বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

একজন উপেক্ষিত মহিলা জ্যোতির্পদার্থবিদ সিসিলিয়া পেইন

সিদ্ধার্থ মজুমদার Jan 10, 2023 at 9:20 am বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

‘আকাশ ভরা সূর্য তারা’ দেখে শুধু কবি কেন, সব কৌতূহলী মানুষের মনেই জেগে ওঠে বিস্ময়বোধ। যখন থেকে চিন্তা ভাবনা করতে শিখেছে মানুষ, তখন থেকেই রহস্যময় আকাশের দিকে তাকিয়ে নানান প্রশ্ন জেগে উঠেছে মানুষের মনে। দার্শনিক, চিন্তাবিদ ও জ্যোতির্বিদরাও খুঁজেছেন প্রকৃতির এই অপার রহস্যের পেছনে কী কারণ। রাতের আকাশের দিকে চেয়ে ভেবেছেন - ‘কত দূরে আছে আকাশের নক্ষত্র সাম্রাজ্য’? “আকাশের তারারা কী দিয়ে তৈরি?  ওদের উজ্জ্বলতা, স্থান পরিবর্তন কিংবা গতি আর নির্দিষ্ট কক্ষপথে ঘুরে চলা সম্পর্কে উদ্বেল করেছে তাঁদের। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মহাকাশ সম্বন্ধে বিজ্ঞানীরা আজ অনেক উত্তর জানতে পেরেছেন। তবু আজও অজস্র প্রশ্নের উত্তর বিজ্ঞানীদের কাছে অজানা। এই অকল্পনীয় রকমের বিশাল মহাবিশ্ব, তার সব রহস্য জানার অনুসন্ধান জারি থাকবে যতদিন মানুষ থাকবে পৃথিবীতে।


এই লেখায়  সিসিলিয়া পেইন নামে বিংশ শতাব্দীর একজন মেধাবী জ্যোতির্বিদের কথা বলব, যিনি মহাকাশের একাধিক অজানা রহস্য উন্মোচন করার জন্যে নিবিড় গবেষণা করেছিলেন একসময়। তাঁর পুরো নাম সিসিলিয়া হেলেনা পেইন Cecilia Helena Payne (May 10, 1900 – December 7, 1979)। ইংল্যান্ডের নাগরিক। বাবা ছিলেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ‘ফেলো’, একজন মিউজিসিয়ান, আইনজ্ঞ, ইতিহাসবিদ এবং বিচারকও। সিসিলিয়ারও ছিল মিউজিকে গভীর অনুরাগ, যা জন্মেছিল বাবার প্রভাবে এসেই। সিসিলিয়ার যখন মাত্র চার বছর বয়স বাবা মারা যান। সিসিলিয়ার মা’ও ছিলেন খুব প্রতিভাময়ী। সম্ভ্রান্ত জার্মান পরিবারে জন্ম তাঁর মা, যিনি ছিলেন একজন শিল্পীও। স্বামী মারা যাওয়ার পরে সন্তানদের মানুষ করার ব্যাপারে পরিবারের হাল ধরলেন মা।    


আট বছর বয়স থেকেই বিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন সিসিলিয়া। স্কুলে পড়ার সময়ই সিসিলিয়া ভাবতেন, তিনিও একদিন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বেন। কিন্তু সিসিলিয়াকে কলেজে পড়ানোর মতন সঙ্গতি ছিল না মায়ের। সৌভাগ্যক্রমে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্যে স্কলারশিপ পান মেধাবী ছাত্রী সিসিলিয়া। পূর্ণ হল তাঁর আশা। মর্যাদাপূর্ণ কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিজিক্স এবং কেমিস্ট্রি নিয়ে ভর্তি হলেন সিসিলিয়া (১৯১৯)। ক্লাসে তিনিই ছিলেন একমাত্র ছাত্রী। সহপাঠি ছাত্রদের সঙ্গে এক বেঞ্চে বসে ক্লাস করার নিয়ম ছিল না, তাই আলাদা বেঞ্চে একা একা চুপচাপ বসে সিসিলিয়াকে ক্লাস করতে হয়েছে।

