঠো পথে নামলাম এবং দুলতে দুলতে জায়গায় পৌঁছলাম। সেখান থেকে পাহাড়ের কোলের সরু উঁচুনিচু রাস্তা ধরে হেঁটে, বেয়ে, লাফিয়ে অবশেষে পৌঁছলাম হলদি ঝরনায়। এখানে পৌঁছে সবাই একসঙ্গে আশাহত হলাম। কারণ ইতিমধ্যে ইন্টারনেটে আমরা অতি সুন্দর হলদি ঝরনার ছবি দেখে এসেছি, কিন্তু এখানে এসে দেখি পাহাড়ের গা বেয়ে সরু হয়ে জল পড়ছে, এবং সেটাই হলদি ঝরনা। আবারও উদাহরণ পেলাম যে Expectation doesn't match upto reality, এবং আমাদের সেই বাস্তবতাকে সঙ্গে নিয়েই চলতে হয়। হলদি ঝরনা, ঝরনা হিসেবে বিশেষ উল্লেখযোগ্য না হলেও, স্থান হিসেবে মন্দ নয়। এবং এই খারাপ লাগার মধ্যেও যেটা একমাত্র ভালো লাগল, সেটা হল এই ঝরনার জল। হলদি ঝরনার জল মিষ্টি ও অতি সুস্বাদু। অবশেষে আর কিছু না পেয়ে এই জল বোতলবন্দি করেই আমরা ফিরে চললাম।


দুপুরে খেয়ে একটু বিশ্রাম নিয়েই শুরু করলাম ফেরার প্রস্তুতি। অবশেষে সন্ধ্যা সাতটায় বেরিয়ে আবার সেই জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে হাড়কাঁপানো শীত সহ্য করে ফিরে এলাম ঝাঁঝায়। কিছুক্ষণের অপেক্ষা, তারপর ট্রেন এবং যাত্রা শেষ!


সারা সপ্তাহের অবিরাম খাটুনির পর যদি কোনোভাবে দুটো দিনের জন্য ছুটি পাওয়া যায়, আর আপনি যদি নির্জনতায় হারিয়ে যেতে চান, শিমুলতলা আপনার ভালো লাগতে বাধ্য। এখানে বুক ভরে নেওয়ার মতো বিশুদ্ধ বাতাস পাবেন, আশেপাশে গুটিকয়েক সরল মানুষ পাবেন, ধারারার মতো ঝরনা পাবেন, লাট্টু পাহাড়ের মতো সুন্দর ছোট পাহাড় পাবেন, আর পাবেন অতি সুস্বাদু খাদ্য, যদি আপনার সঙ্গে বজরংজি থাকেন। এই দেখেছেন, একদম ভুলে গেছি! ওই যে বলেছিলাম যশোদা ধাম, তার ম্যানেজার বজরংজি। আমাদের খাবারের পুরো ব্যবস্থা তিনিই করেছেন। অল্প টাকায় একদম বাড়ির মতো রান্না, যা চাইবেন তাই পাবেন। মিষ্টভাষী, পরোপকারী মানুষটা এককথায় অসাধারণ। ও হ‍্যাঁ, এটাও বলে রাখি, যদি দুজনে যান, পকেটে একটা করে গোলাপি নোট থাকলেই যথেষ্ট। আমরা চারজন ছিলাম তাই আর-একটু কম লেগেছে, চারজন পুরো ব্যাপারটা শেষ করেছি প্রায় সাড়ে ছয় হাজারের মধ্যে।

আরও পড়ুন : মেঘ-পাইনের কোলে : তিনচুলে / অর্ক দত্ত

পুনশ্চ: ইন্টারনেটে হলদি ঝরনার নামে যে ছবিগুলো আছে, সেগুলো ধারারা জলপ্রপাতের, আর সেটা দেখেই যত সমস্যার উৎপত্তি। তাই ওসব দেখে আশা করে যাবেন না। 

........................................... 

[ছবি : লেখক] 


#শিমূলতলা #বিহার #পাহাড় #নদী #ঝরনা #Weekend Tour #Weekend Tour from Kolkata #Budget Tour #ভ্রমণ #হলদি ঝরনা #লাট্টু পাহাড় #অনীশ দাস #সিলি পয়েন্ট

Leave a comment

All fields are required. Comment will appear after it is approved.

trending posts

newsletter

Connect With Us

today's visitors

56

Unique Visitors

121579