মেঘের দেশে

২০১৯-এর মার্চ মাস। ক্রমাগত ল্যাব-এর কাজ করে করে বেশ ক্লান্ত। বসন্ত তো ফেব্রুয়ারি থেকেই পাততাড়ি গোটাতে শুরু করেছে। শীতের আমেজ, পিকনিক মুড, বিয়েবাড়ি সিজন সব ঝুলি-ই তখন খালি। এদিকে বছরের তিন নম্বর মাসেই ক্লান্তি যেভাবে বন্ধুত্ব করতে হাত বাড়িয়েছে, তাতে অক্সিজেনের খোঁজ করতে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায়ন্তর পেলাম না। অগত্যা, বাক্স গুছিয়ে রওনা হলাম স্কটল্যান্ডের উদ্দেশ্যে। তবে এই স্কটল্যান্ড পাশ্চাত্যের নয়, প্রাচ্যের।
আকাশপথে গৌহাটি হয়ে ন্যাশনাল হাইওয়ে (এন এইচ ৪০) ধরে অজস্র বাঁক আর সূর্যডোবা বিকেলকে সাক্ষী রেখে পাড়ি দিলাম আড়াই ঘণ্টার পথ। গিয়ে পৌঁছলাম সোজা রবিঠাকুরের ‘শেষের কবিতা’-র দেশে। সূর্যাস্তের আলোয় চিকচিক করে উঠে আমাদের আহ্বান জানালো বরাপানি বা উমিয়াম লেক। শেষ বসন্তের পাহাড়ি নরম ঠাণ্ডা হাওয়া মেখে সূর্যাস্ত হল সন্ধে ছটার কিছু আগেই। বেলাশেষে ডন বস্কো মিউজিয়াম থেকে প্রায়-ঘুমন্ত শিলং শহর আর দিনের শেষ সূর্য দেখার অনুভূতি ছিল অসাধারণ। শিলং শহরের ঘুম ভাঙে অনেক ভোরে। সন্ধ্যের পর দেখা শহর আর ভোরের শহর যেন দুই মেরুর বাসিন্দা। দুইপাশে সবুজ দিয়ে সাজানো সুন্দর চওড়া পীচের রাস্তা, সকালের ঠাণ্ডামাখা নরম রোদ্দুর আর ভোর থেকেই সহজ সরল মানুষের ভিড় – এই ছিল আমার আধবেলার দেখা ছোট্ট শিলং শহর।

বেলা যত বাড়তে লাগল, শহরের মায়া ততই কাটাতে শুরু করেছি আমরা। কারণ, এবার মেঘালয়ের ছোট ছোট গ্রাম পেরিয়ে, কখনও ন্যাড়া পাহাড় টপকে; আবার কখনও বা পথচলতি অথবা খেলায় মত্ত গারো বা খাসি শিশুর পাশ দিয়ে চেরি-ব্লসমের শেষ সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে আমরা ছুটে চলেছি। গন্তব্য মেঘালয়ের ছোট্ট এক গ্রাম। ‘CLEANLINESS IS NEXT TO GODLINESS’ মন্ত্রে বিশ্বাসী হয়ে ২০১৩ সালে এশিয়ার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রাম হিসেবে রীতিমতো গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে নাম তুলে ফেলেছে রাজধানীর আড়ম্বর থেকে অনেক দূরে মেঘালয়ের এই গ্রামখানা। নিশ্চয়ই এবার নাম না বললেও অনেকেই বুঝে ফেলবেন। হ্যাঁ, গন্তব্য এবার মায়লিনং (Mawlynnong)।

