ব্যক্তিত্ব

বাঙালি পণ্ডিতের রোমাঞ্চকর তিব্বত-অভিযান : পুথি-সংগ্রাহক শরৎচন্দ্র দাস

মন্দিরা চৌধুরী 22 days ago ব্যক্তিত্ব ৪০

তাঁর তিব্বত-অভিযান নিয়ে অক্লেশে লেখা যেতে পারে দুর্দান্ত থ্রিলার কাহিনি। কয়েক-পর্বের ওয়েব সিরিজের জন্য দারুণ উপযোগী হতে পারে তাঁর রোমাঞ্চকর জীবন।

দার্জিলিং স্টেশনের কাছে একটি ভগ্নপ্রায় বাড়ি দেখা যায়, নাম লাসা ভিলা। অনেক পর্যটকেরই চোখ টানে বাড়ি আর বাড়ির নাম, কিন্তু ওই পর্যন্তই। ওই বাড়ি যে ইতিহাসের মস্ত এক দলিল, সে খবর আমরা রেখে উঠতে পারিনি। বাড়িটি তৈরি করেছিলেন শরৎচন্দ্র দাস। এই শরৎচন্দ্র দাস বাঙালির ইতিহাসে খুব চর্চিত নাম নন, যদিও তাঁর কৃতিত্ব যথেষ্ট চর্চার দাবি রাখে। 

শরৎচন্দ্রের স্পষ্ট ব্যক্তিপরিচয় জানা যায়, কিন্তু তাঁর পেশা যে আসলে কী ছিল সেই রহস্যের সমাধান আজও হয়নি। শরৎচন্দ্রের জন্ম ১৮৪৯ সালে চট্টগ্রামের আলমপুর জেলায়। ছাত্র হিসেবে তিনি ছিলেন মেধাবী, স্কুলের পড়াশোনার শেষে ভর্তি হন প্রেসিডেন্সি কলেজে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার জন্য। কিন্তু পরীক্ষার সময়ে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া তিনি শেষ করতে পারেননি। এরপর কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞানের শিক্ষক সি.বি. ক্লার্কের ব্যবস্থাপনায় দার্জিলিংয়ে একটি আবাসিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের কাজ পান। তখন তাঁর বয়স পঁচিশ বছর। এই কাজে যোগ দেওয়ার পর আস্তে আস্তে শরৎচন্দ্রের জীবনের গতিপথ বদলে যায়। স্কুলের ছাত্ররা বাংলা বা ইংরেজি ভাষা বোঝে না, তাদের মাতৃভাষাতেই স্বচ্ছন্দ তারা। আবার তাদের হেডমাস্টারমশাইও তাদের ভাষা বোঝেন না। কিন্তু এই ভাষার ব্যবধানকে শরৎচন্দ্র ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের প্রতিবন্ধক হতে দেননি, আগ্রহী শিক্ষক আস্তে আস্তে রপ্ত করে ফেললেন ছাত্রদের ভাষা। সিকিমের তৎকালীন রাজা, মন্ত্রী, অমাত্যরাও ইংরেজি শেখাতে তাঁদের ছেলেদের পাঠাতেন সেই ভুটিয়া বোর্ডিং স্কুলে। ফলে রাজপুরুষদের সঙ্গেও শরৎচন্দ্রের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