কেমব্রিজে পড়ার সময় স্বনামধন্য জ্যোতির্পদার্থবিদ আর্থার এডিংটনের একটি বক্তৃতা শুনে সিসিলিয়ার জীবনের মোড় ঘুরে গিয়েছিল। এডিংটনের তাঁর সেই বক্তৃতায় অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের ‘জেনারেল থিয়োরি অফ রিলেটিভিটি’ সম্পর্কে আলোচনা করেছিলেন। এডিংটনের সান্নিধ্যে আসতে পেরে সিসিলিয়ার জ্যোতির্বিদ্যা সম্পর্কে ভাবনা ও অনুরাগ বহুগুণ বেড়ে যায়। কেমব্রিজে পড়া শেষ হল যথারীতি। সফল ভাবে পড়া শেষ করেও সিসিলিয়া কোনও ডিগ্রি পেলেন না। যেহেতু কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে সেসময় মহিলাদের কোনো ডিগ্রি দেওয়া হত না, তাই লেখাপড়ায় খুব ভালো ছাত্রী হওয়া সত্ত্বেও সিসিলিয়া কেমব্রিজ থেকে তাঁর প্রাপ্য ডিগ্রি পেলেন না। সিসিলিয়ার সময়েই নয় শুধু, কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই নিষ্ঠুর অযৌক্তিক বৈষম্য জারি ছিল ১৯৪৮ সাল অবধি।   

সেসময় পৃথিবীর গুটিকয়েক জায়গায় উচ্চশিক্ষা এবং গবেষণায় মহিলা বিজ্ঞানী গবেষকদের সহায়তা করার জন্যে কয়েকটি প্রোগ্রাম ছিল। সেরকমই একটি প্রোগ্রাম তখন সদ্য চালু হয়েছিল ‘হার্ভার্ড কলেজ অফ অবজার্ভেটরি’তে। মেধাবী ছাত্রী সিসিলিয়া আবেদন করলেন এবং সেখানকার ফেলোশিপ পেয়ে আমেরিকায় এলেন হার্ভার্ড মানমন্দিরে গবেষণা করার জন্যে। সিসিলিয়া ছিলেন ওই প্রোগ্রামের দ্বিতীয় বিজ্ঞানী। আমেরিকার এই প্রাচীন ও ঐতিহ্যশালী বিশ্ববিদ্যালয়টি পুরুষদের পড়াশোনার জন্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৬৩৬ সালে। 

এখানে একটা কথা বলা জরুরি। হার্ভার্ডে গবেষণার জন্যে সিসিলিয়া ফেলোশিপ পেয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর পুরুষ সহ-গবেষকদের মতন কখনই সমমর্যাদা পাননি সেখানে। বস্তুত সমর্থন আর সহায়তাই শেষ কথা নয়, দরকার হল দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের। মেয়েদের কেরিয়ার গঠনে সহায়তা বা সমর্থন করলেই শুধু হবে না, তার সঙ্গে সঙ্গে মেয়েদের সম্পর্কে আমাদের মনোভাবের বদল হওয়াটাও ভীষণভাবে জরুরি। যতদিন সেটা না হচ্ছে ততদিন পৃথিবীতে লিঙ্গবৈষম্য ঘুচবে না। 


সারা পৃথিবীতেই বিজ্ঞানের জগতে সব সময় পুরুষরাই সংখ্যা গরিষ্ঠ। মেয়ে হয়ে জন্মেছিলেন বলে মহাকাশ বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা বা গবেষণা করা মোটেই সহজ ছিল না সিসিলিয়ার পক্ষে। বস্তুত  আজ থেকে একশো বছর আগে অনেক প্রতিষ্ঠানেই মেয়েদের জন্যে উচ্চশিক্ষার দরজা বন্ধ ছিল। বিজ্ঞানের আঙিনায় মেয়েদের জন্যে ছিল আলাদা নিয়ম। সিসিলিয়া পেইনের ক্ষেত্রেও এর অন্যথা হয়নি। শুধু সিসিলিয়া কেন? বিগত শতাব্দীর বিজ্ঞান ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখতে পাব, বেশ কয়েকজন মেধাবী ছাত্রীও উচ্চশিক্ষার জগতে মুখোমুখি হতে হয়েছিল নানান প্রতিবন্ধকতার। যেরকম মেরি কুরি, লিজে মাইটনার, ভেরা রুবিন, রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিন, আডা লাভলেস, এমি নোদ্যার প্রমুখরাও হয়েছিলেন লিঙ্গ বৈষম্যের শিকার। অদম্য ইচ্ছাশক্তি, অফুরন্ত  প্রাণশক্তি, আর নাছোড় মানসিকতার জোরে অজস্র প্রতিকূলতা অতিক্রম করে তাঁদের এগিয়ে যেতে হয়েছিল।

