ব্যক্তিত্ব

সম্পাদক মধুসূদন

আহ্নিক বসু 4 days ago ব্যক্তিত্ব ৬৬

হঠকারী। অপরিণামদর্শী। আত্মধ্বংসী। মহাকবি, নাট্যকার মাইকেল মধুসূদন দত্তের কথা উঠলে এই শব্দগুলো মনে না এসে পারে না। বাংলা সাহিত্যের বৃহত্তম অপচয় যে তিনিই, এ নিয়ে কারও তেমন সন্দেহ আছে বলে মনে হয় না। বিপুল প্রতিভার এমন শোচনীয় পরিণতির নমুনা গোটা বিশ্বসাহিত্য ঘাঁটলে আর কটা-ই বা পাওয়া যাবে? মাত্র সাঁইতিরিশ বছরেই তাঁকে লিখে ফেলতে হয় 'আত্মবিলাপ'-এর মতো কবিতা। তবু জীবনের বাকি বারোটা বছর একটুও সংশোধন করে নিতে পারেন না নিজেকে। রাজনারায়ণ দত্তের ছেলে টাকা গুণে খরচ করত না। মর্মান্তিক অবস্থায় তাঁকে মৃত্যুর দিন গুনতে হয় এন্টালির এক বস্তিতে। মৃত্যুর পর মেঘনাদ বধ কাব্যের রচয়িতার মৃতদেহ গোটা রাত পড়ে থাকে দুর্গন্ধে-ভরা মর্গে। স্বখাত সলিলে ডুবে মরার ক্লাসিক উদাহরণ মাইকেল এ-বছর দ্বিশতবর্ষে পা রাখছেন। ১৮২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি তাঁর জন্ম। বিস্তর আলোচনা হয়েছে তাঁর সাহিত্যকর্ম নিয়ে, তাঁর ভুলভ্রান্তি নিয়েও। কিন্তু সম্পাদক মাইকেল মধুসূদন দত্তকে নিয়ে তেমন আলোচনা হয় না। আজ সেই নিয়েই দু-চার কথা।

অল্প সময়ের জন্য হলেও মাইকেল বেশ সাফল্যের সঙ্গে কয়েকটি পত্রিকা সম্পাদনা করেছিলেন। মাদ্রাজে থাকাকালীন তিনি প্রথমে কিছুদিন একটি অরফ্যান স্কুলে (স্কুলের পুরো নাম 'মাদ্রাজ মেল অ্যান্ড ফিমেল অরফ্যান অ্যাসাইলাম অ্যান্ড বয়েজ ফ্রি ডে স্কুল')  শিক্ষকতা করতেন। পাশাপাশি বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখালিখি করতেন। এই সূত্রে সুলেখক হিসেবে তাঁর একটি পরিচিতি তৈরি হয়েছিল। Madras Advertiser পত্রিকার মালিক অ্যাবেল পেন সিমকিন্স ১৮৪৯ সালে Eurasian নামে নতুন একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। এই পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে তিনি বেছে নেন মাইকেলকে। প্রসঙ্গত বলে রাখা ভালো, এই অ্যাবেল সিমকিন্সের প্রেস থেকেই মুদ্রিত হয়েছিল মাইকেলের প্রথম কাব্য The Captive Lady। এই কাব্য মাইকেলকে কাঙ্খিত যশ এনে দিতে পারেনি। তেমন বিক্রিও হয়নি। প্রেসের টাকা মেটানোর জন্য সিমকিন্স তাঁকে প্রথমদিকে চাপ দিলেও পরবর্তীকালে কিন্তু কবির সঙ্গে তাঁর বেশ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছিল। তারই ফলশ্রুতি Eurasian পত্রিকা। 


