ব্যক্তিত্ব

বিজ্ঞানচর্চার 'রবিনহুড' : মুক্ত জ্ঞানচর্চার জন্য আলেকজান্দ্রা এলবাকিয়ানের লড়াই

প্রতীক সেনগুপ্ত 19 days ago ব্যক্তিত্ব ৪০

Sci–Hub। বিজ্ঞানচর্চা ও গবেষণার জগতে এক বিপ্লব। প্রচুর মূল্যের গবেষণাপত্র, জার্নাল ও বইগুলি এই সাইটে বিনামূল্যে পড়ার সুযোগ পাওয়া যায়। জ্ঞানকে পুঁজির ক্রীতদাস হতে দেবেন না, এই শপথ নিয়েছিলেন সাই হাবের প্রতিষ্ঠাতা। পয়সার অভাবে কেউ যাতে ভালো ভালো বই, পত্রিকা পড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়, সে দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন তিনি। তাঁর নাম আলেকজান্দ্রা এলবাকিয়ান। বিজ্ঞানচর্চার জগতে তাঁকে 'রবিনহুড' বলে ডাকা হয়।

আলেকজান্দ্রার জন্ম ১৯৮৮ সালের ৬ নভেম্বর কাজাকস্থানের রাজধানী আলমাতিশহরে জন্ম। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে এলবাকিয়ান ইন্টারনেট ব্যবহারে সমস্যার সম্মুখীন হন। সেখানে ইন্টারনেট অ্যাক্সেস ছিল অত্যন্ত সীমিত এবং ইন্টারনেট থেকে বই, সঙ্গীত বা চলচ্চিত্র সংগ্রহ করা ছিল খুবই ব্যয়বহুল। এ সময় থেকেই নিজস্ব প্রয়োজনের তাগিদে তিনি কম্পিউটার হ্যাকিংয়ে দক্ষতা অর্জন করেন। তাঁর হ্যাকিংয়ের মূল উদ্দেশ্য ছিল ইন্টারনেটের বিভিন্ন কন্টেন্ট ডাউনলোডের ক্ষেত্রে যে পে-ওয়াল (paywall) থাকে, সেগুলোকে অতিক্রম করে বিনামূল্যে এসব কন্টেন্ট সংগ্রহ করা।

২০০৯ সালে তিনি রাশিয়ায় যান এবং মস্কোয় কম্পিউটার নিরাপত্তা বিষয়ে এক বছর কাজ করেন। ২০১০ সালে তিনি জার্মানিতে গিয়ে ‘আলবার্ট–লুদভিগ ফ্রেইবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে’র একটি গবেষণাগারে মানব মস্তিষ্ক–কম্পিউটার ইন্টারফেস নিয়ে কাজ করেন এবং ট্রান্সহিউম্যানিজম নিয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। একই সময়ে তিনি নিজের ও সহকর্মীদের গবেষণার প্রয়োজনে ইন্টারনেট থেকে পেমেন্ট ছাড়াই প্রচুর পরিমাণে বই ও অ্যাকাডেমিক আর্টিকেল ডাউনলোড করতে শুরু করেন, এবং তখন থেকেই মূলত তিনি গবেষকদের বিনামূল্যে অ্যাকাডেমিক সামগ্রী সরবরাহের জন্য একটি ওয়েবসাইট তৈরির চিন্তাভাবনা করতে থাকেন। জার্মানিতে তার কাজের জন্য তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় অবস্থিত ‘জর্জিয়া ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি’তে নিউরোসায়েন্স অ্যান্ড কনশাসনেস বিষয়ে একটি অবৈতনিক ইন্টার্নশিপ লাভ করেন। জ্ঞানচর্চাকে মুক্ত করার সিদ্ধান্তে ততদিনে তিনি বদ্ধপরিকর। 

২০১১ সালে আলেকজান্দ্রা নিজের দেশ কাজাখস্তানে ফিরে আসেন এবং একই বছরের ১৬ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে ‘সাই–হাব’ ওয়েবসাইটটি চালু করেন। তখন থেকেই সাই–হাবে লক্ষ লক্ষ অ্যাকাডেমিক পত্র আপলোড করা হয়েছে এবং বিশ্বের সমস্ত প্রান্ত থেকে অসংখ্য গবেষক, বৈজ্ঞানিক ও শিক্ষার্থী বিনামূল্যে এসব পেপার ব্যবহার করার সুযোগ পাচ্ছে। সাই–হাব না থাকলে অনেকের পক্ষেই তা সম্ভব হত না।

স্বভাবতই এসব নিয়ে যারা কোটি কোটি টাকার ব্যবসা ফেঁদে বসেছে, তাদের চক্ষুশূল হতে হল আলেকজান্দ্রাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইনে আলেকজান্দ্রা এলবাকিয়ান একজন পলাতক আসামী। ২০১৫ সালে মার্কিন প্রকাশনা সংস্থা এলসেভিয়ের তার নামে কপিরাইট লঙ্ঘনের অভিযোগে মামলা দায়ের করে এবং একটি মার্কিন আদালত এলসেভিয়েরকে দেড় কোটি (বা ১৫ মিলিয়ন) মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ প্রদানের জন্য এলবাকিয়ানকে নির্দেশ দেয়। ২০১৭ সালে আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটি এলবাকিয়ানের নামে আরেকটি মামলা দায়ের করে, এবং মার্কিন আদালত তাদেরকে ৪৮ লক্ষ (বা ৪.৮ মিলিয়ন) মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ প্রদানের জন্য এলবাকিয়ানকে নির্দেশ দেয়। কিন্তু এলবাকিয়ানের জন্মভূমি কাজাখস্তান বা কর্মক্ষেত্র রাশিয়া কেউই তাকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করতে আগ্রহী নয়, ফলে এই মামলাগুলোর রায় কার্যকর করা সম্ভব নয়। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে মার্কিন বিচার বিভাগ ঘোষণা দেয় যে, এলবাকিয়ানের সঙ্গে রুশ সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার যোগাযোগ রয়েছে, এবং রুশ গোয়েন্দারা ‘সাই-হাব’-এর অর্থায়ন করে থাকে। এলবাকিয়ান এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। 

প্রতিদিন গড়ে চার লক্ষের বেশি মানুষ 'সাই-হাব' ব্যবহার করেন। ২০২২ সালের একটি হিসেব বলছে, এই সাইটে ৮ কোটি ৯ লক্ষের বেশি পেপার ও জার্নাল রয়েছে। প্রচুর বড় অঙ্কের আইনি মামলায় জড়িয়েও এই সাইট একদিনের জন্যও বন্ধ হয়নি। মুক্ত জ্ঞানচর্চা আন্দোলন বা Open Access Movement গোটা সাইবার-দুনিয়া জুড়েই এখন সারা জাগানো একটি ঘটনা। তার অন্যতম সৈনিক আলেকজান্দ্রা এলবাকিয়ান। বিশ্বের কোটি কোটি সাধারণ পড়ুয়া তাঁকে কোনোদিন ভুলবে না।  ২০১৬ সালে বিখ্যাত 'নেচার' পত্রিকা তাঁকে আধুনিক বিজ্ঞানের জগতে দশজন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের তালিকায় স্থান দিয়েছে।

...............  


#Alexandra Elbakyan #Sci-Hub #Security hacker #Open Access #silly পয়েন্ট

Leave a comment

All fields are required. Comment will appear after it is approved.

trending posts

newsletter

Connect With Us

today's visitors

70

Unique Visitors

143596