নিবন্ধ

অতিমারি ও শিক্ষা : দিশাহীনতা ও অন্ধ সেজে থাকার গল্প

রোহন রায় Feb 6, 2022 at 11:35 am নিবন্ধ ২৭

“If you want to be blind, then blind you will be.”

     -  Blindness / Jose Saramago


অন্ধ সেজে থাকাটা চিরকালই ভারী আরামের ব্যাপার। আর কঠোর বিকল্পের তো কোনও পরিশ্রমই নেই। অতিমারি এসে আরও ভালোভাবে টের পাওয়াল সে কথা। কোভিডের ধাক্কায় এই যে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার গা থেকে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে ঝরে পড়ছে সারাৎসার, এই ঘুণ কিন্তু কোভিডের উপহার নয়। ফিরে তাকাতে হবে আরও আগে।   

মেদিনীপুরের গ্রামাঞ্চলের একটি সরকারি কলেজে বেশ কয়েকবছর পড়ানোর সূত্রে কলেজশিক্ষা বিষয়টাকে নিবিড়ভাবে দেখার ও জানার সুযোগ হয়েছে। সেই জায়গা থেকেই, গত দু বছরের অভিজ্ঞতার নিরিখে কিছু অবলোকন ভাগ করে নিচ্ছি সবার সঙ্গে। 

এই সময়টা বাধ্য হয়ে অনলাইনে ক্লাস নিতে হয়েছে। কিন্তু দুটো বছর পেরিয়ে এসে আজও অনলাইন পড়ানো আমার দু চোখের বিষ। কণ্ঠ, স্বরক্ষেপ, শরীরী ভাষা, দৃষ্টি - এগুলো শিক্ষকের কাছে এক-একটা উপকরণ। এগুলো দিয়েই যত্নে গড়ে তুলতে হয় একেকটা পারফরম্যান্স। একেকটা ক্লাস তো আসলে একেকটা পারফরম্যান্সই। একইসঙ্গে, পড়ানোর ফাঁকে ফাঁকে পড়ুয়াদের চোখের ভাষা পড়তে পারাটাও সমান জরুরি। অনলাইন ক্লাসে এসবের সুযোগ কই? বিশেষত, মহানগরের বাইরে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যাঁরা যুক্ত, তাঁরা জানেন অনলাইন ক্লাসের বিড়ম্বনা। পড়ুয়াদের দুর্বল ইন্টারনেট, যখন তখন ডেটা প্যাক শেষ হয়ে যাওয়া, কেউ শুনছে কিনা বুঝতে না পারা ইত্যাদি ঘাড়ে নিয়ে বকচ্ছপ পদ্ধতিতে পড়াতে পড়াতে এবং পরীক্ষা নিতে নিতে হাড়ে দুব্বো গজিয়ে যাবার জোগাড়। এরই মাঝে বাংলার মুখ দেখার সুযোগ ঘটে নানাভাবে। কেউ জানায়, সকালের দিকের একটাও ক্লাস করতে পারবে না কারণ কারখানায় কাজে ঢুকেছে। কেউ জানায় দুপুর একটা থেকে দুটো-আড়াইটে সময়টুকু ক্লাস না রাখলেই ভালো কারণ সেসময় তাকে রান্না করতে হয়। কেউ বোনের সঙ্গে ফোন ভাগাভাগি করে ক্লাস করে, তাই কিছু কিছু ক্লাস মিস হয়ে যায়। কেউ কাজের জন্য চেন্নাই চলে গেছে বলে সময়ে পরীক্ষা দিয়ে উঠতে পারে না। শুধু তো ওদের কলেজবেলাটাই চুরি যায়নি, হাজিরার খাতা থেকে চুরি গেছে কতজন। তারা আর ফিরতে পারবে না।  