সিমকিন্সের ব্যবসাবুদ্ধির তারিফ করেছেন মাইকেলের জীবনীকার গোলাম মুরশিদ। তাঁর কথায়, "মাদ্রাজে সেকালে একটি বড়ো ইউরেশিয়ান সম্প্রদায় বাস করতো। ... তিনি অনুমান করেছিলেন যে, বিশেষ করে ইউরেশিয়ানদের স্বার্থের কথা মনে রেখে একটি সংবাদপত্র প্রকাশ করতে পারলে তা জনপ্রিয় হবে।" আর মাইকেলের ইংরেজিতে দখল আর কলমের জোরের কথা চিন্তা করে সিমকিন্স তাঁকেই সম্পাদক হিসেবে নিয়োগ করলেন। ৩ নভেম্বর, ১৮৪৯ থেকে প্রতি শনিবার পত্রিকাটি প্রকাশ পেতে শুরু করে। দায়িত্ব পেয়ে মাইকেল পূর্ণ উদ্যমে নানা বিষয়বৈচিত্র্যে সাজাতে শুরু করলেন পত্রিকাটিকে। এই পত্রিকায় স্থানীয় খবরের পাশাপাশি থাকত ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গার গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলি ও আদালত, সেনাবাহিনি, জাহাজ চলাচল ইত্যাদি অত্যাবশ্যকীয় খবর। মাইকেল নিজেও প্রচুর লিখতে শুরু করলেন। তাঁর বেশ কিছু কবিতা এই পত্রিকায় প্রকাশ পায়। এছাড়া পত্রিকার দ্বিতীয় সংখ্যা থেকে শুরু করলেন কাব্যনাট্য Rizia। অবশ্য এই কাব্যনাট্য তিনি সম্পূর্ণ করতে পারেননি। মোট ন-টি দৃশ্য প্রকাশের পরেই আকস্মিকভাবে ইতি টানেন। 'ইউরেশিয়া' মাইকেলের সৃজনশীল সত্তাকে এক নতুন অভিমুখ দিয়েছিল তো বটেই, পাশাপাশি বাড়তি আয়ের একটা রাস্তাও খুলে দিয়েছিল। অরফ্যান স্কুলের মাইনে খুব বেশি না হওয়ায় এই বাড়তি আয়টুকু মাইকেলকে খুবই সাহায্য করেছিল। পরের বছর জুন মাসে পাঠকপরিধি বাড়ানোর জন্য পত্রিকার নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় Eastern Guardian। কয়েক মাস পর সিমকিন্সের মালিকানায় দেশীয় পাঠকদের জন্য Madras Hindu Chronicle নামে আরেকটি  পত্রিকা চালু হয়। এই পত্রিকাও সম্পাদনার দায়িত্ব পান মাইকেল। এই দুই পত্রিকায় মাইকেল নিয়মিত বিভিন্ন বিষয়ে নিবন্ধ ও ফিচারধর্মী লেখাও লিখতেন। সাহিত্য-সংস্কৃতি ছাড়াও সমাজ, রাজনীতি, শিক্ষা ইত্যাদি নিয়ে তাঁর বিভিন্ন লেখা বিষয়ে সমসাময়িক পত্রিকা Athenaeum উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছে। চিন্তাজীবী হিসেবে যে তিনি সমকালীন শিক্ষিত সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করচতে পারছিলেন, তার প্রমাণ পাওয়া যায়। পরে এই দুটি পত্রিকারই মালিকানা বদল হয়। তবে Madras Hindu Chronicle-এর সম্পাদনার ভার মাইকেলের হাতেই থেকে যায়। প্রায় বছরদেড়েক তিনি এই পত্রিকা সম্পাদনা করেন। মাদ্রাস স্কুলে চাকরি পেয়ে তাঁকে এই পত্রিকার কাজ ছাড়তে হয়েছিল। স্কুল কর্তৃপক্ষের শর্ত মেনে তাঁকে সম্পাদনার কাজে ইতি টানতে হয়েছিল। সে-সময় স্কুলের চাকরির আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্যটুকু মাইকেলের খুবই দরকার ছিল। অরফ্যান অ্যাসাইলামের তুলনায় মাদ্রাস স্কুলের মাইনে অনেক বেশি ছিল। সম্ভবত ১৯৫২ সালের মার্চ মাসে মাইকেল মাদ্রাস স্কুলে যোগ দেন। তিনি Madras Hindu Chronicle-এর সম্পাদনা ছাড়তে বাধ্য হওয়ায় খেদ প্রকাশ করা হয়েছিল  Athenaeum পত্রিকার পাতায়। 