তারাদের অভ্যন্তরীণ গঠন নিয়ে গবেষণা করেছিলেন সিসিলিয়া। দু-বছর গবেষণা শেষে, ‘হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়’ থেকে জ্যোতির্বিজ্ঞানে পিএইচডি ডিগ্রি (১৯২৫ সাল) পেলেন। উল্লেখ্য যে, জ্যোতির্বিজ্ঞানে সিসিলিয়াই প্রথম মহিলা যিনি ডক্টরেট ডিগ্রি পেয়েছেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। সেসময়ের স্বনামধন্য জ্যোতির্বিদরা সিসিলিয়ার পিএইচডি থিসিসকে জ্যোতির্বিদ্যায় লেখা সর্বশ্রেষ্ঠ থিসিস বলে উল্লেখ করেছিলেন। তাঁর পিএইচডি ডক্টোরেল থিসিসে সিসিলিয়া তারাদের বর্ণালী রেখা পরীক্ষা করে নির্ণয় করেছিলেন মহাকাশের তারাদের মধ্যে মূলত রয়েছে ‘হাইড্রোজেন’ এবং তার পরে ‘হিলিয়াম’। তাঁর এই আবিষ্কার জ্যোতির্পদার্থবিদ্যা উন্নয়নের ক্ষেত্রে এবং ‘নক্ষত্রমণ্ডলের বিবর্তন’ সম্পর্কে জানবার ভিত্তি। 

বিংশ শতাব্দীর প্রখ্যাত আমেরিকান জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এমনকি তাঁর পিএইচডি সুপারভাইজার এবং প্রতিষ্ঠানের ডিরেক্টারও সিসিলিয়ার যুগান্তকারী কাজের সপ্রশংস স্বীকৃতি দিলেও ‘তারার মূল উপাদান যে  হাইড্রোজেন’, এই সিদ্ধান্ত মান্যতা নেননি প্রথমে। বস্তুত সিসিলিয়ার পূর্বসূরি জ্যোতির্বিদদের ধারণা ছিল, সূর্য এবং তারাদের মধ্যে থাকা মৌলগুলি অভিন্ন এবং পরিমাণগত ভাবেও আলাদা আলাদা। পৃথিবীতে যে সব মৌল পাওয়া যায় (সিলিকন, কার্বন, আয়রন ইত্যাদি), তারাদের মধ্যেও কমবেশি ওই সমস্ত মৌলই বিদ্যমান। যেহেতু সিসিলিয়ার ফলাফল তাঁদের পাওয়া ফলাফলের সঙ্গে মেলেনি, সে জন্যেই সিসিলিয়ার গবেষণালব্ধ ফলাফলকে ভুল বলে বাতিল করে দেন তাঁরা। গবেষণা ভুল বলে সমালোচিত হওয়ায় সিসিলিয়া নিজেও কিছুটা হতোদ্যম হয়ে যান সেসময়। ভেবেছিলেন হয়তো তাঁর ফলাফলে কোথাও কোনও ভুলে থেকে গেছে।

 

নামজাদা জ্যোতির্বিদরা মান্যতা না-দিলে যা-হওয়ার তাই হল। সিসিলিয়ার সাফল্যের কথা ধামাচাপা পড়ে গেল। অনেক পরে সিসিলিয়ার কাজের কট্টর সমালোচক জ্যোতির্বিদ রাসেল যখন অন্য পদ্ধতিতে সিসিলির গবেষণার কাজটি করে দেখলেন তখন বুঝতে পারলেন যে সিসিলিয়ার পর্যবেক্ষণই সঠিক ছিল। ততোদিনে সিসিলিয়ার কৃতিত্বের কথা জ্যোতির্বিদ্যা জগতের মানুষজন ভুলে গেছেন। অন্যদিকে সদ্য পাওয়া গবেষণালব্ধ ফলাফলের আবিষ্কারক হিসেবে সেসময় অনেকেই ওই আবিষ্কার রাসেলের কৃতিত্ব, তা ভেবে নিলেন। পরবর্তী সময়ে ওই যুগান্তকারী আবিষ্কারের পেছনে সিসিলিয়ার অবদানের কথা যখন বৃহত্তর বৈজ্ঞানিক মহল জানতে পারলেন, তখন স্বীকৃতি পেলেন সিসিলিয়া। তবে ততদিনে বেশ কয়েক দশক পেরিয়ে গিয়েছিল। 