তবু সামগ্রিকভাবে দেখলে মনে হচ্ছে 'ব্লেন্ডেড’ পদ্ধতিকে হয়তো আর কোনওদিনই পুরোপুরি ঝেড়ে ফেলা যাবে না। সত্যি বলতে কী, যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে পারলে ঝেড়ে ফেলার দরকারই বা কী। শিক্ষকরা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের গ্রাউন্ড রিয়ালিটি অনুযায়ী আচরণ করলেই হল। যেসব প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা সকলেই আর্থিকভাবে সবল, সেখানে অফলাইনকে প্রাধান্য দিয়ে পাশাপাশি প্রয়োজনমতো ‘ব্লেন্ডেড’ পদ্ধতি অবলম্বন করলে সমস্যা নেই। প্রান্তিক অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলে আপনাকে অবশ্যই প্রায় সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করতে হবে চিরাচরিত অফলাইন পদ্ধতির ওপর। ‘অনলাইন’-কে রাজ্যপাট দেবার ভাবনা আত্মঘাতী। তাকে প্রতিহারী বা দ্বারপাল গোছের কিছু একটা পার্ট দেওয়াই ভালো। 'অফলাইন' আমাদের ভিত্তি, এটা ভুলে যাবার বা অস্বীকার করার চেষ্টা করলে সমূহ সর্বনাশ। শিক্ষকদের মুখোমুখি বসে ক্লাস করায় ভরসা রাখতে পারলে পড়াশোনা থেকে যারা মুখ ফেরাচ্ছে বা অনলাইন লার্নিং অ্যাপের দিকে ঝুঁকছে, তারা আবার ক্লাসে ফিরবে। সে ভরসা ফিরে পাবার লড়াই আমাদেরই।  

শিক্ষকদের বসে বসে মাইনে নেওয়া নিয়ে যে অভিযোগ উঠছে তাতে বেশি ভাবিত হবার কারণ নেই। জনতা জনার্দনের বিচার চিরকাল এমনই শিশুতোষ ও সহজিয়া।  বাকি সব পেশায় যেমন অসৎ মানুষ থাকেন, শিক্ষকতাতেও অসৎ মানুষের সংখ্যা কম না। অতিমারি কিন্তু কারও জিনের গঠন বদলে দেয়নি। যাঁরা অসৎ ছিলেন তাঁরা আজও অসৎ। আর যাঁরা সৎ, তাঁরা এই লকডাউন-পর্বেও যথাসম্ভব সততার সঙ্গে নিজের দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করেছেন। তাঁরা জানেন, তাঁদের দায়িত্বপালনে যে সীমাবদ্ধতা ছিল, তা তাঁদের আয়ত্বাধীন নয়। বিপন্ন, হতাশ জনতা যেভাবে সমগ্র শিক্ষকসমাজকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছে, তাতে খুব বেশি কষ্ট না পেয়ে তাঁরা নিশ্চয়ই সামনে দিকে তাকাবেন। আত্মপক্ষ সমর্থনে জনতাকে উত্তর দিয়ে দিয়ে বৃথা হন্যে হবার চেয়ে তাঁরা এই দু বছরের ক্ষত মেরামতির দিকে মন দিতে চাইবেন নিশ্চয়ই। ঘরে বসে থেকে থেকে বাধ্য হয়ে কোনও কাজে ঢুকে যাওয়া, বা বিয়ে হয়ে যাওয়া, বা অ্যান্টি ডিপ্রেশন পিলে অভ্যস্থ হয়ে যাওয়া পড়ুয়াদের মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনাটাই নিশ্চয়ই তাঁদের সবচেয়ে বড় ভাবনা হবে।


এবং শিক্ষার্থীদের হয়ে তাঁরা নিশ্চয়ই এই প্রশ্ন তুলবেন যে, দুটো বছর এইভাবে চুরি হয়ে যাবার দায় কার? অতিমারির? নাকি অতিমারিকে শিখণ্ডী করে তার পিছনে লুকিয়ে থাকা একটি উদাসীন, পরিকল্পনাবিহীন, দিকভ্রান্ত সিস্টেমের? এ কেমন রাষ্ট্র যে ভরা অতিমারির মাঝে দফায় দফায় ভোট করাতে পারে, অথচ স্কুল-কলেজ খোলার ব্যবস্থা করতে পারে না, যথাযথভাবে পরীক্ষা নিতে পারে না? শিক্ষার মতো মৌলিক অধিকার নিয়ে দু বছর ধরে যা চলল, সদিচ্ছা থাকলে এর চেয়ে ভালো কিছু করা যেত না এটা নিশ্চয়ই কেউই বিশ্বাস করছেন না। বিষয়টা আসলে শিক্ষার প্রতি রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গির। অতিমারি এসে আমাদের পরিকল্পনাহীনতাকে বেআব্রু করেছে মাত্র। কফিন কিন্তু বহুদিন ধরেই একটু একটু করে তৈরি হচ্ছে। গত দু বছরে তার গায়ে খুব দ্রুত হাতে পেরেক মেরেছে অতিমারি। সবটা মিলেই তো আসলে একটা গোটা ধ্বংসের গল্প। গোটা বৃত্তটায় চোখ না রাখলে চলবে কেন? দেশের কর্তাব্যক্তিদের কাছে তো মানুষ মাত্র দু প্রকার - ভোটার আর ক্যাডার। মন দিয়ে পড়াশোনা করলে ভালো জীবিকা জোটানো সম্ভব - এই চিরাচরিত আর্থ-সামাজিক সমীকরণ যদি কোনও একটা দেশে মুখ থুবড়ে পড়ে, সেখানে অনন্ত নরকের দরজা খুলে যায়। সে দেশের গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের নিরক্ত ফিনফিনে মলাট সরিয়ে নিলে যে মুখটা বেরিয়ে পড়ে, তার নাম লুম্পেনতন্ত্র। গত আড়াই দশক ধরেই পড়াশোনা জিনিসটা কর্মসংস্থানের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক হারাচ্ছে। মন দিয়ে পড়লে ভালো কর্মসংস্থান হবেই, এমন দাবি করা যাচ্ছে না অনেকদিনই। এখন বিষয়টা অনেক বেশি মারাত্মক আকার নিয়েছে। এরই সঙ্গে যুক্ত হয়ে যান আমাদের দায়িত্বজ্ঞানহীন বেরাদররা, নিয়মিত ক্লাস নেওয়ার প্রতি যাঁদের আন্তরিক বিতৃষ্ণা - পড়ুয়াদের প্রতি যাঁদের নিদারুণ অবজ্ঞা। এই সব মিলেই তো সিস্টেম। চেইন রিয়াকশন। সবাই সবার আয়না। এ এক আশ্চর্য সসেমিরা। 