১৮৫৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে অভ্যন্তরীণ তিক্ততার কারণে মাইকেল মাদ্রাস স্কুলের চাকরিটিও ছাড়তে বাধ্য হন। এ-সময় Madras Spectator নামে একটি পত্রিকার সহ-সম্পাদকের কাজ পান। এই কাজটি সাময়িকভাবে তাঁকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল বলা চলে। নাহলে স্কুলের চাকরি হারিয়ে অসুস্থ স্ত্রী রেবেকা ও চারটি সন্তান নিয়ে তাঁকে ভয়ানক আতান্তরে পড়তে হত। 

পরে ১৯৬২ সালে কলকাতায় থাকাকালীন আরও একটি পত্রিকার সম্পাদনার ভার তাঁকে নিতে হয়েছিল। পত্রিকাটি শিক্ষিত বাঙালিদের মধ্যে প্রভূত জনপ্রিয় ছিল। হরিশচন্দ্র মুখার্জির Hindoo Patriot। হরিশচন্দ্র মারা যাবার পর পত্রিকার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও যতীন্দ্রমোহন ঠাকুরের অনুরোধে মাইকেল এই পত্রিকার দায়িত্ব নেন। মাদ্রাজে সম্পাদনার পূর্ব-অভিজ্ঞতা এবং নিজের ক্ষমতায় স্বভাবজ অহংকারের কারণে তিনি নিশ্চিত ছিলেন এই পত্রিকার মান তাঁর হাতে অনেক উঁচুতে পৌঁছবে। এ-সময় রাজনারায়ণ বসুকে লেখা একটি চিঠিতে এমন একটি মন্তব্য খুঁজে পাওয়া যায় - "আগামী সোমবারের সংখ্যাটাকে আমার সম্পাদিত সংখ্যা বলে চিনতে তোমার বেগ পেতে হবে না।" তবে মাত্র কয়েক সপ্তাহই তিনি এ পত্রিকা সম্পাদনা করেছিলেন। সম্ভবত মনমতো টাকাপয়সা পাচ্ছিলেন না বলে দ্রুতই তিনি এ বিষয়ে আগ্রহ হারিয়েছিলেন। যতীন্দ্রমোহন ঠাকুরের সঙ্গে তাঁর পত্রবিনিময় থেকে জানা যায়, যতীন্দ্রনাথ সাম্মানিকের ব্যাপারে আরও একটু ধৈর্য ধরতে বলেছিলেন মাইকেলকে। কিন্তু মাইকেল সে অনুরোধ রাখতে পারেননি। অবশ্য এ-সময় মাইকেল ওকালতি পড়তে ইংল্যান্ড যাবার ব্যাপারে মনস্থির করে ফেলেছিলেন। দ্বিতীয় স্ত্রী হেনরিয়েটা ও দ্বিতীয় পক্ষের দুই সন্তানকে কলকাতাতেই রেখে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এই নিয়ে প্রবল মানসিক টানাপোড়েন চলছিল তাঁর। সব মিলিয়ে একটি পত্রিকা সামলানোর মতো গুরুদায়িত্ব তাঁর পক্ষে নেওয়া আর সম্ভব হচ্ছিল না।   

..................  

ঋণ : আশার ছলনে ভুলি, গোলাম মুরশিদ 

#Michael Madhusudan Dutt #মাইকেল মধুসূদন দত্ত #জন্মদ্বিশতবর্ষ #silly পয়েন্ট

Leave a comment

All fields are required. Comment will appear after it is approved.

trending posts

newsletter

Connect With Us

today's visitors

5

Unique Visitors

128277