সূর্য বা নক্ষত্রের মধ্যেকার বস্তু থেকে নির্গত আলোকরশ্মি পর্যালোচনা করলে সূর্য বা নক্ষত্রের ভেতরে কী ঘটছে তার ধারণা পাওয়া যায়। মহাবিশ্ব কী দিয়ে গঠিত শুধু এই আবিষ্কারই নয়, সূর্য কী  দিয়ে গঠিত তাও আবিষ্কার করেছেন সিসিলিয়া। উল্লেখ্য যে সূর্য যা দিয়ে গঠিত পৃথিবীর থেকে তা আলাদা - এই আবিষ্কারের কৃতিত্ব দেওয়া হয়েছিল হেনরি নরিস রাসেল নামের একজন নামজাদা জ্যোতির্বিদকে। শুধু তাই নয়। সিসিলিয়াকে নিষেধ করেছিলেন রাসেল যেন তিনি তাঁর ফলাফল গবেষণাপত্রে প্রকাশ না করেন। সিসিলিয়ার আবিষ্কারের চার বছর পরে রাসেল তাঁর ফলাফল প্রকাশ করেন। 

শুধু মেধাবীই ছিলেন না সিসিলিয়া, অসম্ভব ভালোবাসতেন নিজের কাজকে। ছিলেন দারুণ পরিশ্রমীও। না-ঘুমিয়ে সিসিলিয়া টানা বাহাত্তর ঘন্টা গবেষণার কাজ করেছিলেন একবার, যা তাঁর জীবন কথায় তিনি লিখেছেন। ‘ভেরিয়েবেল স্টার’ নিয়েও উল্লেখযোগ্য গবেষণা করেছেন সিসিলিয়া। পৃথিবী থেকে দেখলে যে তারাদের ঔজ্জ্বল্য কখনও কম কখনও বেশি দেখায়, ওদেরই ‘ভেরিয়েবেল স্টার’ বলা হয়। এই ‘ভেরিয়েবেল স্টার’ সম্পর্কে সিসিলিয়াই প্রথম আমাদের জানিয়েছেন। বস্তুত ‘ভেরিয়েবেল স্টার’ সম্পর্কে যাবতীয় যা কিছু কাজ হয়েছে, তা সিসিলিয়ার কাজের সূত্র ধরেই। 

তাঁর পিএইচডি ডিগ্রি অ্যাওয়ার্ডেড হওয়ার পর থেকে পাঁচ বছর পিএইচ ডি ছাত্রদের পরামর্শদাত্রী হিসেবে, গবেষণা করানো থেকে ক্লাস নেওয়া বক্তৃতা দেওয়া অধ্যাপকের সব ধরণের দায়িত্ব পালন করতে হলেও তাঁকে অধ্যাপক হিসেবে গণ্য না করে তাঁকে একজন অধ্যাপকের ‘টেকনিক্যাল-অ্যাসিস্ট্যান্ট’ হিসেবে কাজ করতে হয়েছে। সন্দেহাতীতভাবে বিংশ শতাব্দীর একজন সৃজনশীল মেধাবী জ্যোতির্বিজ্ঞানী হওয়া সত্ত্বেও সিসিলিয়াকে কখনোই অভিজাত ন্যাশান্যাল অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত করা হয়নি। আর এসব অবিচার আর বৈষম্য যে সিসিলিয়া মহিলা বলেই হয়েছিল তা বলাই বাহুল্য।