এখানে পড়াশোনা বলতে আমি শুধু গতানুগতিক পথে বিদ্যাশিক্ষা আর ডিগ্রি অর্জনের কথা বলছি না। যে কোনও বিদ্যা বা বিষয়ের চর্চার কথাই বলতে চাইছি। সে আঁকা হোক, গান, আবৃত্তি, থিয়েটার হোক বা কোনও স্টার্টআপ। ব্যবসা করতে গেলেও তো বাজার সমীক্ষা করা দরকার। সেটা কি কিছু কম পরিশ্রমের ব্যাপার? উপার্জন করতে গেলে বা জীবিকা নির্বাহ করতে গেলে যে সৎ পরিশ্রম, যে সাধনা দরকার সেই বিষয়টাই ক্রমে সেকেলে হয়ে যাচ্ছে। অসৎ উপায়ে বা চটজলদি সস্তা পথে কেরিয়ার গঠনের এতরকম সুযোগ এখন মানুষের সামনে টোপের মতো ঝুলছে, তাতে পা না দিয়ে কঠিন পরিশ্রমের পথ কেউ কেন বেছে নিতে চাইবে, যেখানে সেই পথে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তলানিতে এসে ঠেকেছে? অতিমারির হাত ধরে অনলাইন শিক্ষা এসে এই প্রবণতারই হাত শক্ত করল। ক্লাস, পড়াশোনা, পরীক্ষা, পরীক্ষার রেজাল্ট সব খুব সরাসরি প্রহসনের পর্যায়ে নেমে এল। শহরের হাতেগোনা কয়েকটা প্রতিষ্ঠান বাদ দিলে বাকি সর্বত্র অনলাইন পরীক্ষার নামে যে জিনিসটা শিক্ষকেরা অবলম্বন করতে বাধ্য হলেন, তার চেয়ে হাস্যকর আর কিছুই হতে পারে কি? পরীক্ষার দিন আমাদের তৃতীয় সেমেস্টারের জেনারেল কোর্সের এক পড়ুয়া তো বিভাগীয় প্রধানকে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে সটান মেসেজই করে বসল - “ম্যাম, তিন নম্বর প্রশ্নের আন্সারটা খুঁজে পাচ্ছি না কোথায় আছে।” অনেক গভীরে ছাড়িয়ে গেছে ক্ষয়। সবচেয়ে সহজ আর দ্রুত সমাধান হচ্ছে পড়ুয়াটিকে দোষী সাব্যস্ত করে দেওয়া। এতে কোনও পরিশ্রম নেই, উপদ্রবও নেই। কিন্তু পড়ুয়াটি যে দীর্ঘ অপরাধের শিকার তার পাশে তার নিজের অপরাধটিকে কত বড় দেখায়, অনুভবী শিক্ষকেরা নিশ্চয়ই তা ভেবে দেখতে চাইবেন। কেন এমন হল, তাঁরা নিশ্চয়ই গভীরে গিয়ে খুঁজতে চাইবেন। কোনও সম্পর্কই নিছক নির্দেশাত্মক হতে পারে না। শিক্ষক-ছাত্র সম্পর্কও নির্ভর করে গভীর পারস্পরিক বিশ্বাস ও নির্ভরশীলতার ওপর। সেটা নাহয় এই অতিমারি-পর্বে গড়ে ওঠার সুযোগ নেই বললেই চলে। কিন্তু এর আগেও কি এই নিয়ে ভেবেছেন সকলে? নাকি কর্তৃত্বের পজিশনে আছি বলে ইগোর গোড়ায় ধোঁয়া দিয়েই দিন কেটেছে? যদি তা-ই হয়ে থাকে, তাহলে আজও আপনার পক্ষে পড়ুয়াদের বিপর্যস্ত মনের যত্ন নেওয়া সম্ভব নয়। আপনি আগেও যথেষ্ট সংবেদনশীল ছিলেন না, আজও নন। ওই যে বলছিলাম, অতিমারি রাতারাতি কারও জিনের গঠন বদলে দিতে পারে না। এর মানে এই নয় যে ওই পড়ুয়ার তিরস্কার প্রাপ্য নয়, এর মানে হচ্ছে শুধু তাকে দোষারোপ করে দায় সারলে অন্ধের হস্তীদর্শনের মতো কেস হবে। রোগ চিহ্নিত করতে হবে ঠিকঠাক। তবে তো চিকিৎসা যথাযথ হবে। নাহলে শিক্ষকদের ভূমিকাটা দাঁড়াবে মোল্লা নাসিরুদ্দীনের চাবি খোঁজার গল্পের মতো। যেখানে চাবি হারিয়েছে সেখানে না খুঁজে, যেখানে খোঁজার সুবিধে সেখানে খুঁজে দায় ঝেড়ে ফেলা হবে।