স্কুলে যোগ দেওয়ার বছর দুই পরে ছুটির সময়ে শরৎচন্দ্র ছাত্রদের শিক্ষামূলক ভ্রমণের জন্য নিয়ে গেলেন পাশের দেশ সিকিমে। সেখানকার পেমিয়াংচি মঠের পুজোর আচার-অনুষ্ঠান, লামাদের জীবনযাত্রা তাঁর মনে তান্ত্রিক বৌদ্ধ ধর্ম সম্পর্কে  আগ্রহ জাগিয়ে তোলে। আরও গভীরভাবে এই ধর্মাচরণ জানার জন্য আগ্রহী হয়ে পড়েন তিনি। এখানে তাঁর আলাপ হয় কয়েকজন তিব্বতি লামার সঙ্গে। বৌদ্ধ ধর্ম আরও গভীরভাবে জানবার জন্য তিনি মনস্থ করেন তিব্বত যাবেন। কিন্তু তিব্বতে প্রবেশ তখন বাইরের দেশের মানুষের জন্য নিষিদ্ধ। তবে 'ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়' এই প্রবাদটা সত্যি প্রমাণ করার জন্যই সেসময়ে শরৎচন্দ্র খবর পান তিব্বতের পাঞ্চেন লামার প্রধান সহকারী তাশি লামা হিন্দি আর ইংরেজি ভাষা শিখতে চান। সিকিমের পেমিয়াংচি মঠের লামা উগ্যেনগিয়াতসোর সঙ্গে তখন শরৎচন্দের বেশ ভালো আলাপ। সেই সূত্রে উগ্যেনগিয়াতসোর সঙ্গে তিনি পৌঁছলেন তিব্বতের তাশিলুনপো মঠে। শরৎচন্দ্র বৌদ্ধধর্ম নিয়ে বিস্তর পড়াশুনা করেছিলেন। রপ্ত করেছিলেন চোস্ত তিব্বতি ভাষা। ফলে সমসাময়িক অন্যান্য পর্যটক-অভিযাত্রীদের চেয়ে তিনি ছিলেন বেশ খানিক এগিয়ে।  তবুও কঠিন ছিল সেই যাত্রাপথ, পদে পদে বিপদ। পথে পার হতে হবে কাঞ্চনজঙ্ঘা। ১৮৭৯ সালে এক বাঙালি দেশ দেখার নেশায়, নতুন ধর্ম চেনার লক্ষ্যে স্থির থেকে পার হলেন কাঞ্চনজঙ্ঘার বিপদসংকুল গিরিপথ। যে শৃঙ্গে আরো ছিয়াত্তর বছর পর পা দিয়ে প্রথম অভিযাত্রীর তকমা অর্জন করবে দুই ব্রিটিশ পর্বতারোহী জো ব্রাউন আর জর্জ ব্যাণ্ড। সব বিপদ অতিক্রম করে চাং থাং পেরিয়ে শরৎচন্দ্র আর উগ্যেনগিয়াতসো প্রবেশ করলেন তিব্বত সীমান্তে। 

এইটা ছিল শরৎচন্দ্রের প্রথম তিব্বত যাত্রা। তিব্বতি সংস্কৃতিতে আগ্রহী শরৎচন্দ্র সে যাত্রায় প্রায় ছয় মাস ছিলেন পাঞ্চেন লামার তাশি লুনপো মঠে। ভারতে হারিয়ে-যাওয়া নানা বৌদ্ধ গ্রন্থের অনুলিপি করে নিয়ে এসেছেন দেশে, তার মধ্যেই ব্রিটিশ সরকারকে তিব্বত দেশটা নিয়ে প্রচুর তথ্য সরবরাহ করছেন। ভারতের তৎকালীন সার্ভেয়ার জেনারেল বাবু শরৎচন্দ্র দাসের পাঠানো রিপোর্ট সম্বন্ধে লিখছেন, ‘ওঁর পাঠানো প্রতিটি তথ্য মূল্যবান, মানচিত্র তৈরিতে কাজে দেবে।’ অচেনা দেশকে জানতে গেলে, দখল করতে গেলে প্রথমেই দরকার তার মানচিত্র। ব্রিটিশ সরকার শরৎচন্দ্রকে তাদের মতো ব্যবহার করছে। এর মধ্যেই আবার শরৎচন্দ্র জেনে নিচ্ছেন বৌদ্ধ ধর্মের বিভিন্ন অলিগলির তথ্য, উদ্ধার করছেন তিব্বতি ভাষায় লেখা বিভিন্ন সংস্কৃত পুঁথি। পাঞ্চেন লামার মঠে খুঁজে পেয়েছেন তিব্বতি হরফে দণ্ডীর কাব্যাদর্শ, কাশ্মীরি কবি ক্ষেমেন্দ্রের ‘অবদানকল্পলতা’ ও চান্দ্র ব্যাকরণের প্রাচীন পুঁথি। এই সমস্ত পুঁথির অনুলিপি করে ভারতে নিয়ে এসেছিলেন তিনি।

