নিবন্ধ

পরিবেশ গবেষণার পথিকৃৎ : বিস্মৃতপ্রায় এক মনস্বিনী  ইউনিস নিউটন ফোট

সিদ্ধার্থ মজুমদার May 11, 2024 at 5:21 am নিবন্ধ

“পরিবেশ বিজ্ঞানের জনকের আবিষ্কার কি ইউনিস নিউটন ফোটের মূল গবেষণার ধারণা থেকে চুরি করা?” এই উদ্ধৃত অংশটি ২০২১ সালে ‘দ্য ওয়াশিংটন টাইমস’ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি নিবন্ধের শিরোনাম। বলার অপেক্ষা রাখে না, এ এক মারাত্মক অভিযোগ! কিন্তু কে এই ‘পরিবেশ বিজ্ঞানের জনক’?

পদার্থ বিজ্ঞান ও পরিবেশ বিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রীদের কাছে আইরিশ পদার্থবিজ্ঞানী ‘জন টিনড্যাল’ একটি পরিচিত নাম। এই টিনড্যালকেই পরিবেশ বিজ্ঞানের জনক হিসাবে মান্যতা দেওয়া হয়। প্রবন্ধের শিরোনামে থাকা ‘ইউনিস নিউটন ফোট’ নামটিও আমাদের কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত। এই লেখায় আমরা ‘ইউনিস নিউটন ফোট’ নামের এই মহিলা গবেষকের কথা শুনব। জানার চেষ্টা করব, কেন তিনি তাঁর কৃতিত্বের স্বীকৃতি পাননি?  

 

তার আগে জেনে নেওয়া দরকার, টিনড্যালকে কেন পরিবেশ বিজ্ঞানের জনক বলা হয়?

 

১৮৫৯ সালের ২৬শে মে টিনড্যাল তাঁর সদ্য করা একটি পরীক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার ফলাফল পাঠান লন্ডনের রয়াল সোসাইটিতে। ফলাফলের ভিত্তিতে তিনি যে সিদ্ধান্তটি করেন তা হল, ‘বিভিন্ন গ্যাস বিভিন্ন মাত্রায় সূর্যের বিকীর্ণ তাপের ভূপৃষ্ঠ থেকে ফিরে যাওয়াতে বাধা দেয়’। রয়াল সোসাইটিকে তাঁর কাজের মৌলিকতা বোঝাতে টিনড্যাল আরও দাবী করেন, ‘যত দূর জানা আছে, কোনও গ্যাসীয় বস্তু দ্বারা বিকীর্ণ তাপ যেতে না-দেওয়ার সম্পর্কে তাঁর আগে অন্য কোনও গবেষণাপত্র প্রকাশ পায়নি।   


এই যে বিভিন্ন গ্যাস পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে বিকীর্ণ সূর্য তাপ ফিরে যাওয়ার রাস্তা আটকে দেয় এবং যার ফলে ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বাড়ে, পরবর্তী সময়ে এই ঘটনাকে ‘দ্য গ্রিন হাউস ইফেক্ট’ হিসাবে পরিচিত হয়েছে। আর এই আবিষ্কারের জন্যেই টিনড্যাল ‘দ্য ফাদার অফ ক্লাইমেট সায়েন্স’ হিসাবে পরিচিত হবেন পরবর্তী সময়ে।   

 

