অনুবাদ

প্রেত: একটি জাপানি লোককথা

আহ্নিক বসু Jan 24, 2021 at 5:07 am অনুবাদ ৬৬

মূল গল্প : Jikininki
লেখক : প্যাট্রিক লাফকাদিও হার্ন

[এটি জাপানের একটি জনশ্রুতি-নির্ভর কাহিনি। পটভূমি আঠেরো শতকের জাপান। কাহিনির কাঠামো দাঁড়িয়ে আছে জেন বৌদ্ধধর্মের কিছু রীতিনীতি ও বিশ্বাসের ওপর]। 


এই কাহিনির মূল চরিত্র জেন সম্প্রদায়ের এক যাজক, নাম মিসো কোকুশি। মুসো প্রায়শই একা পদব্রজে পর্যটনে বেরোতেন। একবার মিনো প্রদেশে পর্যটনকালে আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তায় তিনি পথ হারিয়ে ফেললেন। 


একেবারে বিজন জায়গা। দূরদূরান্তে প্রাণের চিহ্নমাত্র নেই। মিসো কাউকে খুঁজে পেলেন না যে তাঁকে পথের হদিশ দিতে পারবে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে গেল দিশাহীনভাবে ঘুরে ঘুরে। এদিকে সন্ধে নেমে আসছে। অসহায়, ক্লান্ত মিসো মনে মনে প্রার্থনা করছিলেন যাতে রাতে মাথা গোঁজার মতো একটা ঠাঁই অন্তত খুঁজে পাওয়া যায়। 


অবশেষে দূরে পাহাড়ের কোলে একটা ছোট্ট কুঁড়েঘরের দেখা পেয়ে তিনি একটু আশ্বস্ত হলেন। দেখে বোঝা যাচ্ছে, কোনও পুরোহিত বা যাজকের আবাস। জাপানি ভাষায় এই ধরনের কুঁড়েঘরকে বলা হয় আঞ্জিৎসু। একটু এগিয়ে গিয়ে মিসো বুঝলেন, কুঁড়েঘরটি একেবারে ভাঙাচোরা। থাকার পক্ষে খুবই বিপজ্জনক। আদৌ কেউ থাকে কিনা সন্দেহ। তবু, এগিয়ে যাওয়া ছাড়া মিসোর আর কোনও উপায় ছিল না। আজ রাতের জন্য এই আঞ্জিৎসু ছাড়া কোনও উপায়ান্তর দেখা যাচ্ছে না। 

প্রায় ভেঙে পড়া দরজা ঠেলে মিসো দেখলেন, এক বৃদ্ধ বসে আছেন ভিতরে। পরনে যাজকের পোশাক। 


আগন্তুকের সাড়া পেয়ে বিরক্ত মুখে ফিরে তাকালেন তিনি। 


মিসো বিনীত স্বরে বললেন, “আমি একজন যাজক। আমি মিনো সদরে যাচ্ছিলাম, কিন্তু পথ হারিয়ে ফেলেছি। আজ রাতটুকু যদি এখানে থাকতে অনুমতি দেন, তাহলে বড়ো উপকার হয়।” 


“আপনাকে এখানে থাকতে দিতে পারব না,” বৃদ্ধ বেশ রুক্ষ ভঙ্গিতে বললেন, “তবে উত্তরদিকে একটু এগিয়ে গেলে একটা গ্রাম পাবেন। সেখানে রাতে থাকতে পারবেন, খাবারও পাবেন।”


উত্তরদিকে সামান্য কিছুটা পথ এগিয়েই মিসো গ্রামটা দেখতে পেলেন। একেবারেই ছোট গ্রাম। দশ-বারোর বেশি ঘর নেই। গ্রামের প্রবেশপথে মিসো লক্ষ করলেন, প্রায় চল্লিশ-পঞ্চাশজন মানুষ জড়ো হয়েছেন। সম্ভবত গ্রামের সমস্ত মানুষই আছেন। গ্রামে কি তবে কোনও অনুষ্ঠান আছে আজ? সেরকম কোনও আয়োজন অবশ্য দেখা যাচ্ছে না।