প্রথম অভিযান থেকে ফেরার বছর দুই বাদে ফের দার্জিলিং থেকে তিব্বত রওনা দিলেন শরৎচন্দ্র ও উগ্যেন। এ বার চোদ্দ মাসের সফর। তাশি লুনপোয় ফের পরিচিতদের সঙ্গে দেখা। তাশি লুনপোয় পাঁচ মাস থেকে শরৎচন্দ্র যান লাসা শহরে। দু’মাস লাসায় থাকার পর একদিন পরিচিত এক তিব্বতি লামা তাঁকে নিয়ে গেলেন পোতালা প্রাসাদে, দলাই লামার দর্শন করাতে। ছয় ফুট লম্বা, চার ফুট উঁচু সিংহাসনে বাবু হয়ে, করজোড়ে উপবিষ্ট তদানীন্তন আট বছর বয়সী শিশু ত্রয়োদশ দলাই লামা। শরৎচন্দ্র প্রণামী হিসেবে শিশুর কোলে রেখে দিলেন এক তোলা সোনা। পরে আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছিলেন, ‘ফুটফুটে শিশুটির চোখে যেন ক্লান্তির ছাপ। রোজ রাজসভার এই বাঁধাধরা রিচ্যুয়াল, ধর্মীয় আচার নিশ্চয় ক্লান্ত করে তাকে!’ দ্বিতীয় সফরে গিয়ে তিনি তিব্বতের জীবনযাপন ও সংস্কৃতি নিয়ে অসংখ্য নোট রেখেছিলেন যা ‘Journey to Lhasa and Central Tibet’ নামে বই আকারে পরে প্রকাশিত হয়। বইটি ১৮৮৫ সালে মুদ্রিত হলেও ব্রিটিশ সরকার বইটির প্রকাশ কয়েক বছর বন্ধ রেখেছিল। এমন সময়ে হঠাৎ করেই লাসায় দুরারোগ্য মহামারির প্রাদুর্ভাব ঘটে। শরৎচন্দ্র একরাতেই লাসা ছেড়ে ভারতের পথে পাড়ি দিলেন। তাঁর লাসা ত্যাগের কয়েকদিন পরই তিব্বতের প্রশাসন তাঁর তিব্বত প্রবেশ সম্পর্কে জেনে যায় এবং তাঁকে আটক করার জন্য সীমান্তে পরোয়ানা পাঠায় কিন্তু তার আগেই তিনক তিব্বত সীমান্ত অতিক্রম করে দার্জিলিং পৌঁছে যান। পরে লাসায় তাঁকে আশ্রয় দানকারী প্রধান লামা এবং আরও অনেক তিব্বতীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।


শরৎচন্দ্রের তিব্বত অভিযানের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে মতভেদ আছে। কেউ বলেন তিনি ব্রিটিশদের গুপ্তচর হিসেবে তিব্বত গিয়েছিলেন, কেউ বলেন তিনি নিছক অ্যাডভেঞ্চারের নেশাতেই তিব্বত গিয়েছিলেন, আবার এমনও হওয়া সম্ভব যে তান্ত্রিক বৌদ্ধ ধর্মের গভীরতর পরিচয় অনুসন্ধান ছিল তাঁর উদ্দেশ্য। 

আরও পড়ুন : টোকিও থেকে আজাদ হিন্দ ফৌজ : বিপ্লবী 'আশা সান'-এর ডায়েরি এবার ইংরেজিতে / আহ্নিক বসু