টিনড্যালের দাবী অনুযায়ী সত্যিই কি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তাঁর আগে অন্য কোনও গবেষণাপত্র প্রকাশ পায়নি? প্রকাশ পেলেও কি তা তবে টিনড্যালের নজর এড়িয়ে গেছিল? এসব প্রসঙ্গে আমরা আসব। তার আগে ‘গ্রিন হাউস ইফেক্ট’ বা ‘বিশ্বউষ্ণায়ন’ বিষয়ে একটু বুঝে নেওয়া দরকার। বিশ্বউষ্ণায়ন, গ্রিনহাউস গ্যাস ইত্যাদি শব্দগুলির সঙ্গে আমরা ইদানিংকালে সবাই অল্পবিস্তর পরিচিত। পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে আপমাত্রা বাড়ার পেছনে যে গ্রিনহাউস গ্যাস তথা কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড,কার্বন মনোক্সাইড, ওজোন, জলীয় বাষ্প ইত্যাদি গ্যাসই দায়ী, তা পরিবেশ বিজ্ঞানীদের গবেষণা থেকে উঠে এসেছে। বায়ুমণ্ডলের নীচের স্তরে এই গ্যাসগুলি একটি শামিয়ানার মতন তৈরি করে এবং সূর্য থেকে পৃথিবীতে আসা তাপের তরঙ্গ মহাশূন্যে ফেরার সময় বাধা পায়। যার ফলে ওই তাপের কিছু অংশ পৃথিবীপৃষ্ঠে ফিরে আসে, যা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়। এই ঘটনাকেই বলে ‘বিশ্ব উষ্ণায়ন’। বিজ্ঞানীরা আরও বলেছেন,‘গ্রিনহাউস’ গ্যাসের মধ্যে প্রায় পঞ্চাশ শতাংশই থাকে ‘কার্বন ডাই-অক্সাইড’, যা বিশ্বউষ্ণায়নের জন্যে মুখ্য দায়ী।


কম বেশি আড়াইশো বছর আগে কলকারখানা গড়ে ওঠা আরম্ভ হয়েছে এবং এসেছে যানবাহন। সভ্যতার বিকাশ এবং বিজ্ঞান প্রযুক্তির অগ্রগতি,জীবাশ্ম-জ্বালানির দহন,অরণ্য ধ্বংস এবং মানুষের বিভিন্ন কার্যকলাপ থেকেই পৃথিবীতে কার্বন ডাই-অক্সাইড এবং অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাসের ঘনত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। পৃথিবীর তাপমাত্রা যে ধীরে ধীরে বাড়ছে এবং বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাবে নানান ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়ে চলেছে, কয়েক দশক আগে থেকেই প্রকৃতির সেই খামখেয়ালি আচরণ বিষয়ে আমরা অনেকেই ওয়াকিবহাল। পরিবেশ সংকট মোকাবিলায় পৃথিবীর অনেক দেশের শীর্ষ নেতানেত্রী এবং নীতি নির্ধারকরা নজর দিয়েছেন, যারই ফলশ্রুতি দু-এক দশক ধরে নানান সম্মেলন, চুক্তি এবং পরিবেশ রক্ষা সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক জমায়েতের খবর পাওয়া যায়।

  

পরিবেশের তাপমাত্রা বাড়ার পেছনে কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাসের প্রভাব আছে, এই আবিষ্কারের কৃতিত্ব টিনড্যালকে দেওয়া হয়েছে, এ কথা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বিশ্বউষ্ণায়নের পেছনে গ্রিনহাউস গ্যাসের প্রভাবের গুরুত্বপূর্ণ দাবী টিনডেলেরও আগে আরও একজন করেছিলেন। টিনড্যালের আবিষ্কারের তিন বছর আগে ইউনিস নিউটন ফোট (Eunice Newton Foote) নামের একজন আমেরিকান ‘অ্যামেচার সায়েন্টিস্ট’ একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। যার শিরোনাম ছিল , “Circumstances affecting the heat of the sun’s rays”। ইউনিসের এই গবেষণাপত্রের শিরোনাম এবং কাজের ফলাফল থেকে সুস্পষ্ট যে ইউনিস ফোটের দাবিও টিনড্যালের দাবী প্রায় একই, তিনিও নির্দিষ্টভাবে কার্বন ডাই-অক্সাইড এবং জলীয় বাষ্পের কথা বলেছেন। উল্লেখ্য করা দরকার ইউনিস ফোট শখের বিজ্ঞানী ছাড়াও ছিলেন মহিলাদের অধিকার রক্ষা আন্দোলনের একজন প্রথম সারির সক্রিয় নেত্রীও।