আরও পড়ুন : স্নায়ু ও শিল্পের সংলাপ : সান্তিয়াগো রামন কাহাল / সিদ্ধার্থ মজুমদার 

কয়েক দশক পরে মহিলাদের মৌলিক অধিকার নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গীর কিছুটা পরিবর্তন আসতে শুরু করে। অবশেষে ১৯৫৬ সালে সিসিলিয়া পূর্ণ অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন। নির্বাচিত হয়েছেন হার্ভার্ডের অ্যাস্ট্রোনমি ডিপার্টমেন্টের ‘চেয়ারপার্সন’। সিলিয়া পেইনই প্রথম মহিলা যিনি হার্ভার্ডের মধ্যে পূর্ণ অধ্যাপকের পদে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন এবং একাধিক পুরস্কার ও সম্মানে ভূষিত হন সিসিলিয়া। আমেরিকান অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটিতে উপদেষ্টার পদ পান। হার্ভার্ড বিজ্ঞান বিভাগ এবং জ্যোতির্বিদ্যা বিভাগে নারী পুরুষের পার্থক্যের কাচের ছাদ তিনি ভেঙেছিলেন একটু একটু করে। উল্লেখ্য যে সেসময় একটা পুরো প্রজন্মের মেয়েরা অনুপ্রাণিত হয়েছিল বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করার জন্যে। 

সিসিলিয়া পেইনের আবিষ্কারের প্রসঙ্গে আমাদের ড. মেঘনাদ সাহার নাম অনিবার্যভাবে আসবে। আধুনিক জ্যোতির্পদার্থবিদ্যায় মেঘনাদ সাহার অবদান অপরিসীম। আসলে সিসিলিয়া হার্ভার্ডে গবেষণা শুরু করার বছর দুই আগে ড. মেঘনাদ সাহার ‘থার্মাল আয়োনাইজেশন অফ অ্যাটম’ সম্পর্কিত তাঁর বিখ্যাত সমীকরণ (থিয়োরি অফ আয়োনাইজেশন) প্রকাশিত হয়েছে। সিসিলিয়া তাঁর গবেষণায় মেঘনাদ সাহার সমীকরণ ব্যবহার করে নক্ষত্ররা কী কী মৌলিক পদার্থ নিয়ে গঠিত তা আবিষ্কার করেন। সিসিলিয়া পেইনের আগে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা অন্য পদ্ধতি অবলম্বন করে নক্ষত্রের মধ্যে থাকা মৌলের পরিমাণ নির্ণয় করতেন। সিসিলিয়াই প্রথম মেঘনাদ সাহার সমীকরণ ব্যবহার করে বুঝেছিলেন যে তারাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি থাকে হাইড্রোজেন এবং হিলিয়াম। 

সিসিলিয়ার আবিষ্কৃত সিদ্ধান্তের গুরুত্ব অপরিসীম, তাই জ্যোতির্বিদ্যার যে-কোনও প্রারম্ভিক কোর্সের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ তাঁর কাজ। ছাত্রছাত্রীদের আজ পড়তে হয় মিল্কিওয়ে বা গ্যালাক্সিতে আছে ৭৩ শতাংশ হাইড্রোজেন, ২৫ শতাংশ হিলিয়াম এবং ২ শতাংশ অন্যান্য ধাতু।

নিজের নিজের উদ্ভাবনার ক্ষেত্রে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ কোপার্নিকাস, নিউটন, এবং আইনস্টাইন মহাবিশ্ব সম্পর্কে যুগান্তকারী ধারণা দিয়েছেন। তবে সিসিলিয়ার মহাজাগতিক বিষয়ের যে আবিষ্কার তা কোনও অংশেই কম নয়। সম্ভবত সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মহিলা জ্যোতির্বিদ হিসেবে তাঁকে মনে করা হয়।   শুধুমাত্র মেয়ে হওয়ার জন্যে কি তাঁর অবদানের কথা এত তাড়াতাড়ি ভুলে গিয়েছে পৃথিবীর মানুষ? বিজ্ঞান ইতিহাসে অন্যতম প্রভাবশালী জ্যোতির্বিদ সিসিলিয়া পেইন আজও উপেক্ষিত এবং বিস্মৃত – এ আমাদের সবার লজ্জা।  

...........................


#Cecilia Payne #Astronomer # astrophysicist

Leave a comment

All fields are required. Comment will appear after it is approved.

trending posts

newsletter

Connect With Us

today's visitors

43

Unique Visitors

181445