তিব্বতি সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রায় আগ্রহী শরৎচন্দ্র আরও একটি কাজ করেছেন। চলার পথে প্রতিটি পাহাড়, নদীনালা ও ভূপ্রকৃতির বৈশিষ্ট্য কাগজে লিখে নিয়েছেন, লাসায় আসার পথে চুম্বি উপত্যকা, ‘ইয়ামদ্রোক সো’ হ্রদে জরিপ করেছেন। টুকে নিয়েছেন কাঞ্চনজঙ্ঘা এলাকার হরেক পাহাড় ও পথের পরিচয়। পরে সেইসব তথ্য পাঠিয়েছেন ভারত সরকারকে। লর্ড কার্জনের আমলে ব্রিটিশ সেনাপতি ইয়ংহাজব্যান্ড এই সব তথ্যের ওপর নির্ভর করেই তিব্বত দখলের জন্য অগ্রসর হয়েছিলেন। লাসা সফরের পর তিনি গিয়েছিলেন চিনের পিকিং (বর্তমান বেজিং) শহরে। উদ্দেশ্য ছিল কোলম্যান মেকলে নামে এক ব্রিটিশ কূটনীতিককে সাহায্য করা। কোলম্যান লাসা শহরে ব্রিটিশ দূতাবাস খুলতে যাওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছিলেন, পিকিং শহরে তাই ঘাঁটি গেড়ে বসেছিলেন। চিনের রাজধানীতে বাঙালি শরৎচন্দ্র এ বিষয়ে তাঁর প্রধান সাহায্যকারী। সেই দূতাবাস খোলা আর হয়নি। কিন্তু শরৎচন্দ্র দাসের পরিশ্রমী তথ্য থেকে ব্রিটিশরা এ ভাবেই নানা সাহায্য পেয়েছে। 

আরও পড়ুন : বন্দী-জীবনে মুক্তির উড়াল : বিপ্লবী শচীন্দ্রনাথ সান্যাল ও তাঁর কারাজীবনের আখ্যান / মৃণালিনী ঘোষাল

ব্রিটিশ সরকার শরৎচন্দ্রকে ‘রায়বাহাদুর’ খেতাব, ‘অর্ডার অব ইন্ডিয়ান এম্পায়ার’-এ ভূষিত করেছে তাঁর নিরলস কাজের জন্য। হিমালয়ের খুঁটিনাটি অজানা ভৌগোলিক তথ্য আবিষ্কারের জন্য সম্মানিত করেছে লন্ডনের রয়্যাল জিয়োগ্রাফিক সোসাইটি। আবার, কলকাতায় এশিয়াটিক সোসাইটির পত্রিকায় তাঁর তিব্বত সম্পর্কিত লেখালিখি খুলে দিয়েছে তিব্বত ও বৌদ্ধ সংস্কৃতি চর্চার নতুন দিগন্ত। সম্পূর্ণ নিজের উদ্যোগে তৈরি করেছেন তিব্বতি-ইংরেজি ভাষার অভিধান। এরপর তিনি তাইল্যান্ডে গিয়েছেন, সেখানে রাজার কাছ থেকেবৌদ্ধ শাস্ত্রচর্চার জন্য খেতাব পেয়েছেন। মৃত্যুর দু’বছর আগেও বৌদ্ধ শাস্ত্র ও সংস্কৃতি ঘাঁটতে কয়েক মাসের জন্য পাড়ি দিয়েছেন জাপান। তিব্বতের সেই লাসা শহরকে এতটাই ভালোবেসেছিলেন শরৎচন্দ্র, পরবর্তীতে দার্জিলিংয়ে নিজের একটি বাড়ি বানিয়েছিলেন, তার নাম দিয়েছিলেন 'লাসা ভিলা'।  ১৯১৭ সালে জাপান থেকে ফেরার পর দার্জিলিংয়ের এই বাড়িতেই মৃত্যু হয় তাঁর। উনিশ শতকে দাঁড়িয়ে একা একটা মানুষের পক্ষে এই বিপুল কর্মকাণ্ড খুব সহজ ছিল না। সেই কাজ করেই সারা পৃথিবীর কাছে একটি সম্মানীয় আসন আদায় করে নিয়েছেন এই বাঙালি।

..................... 

তথ্যঋণ: 

১) পর্জন্য সেন, আনন্দবাজার পত্রিকা

২) The Indian Spy Who Fell for Tibet. New York Times 20 March 2016

..................... 

দ্বিতীয় ছবি : বাংলাদেশের বাতিঘর প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত শরৎচন্দ্র দাসের স্মৃতিকথার অনুবাদ



#Sarat Chandra Das # Indian scholar # Tibetan language #silly পয়েন্ট

Leave a comment

All fields are required. Comment will appear after it is approved.

trending posts

newsletter

Connect With Us

today's visitors

48

Unique Visitors

121571