টিনড্যালের কাজের তিন বছর আগে, ইউনিস ফোট তাঁর সৃজনশীল পরীক্ষার ফলাফল থেকে প্রমাণ করেন, বায়ুমন্ডলের কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস-ই পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ার জন্যে দায়ী। বস্তুত ইউনিসের এই কাজ থেকে বুঝতে অসুবিধা হয় না, আধুনিক পরিবেশ বিজ্ঞানের একজন অন্যতম ভিত্তি স্থাপনকারী তিনি। খুবই সাধারণ ছিল তাঁর পরীক্ষার উপকরণ, একটি ‘এয়ার-পাম্প’, দুটি ‘গ্লাস-সিলিন্ডার’, এবং চারটি থার্মোমিটার। দু’টি সিলিন্ডারের একটিতে নিয়েছিলেন কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস, অন্যটিতে সাধারণ বায়ু। তারপর ওই জার দু’টিকে সূর্য তাপে রেখে দেওয়ার পরে সময় ধরে তাপমাত্রা পরিমাপ করে দেখেন ইউনিস। এই পরীক্ষা থেকে তিনি দেখলেন যে, কার্বন ডাই-অক্সাইড তুলনামূলক ভাবে অন্য গ্যাসের থেকে দীর্ঘ সময় ধরে বেশি তাপ ধরে রাখতে পারে। তাঁর করা এই সহজ পরীক্ষার সাহায্যে তিনি প্রমাণ করলেন, পৃথিবীতে তাপমাত্রা বাড়ার অন্যতম কারণ ‘কার্বন ডাই-অক্সাইড’। ১৬৭ বছর আগে ইউনিসের করা এটিই ক্লাইমেট-ফিজিক্সের প্রথম পরীক্ষা। 


শুধু পরীক্ষা করলেই তো হবে না, এরপর বিজ্ঞান মহলের বিশিষ্ট মানুষদের জানাতে হবে গবেষণালব্ধ ফলাফল। তাই ইউনিস ঠিক করলেন, ‘আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্যা অ্যাডভান্সমেন্ট অফ সায়েন্স’ (AAAS) -এর সদস্যদের কাছে উপস্থাপিত করবেন তাঁর কাজের ফলাফল। মূলত ওইখানে গবেষক বিজ্ঞানীরা নিজেদের গবেষণার বিষয়ে বলে থাকেন।


দিনটি ছিল ১৮৫৬ সালের ২৩ শে আগস্ট। নিউ ইয়র্কের অলবেনি-তে AAAS বক্তৃতা কক্ষে সেদিন ছিল AAAS-এর অষ্টম বার্ষিক সভা। শ্রোতৃমণ্ডলীর সকলেই বিজ্ঞান গবেষক এবং ‘এএএএস’-এর সদস্য। ওই কক্ষের পেছনের সারিতে এক ধারে বসে ছিলেন AAAS-এর সদস্য ইউনিস ফোটও। জোসেফ হেনরি নামের এক ব্যক্তি, যিনি একটি প্রতিষ্ঠানের সচিব, মঞ্চে  বলতে ওঠেন। ধারাবিবরণীর মতন তাঁর পড়ে যাওয়া শুনেই বুঝতে অসুবিধা হল না যে,  তিনি আসলে অন্য কারোর গবেষণার কাজ নিয়ে বলছেন। তাই ওই গবেষণার প্রভাব ও গুরুত্ব  শ্রোতাদের বোঝাতে পারছিলেন না তিনি। চরম বেদনার কথা, যার গবেষণার কাজ পড়ে শোনানো হচ্ছিল, তা ইউনিস ফোটের, যিনি স্বয়ং শ্রোতাদের মধ্যে ওই সভাকক্ষে তখন উপস্থিত। কিন্তু যেহেতু সেই বিজ্ঞান সভায় মহিলাদের বলার নিয়ম নেই, তাই  নিজের কাজ বলার অধিকারী নন তিনি। ভাবতে আশ্চর্য লাগে, মহিলা বলে নিজের আবিষ্কারের ফলাফল নিজে বলতে না পারার এইরকম অসহায়, অবমাননাকর ও বৈষম্যমূলক নিয়ম জারি ছিল সেসময়য়! শুধু মহিলা-ই নন, ফোট-কে একজন ‘অ্যামেচার বিজ্ঞান গবেষক’ হিসাবে চিহ্নিত করে দেওয়ায় ইউনুসের গবেষণালব্ধ ফলাফলকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্যের চোখে দেখারও একটা সুবিধা হয়েছিল। 

 