আরও পড়ুন : ‘হাতের উপর হাত রাখা খুব সহজ নয়’: ভার্চুয়াল ক্লাসরুমের পড়াশোনা / রোহিণী সেনগুপ্ত 

সময়ের টানাটানিতে বিস্তারিত লিখতে পারলাম না। মোদ্দা কথা এটাই যে কোভিড এসে অনেক ক্ষতি করল ঠিকই, কিন্তু একা তাকে দুষে লাভ নেই। বিষবৃক্ষটি নেহাত অর্বাচীন নয়। কোভিড খুব দ্রুত হাতে তার গোড়ায় সার-জল দিয়েছে। কিন্তু গাছটা ছিল। এদেশে গণশিক্ষা আর উচ্চশিক্ষার পথ বহুকাল ধরেই বহু দূরে সরে গেছে। কারিগরি শিক্ষার দিকে নজর দিতে গিয়ে জেনারেল লাইনকে একেবারে পরের ছেলে পরমানন্দ করে দেওয়া হয়েছে অনেকদিনই। সামূহিক অন্ধতা জমে জমে গণশিক্ষার কবর খনন চলেছে। শিক্ষকদের কাজ এই সবকিছু নিয়ে প্রশ্ন তোলা, দরকারে নিজেকেও প্রশ্ন করা। অতিমারির পর আরও গা ঝাড়া দিয়ে উঠে ড্যামেজ কন্ট্রোলে নামা দরকার। তাঁরা নিজেরাই এখনও অন্ধ সেজে থাকলে আপাতত দুপুরের ভাতঘুমে বিঘ্ন হবে না ঠিকই, কিন্তু হাত থেকে কবরের মাটি তুলতে ক’ ডজন সাবান লাগবে তা বলা কঠিন। আমি আশাবাদী, কারণ চারপাশে এই নিয়ে অজস্র ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ দেখছি। আটকে যাওয়া চাকাটাকে ঘোরানোর চেষ্টা চলছে সবাই মিলে। এখন স্কুল-কলেজ খুলেছে। পড়ুয়ারা ফিরে আসছে।

চাকা ঘুরবে, আমি বিশ্বাস রাখি। আমরা সবাই মিলে জিতে যাব ঠিক। 

#অতিমারি #শিক্ষা #লকডাউন #অনলাইন শিক্ষা #সিলি পয়েন্ট #বাংলা পোর্টাল #রোহন রায় #নিবন্ধ #সিরিজ #pandemic #online class #education #lockdown #silly point

Leave a comment

All fields are required. Comment will appear after it is approved.

trending posts

newsletter

Connect With Us

today's visitors

42

Unique Visitors

121565