যাবার পথে আর এক জীবন্ত বিস্ময়। বিশেষ কায়দায় ভারতীয় রবার (Ficus elastica) গাছের শিকড়ের নিরেট ও জটিল বুননে তৈরি প্রায় ৩০ মিটার লম্বা ‘লিভিং রুট ব্রিজ (Living Root Bridge)’ ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে থায়লং (Thyllong) নদীর দুই পাড়ে অথবা অন্যান্য লিভিং রুট ব্রিজের এই রবার গাছগুলি লাগানো হয়েছিল ১৮৪০ সালে বা তার কাছাকাছি কোনো সময়। পরিবেশের কোনো ক্ষতি না করে পবিত্র এই নদী থায়লং পারাপারের জন্যই পূর্ব খাসি পাহাড়ের ছোট গ্রাম নোয়েত (Nohwet) – এর গ্রামবাসীদের এই অভিনব পরিকল্পনা।
সময় পেলে ঘুরে আসুনঃ
আর এর পাশেই ছবির মতো সুন্দর সাজানো গ্রাম মায়লিনং। একদিকে প্রকৃতির অকৃপণ হাতে রচনা করা উপমাবিহীন সৌন্দর্য, আর অন্যদিকে সহজ-সরল মানুষগুলোর অনাড়ম্বরভাবে এবং সযত্নে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সংরক্ষণ। মায়লিনং এবং আশেপাশের প্রত্যেকটা ছোট গ্রামই যেন এক-একটা ছবির সাজানো পটভূমি। ইট বাঁধানো বা সিমেন্টের সুন্দর পরিষ্কার রাস্তা – খালি পায়ে হেঁটে বেড়ালেও মনে হয় আনন্দ হবে। আর রাস্তার দুই পাশে ঠিক ক্যালেন্ডারের ছবির মতই রঙিন ফুলে ফুলে ঢাকা সুন্দর ছোট্ট ছোট্ট বাড়ি। মানুষ আর প্রকৃতির এই যুগলবন্দী সত্যিই দর্শনীয় এবং অবশ্যই শিক্ষণীয়-ও।
এবার গন্তব্য স্কুলের ভূগোল বইতে পড়া ভারতের সবচেয়ে বৃষ্টিবহুল শহর। যদিও সেই খেতাব এখন মওসিনরাম (Mawsynram)-এরই প্রাপ্য, তবু আমাদের যাত্রা এবার পূর্ব- খাসি পাহাড়ের কোলে ছোট শহর চেরাপুঞ্জি (Cherrapunji)। স্থানীয় ভাষায় চেরাপুঞ্জি এখন ‘সোহরা (Sohra)’ নামে পরিচিত। রুক্ষ ন্যাড়া পাহাড় আর বৃষ্টিভেজা পাহাড়ি পথ পেরিয়ে, সোহরা রামকৃষ্ণ মিশনের পাশ দিয়ে গিয়ে অবশেষে পৌঁছালাম কনিফেরাস রিসর্ট। ছেঁড়া মেঘে ঢাকা, শেষ সূর্যের আলো আর আলগা বৃষ্টিমাখা শান্ত, সুন্দর, আভরণহীন পাহাড়ি শহর। চারপাশে একধরনের অপার্থিব মায়াময় শান্তি বিরাজমান। ঠাণ্ডা ঘেরা শান্ত শহরের মানুষগুলো-ও তেমনি শান্ত আর অতিথিবৎসল। ভোরের নরম আলো, স্কুলের ইউনিফর্ম পরা পথচলতি শিশু, উজ্জ্বল রঙের ছোট ছোট কাঁচের জানলাওয়ালা বাড়ি, সাদা সাদা ফুলের নকশাকাটা পর্দা আর বাহারি রঙিন ফুল দিয়ে সাজানো – সব মিলিয়ে সোহরা যেন গল্পের মতো অপার্থিব। রয়েছে প্রকৃতির নিজের হাতে তৈরি গুহা যা আজও হাজার-হাজার বছর ধরে তার গর্ভে আগলে রেখেছে চুনাপাথর আর বেলেপাথরের কারুকাজ। রয়েছে একের পর এক বিশালাকায় চঞ্চল ঝর্ণা। প্রকৃতির সীমাহীন সৃষ্টি এখানে উন্মুক্ত, অবাধ, সর্বোপরি পরম বিস্ময়কর।

জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে চলা খাড়াই সিঁড়ি, কখনও শুকনো পাতায় ঢাকা সিমেন্টের রাস্তা, ফুটবল মাঠ, রঙিন ফুলে সাজানো নংথায়ম্মাই (Nongthymmai) গ্রাম ছিল এই পথে আমাদের আসা-যাওয়ার সঙ্গী। গ্রাম পেরিয়ে নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছানোর আগে যে আরও এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতার সাক্ষী হব, তা জানা ছিলনা। শিলং – চেরাপুঞ্জি ভ্রমণের পরতে পরতে যেন চমক, চলার বাঁকে বাঁকে আশ্চর্য সব দৃশ্য - যেন রূপকথার পাতা থেকে উঠে এসেছে। দেখলাম ষ্টিলের ঝুলন্ত সেতু। তারপর ছোট গ্রাম তিরনা (Tyrna) থেকে ৩৫০০-৪০০০ সিঁড়ি পেরিয়ে, প্রায় ২৪০০ ফিট নীচে ‘Double Decker Root Bridge’। পৃথিবীর একমাত্র প্রাকৃতিক দোতলা সেতু। নিচে নীলাভ – সবুজ স্বচ্ছ জলের নংরিয়াত (Nongriat) নদী আর ভয়ঙ্কর সুন্দর ঝুলন্ত সেতু পেরিয়ে নংরিয়াত গ্রামের মধ্যে দিয়ে অবশেষে পৌঁছলাম ডবল ডেকার ব্রিজে। প্রকৃতির অতি যত্নে তৈরি জীবন্ত সেতু, অবিশ্বাস্য বললেও কম। এত চড়াই – উতরাই পেরিয়ে আসার কষ্ট তখন অনাবিল আনন্দে রূপান্তরিত হয়েছে।

এবার ফেরবার পালা। সময়ের অভাবে বহুকিছুই হয়ত বাকি থেকে গেল। তবু রোজকার ছকে ফেলা জীবনের মাত্র এই চারটে দিন ছিল গারো খাসি পাহাড়ের কোলে এক অনির্বচনীয় তন্ময়তায় ঘেরা। বাড়ি থেকে দূরে অথচ যেন মনের ভীষণ কাছাকাছি। কিন্তু, রোজকার রুটিনে তো ফিরতেই হবে। তাই এবার ব্যাগ ভর্তি আনন্দের অনুভুতি আর বুক ভর্তি অক্সিজেন নিয়ে ফিরে এলাম। মন অবশ্য পড়ে রইল ঐ নির্জন নদীর ধারে পাহাড়ের কোলে। আবার কখনও সময় হলে ফিরে যাব মায়ের মতোই অকপট ভালবাসায় মোড়া মেঘের দেশে।
সময় করে নেব ঠিক।
ছবিস্বত্ত্বঃ লেখক
#ভ্রমণ #মেঘের দেশে #উদিতা আচার্য
Partha Pratim
Aro ekbar meghalaya ghure aslam lekha ta pore❤️❤️
Sayan
Sei Bhromon potrikay erokom monograhee lekha beroto. Khub khub bhalo.
Chandrima
Boddo sundor lekha. Porte porte manos bhromon sere aslam.