এই ঘটনার কয়েকমাস পরে AAAS-এর একটি সংখ্যায় প্রকাশিত হল ইউনিসের গবেষণাপত্র, যা ছিল একজন মহিলা গবেষকের লেখা ফিজিক্সের প্রথম প্রকাশিত গবেষণাপত্র। ইউনিসের গবেষণার ফলাফল এবং সিদ্ধান্ত যে ভবিষ্যৎ পৃথিবীর পরিবেশকে রক্ষা করার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত। কিন্তু পরিবেশ বিজ্ঞানের এই অগ্রদূত গবেষকের কথা খুব তাড়াতাড়িই ভুলে গেলেন মানুষ। বিস্মৃতির অন্ধকার গভীরে হারিয়ে গেলেন ইউনিস! মৃত্যুর একশো তেইশ বছর পরে, ২০১১ সালে প্রথম বিস্মৃতির অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া সেই অগ্রদূতের কথা নজরে এসেছে যখন একজন ভূততত্ববিদ এবং বিজ্ঞান ঐতিহাসিক ইউনিসকে পুনরাবিষ্কার করেন।


বছর পাঁচ আগে যখন ‘ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া’ তাঁর স্মৃতির প্রতি সম্মান জানানোর উদ্দেশে একটি বিজ্ঞান সম্মেলনের আয়োজন করে। ফোটের জীবন আধারিত একটি স্বল্প দৈর্ঘের চলচিত্রও নির্মাণ করা হয়। তাঁকে নিয়ে আরও কয়েকটি উল্লেখযোগ্য কাজ হয়েছে কাছাকাছি সময়ে। যেমন, কর্নেল ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে ‘কমিউনিকেটিং ক্লাইমেট চেঞ্জ – এ গাইড ফর এজুকেটরস কনফার্মিং দ্যাট ফোট’স ওয়ার্ক  প্রিসিডেড  দ্যাট অফ টিনড্যাল’ শীর্ষক একটি পাঠ্যবই প্রকাশিত হয়েছে। ফোটের অবদান এবং উত্তরাধিকারকে সম্মান জানিয়ে ‘ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া’ সাত মাসের একটি প্রদর্শনীরও আয়োজন করেছিল, ‘ফ্রম ইউনিস ফোট টু ইউসিএসবিঃ এ স্টোরি অফ ওম্যান, সায়েন্স, অ্যান্ড ক্লাইমেট চেঞ্জ’। 


 পৃথিবীর জলবায়ু সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পরিবেশ বিজ্ঞানী ও পরিবেশবিদরা ‘কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস’ নিঃসরণ কমানোর সতর্ক বার্তা দিয়ে আসছেন দশকের পর দশক ধরে। কিন্তু এ বিষয়ে উন্নতশীল মার্কিন প্রশাসনের যে সদিচ্ছার যথেষ্ট অভাব, তা তাঁরা সুস্পষ্ট ভাবেই বুঝিয়ে দিয়েছেন। এমনকি মাত্র দু দশক আগের ঘটনা, NASA-র পরিবেশ বিভাগের প্রধান এবং মার্কিন পরিবেশ বিজ্ঞানীর প্রস্তুত করা গ্লোবাল ওয়ার্মিং সংক্রান্ত সপ্রমাণ সতর্কবার্তার দলিলকেও ধাপ্পাবাজি বলে মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং ওই লেখার বয়ান বদল করতেও বাধ্য করা হয়েছে তাঁকে।

  

পৃথিবীর চরম সংকট রক্ষা করার বদলে প্রথম সারির দেশের প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্থানে থাকা ব্যক্তিদের মনোভাব ও দায়িত্বশীলতা যদি এইরকম হয়, সেখানে একশ আটষট্টি বছর আগে ইউনিস ফোট নামের একজন শখের গবেষক এবং মার্কিন নারীর কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাসের প্রভাবে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের তাপমাত্রা বাড়া সংক্রান্ত আবিষ্কারের যে কোনও মূল্যই থাকবে না, তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। তাই অতি সহজেই বিস্মৃতির অন্ধকারে তলিয়ে গিয়েছিল তাঁর নাম। ২০২৩ সালে ১৭ জুলাই ইউনিস ফোটের দুশো চার’তম জন্মদিনে ‘গুগুল ডুডুল’-এর মাধ্যমে তাঁকে সম্মান জানিয়েছে। 

..............


#Eunice Newton Foote #American scientist and inventor # women's rights campaigner #silly পয়েন্ট

Leave a comment

All fields are required. Comment will appear after it is approved.

trending posts

newsletter

Connect With Us

today's visitors

80

Unique Visitors

191077