মিসোকে দেখে গ্রামের প্রধান এগিয়ে এলেন। রাতটুকুর জন্য মিসোর আশ্রয় প্রয়োজন শুনে সাদর অভ্যর্থনা জানালেন তাঁকে। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে আলাদা একটি ঘর দেওয়া হল। দ্রুত খাবারও এসে গেল। খাওয়াদাওয়া সেরে তৃপ্ত মিসো বিছানায় শুয়ে পড়লেন। সারাদিনের ক্লান্তির পর ভরপেট খাবার পেয়ে দু-চোখ ঘুমে জড়িয়ে আসছিল, ফলে ঘুম আসতে দেরি হল না। 


বেশ কয়েক ঘণ্টা পর, উৎকট একটা শব্দে আচমকা মিসোর ঘুম ভেঙে গেল। সমবেত একটা বিলাপের শব্দ। অনেক মানুষ একসঙ্গে কাঁদছে। মিসো বিছানায় উঠে বসলেন। কান্নার শব্দটা খুব কাছাকাছির কোনও ঘর থেকেই আসছে। স্বাভাবিক শোকের কান্না বলেই মনে হচ্ছে। 


ঘুম-ঘুম ভাবটা কেটে গেল। মিসো সচকিত হয়ে উঠলেন। কারও কি কোনও বিপদ ঘটল?  


ভাবতে ভাবতেই দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকল এক যুবক, হাতে একটি লন্ঠন। মিসোকে অভিবাদন জানিয়ে যুবক নম্র স্বরে বলল, “আপনাকে বিরক্ত করার জন্য ক্ষমা চাইছি। কিন্তু এ বাড়ির কর্তা হিসেবে বিষয়টা আপনাকে জানানোর দায়িত্ব আমারই। কাল পর্যন্তও কিন্তু আমি বাড়ির কর্তা ছিলাম না। আজ আপনি যখন এলেন, ক্লান্ত-বিধ্বস্ত ছিলেন বলে আপনাকে আর বিষয়টা জানিয়ে বিড়ম্বনায় ফেলতে চাইনি। ঘটনা হচ্ছে, আপনি আসার কয়েক ঘণ্টা আগেই আমার কাকা মারা গেছেন। সেইজন্যই তখন গ্রামের সবাই জড়ো হয়েছিলাম। কাকার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাচ্ছিলাম আমরা। আমাদের গ্রামের নিয়ম অনুযায়ী, এবার আমাদের এই গ্রাম ছেড়ে আজকের মতো অন্য কোথাও চলে যেতে হবে। আমাদের প্রাচীন ঐতিহ্য অনুযায়ী, গ্রামে কেউ মারা গেলে সেই রাতটা কেউই আমরা গ্রামে কাটাতে পারব না। তাই আমরা এখান থেকে তিন মাইল দূরে অন্য একটা গ্রামে যাচ্ছি আজকের রাতটা কাটাতে। মৃতের সৎকারের সমস্ত বন্দোবস্ত আমরা সেরে ফেলেছি। প্রার্থনাও সারা হয়ে গেছে। এবার মৃতদেহ এখানে রেখে আমাদের চলে যেতে হবে। আপনিও আমাদের সঙ্গে আসতে পারেন। আমরা যেখানে যাচ্ছি, সেখানেও আপনার থাকার জায়গা পেতে সমস্যা হবে না।” অনেকক্ষণ বলার পর যুবক সামান্য বিরতি নিল। তারপর একটু চাপা গলায় বলল, “এই অঞ্চলে বাড়িতে কোনও মৃতদেহ থাকলে রাতে অশৈলী সব কাণ্ড ঘটে।”


কথাটা শুনে প্রথমে মিসোর ভুরু একটু কুঁচকে গেল। পরক্ষণেই অবশ্য স্মিত হাসি ফুটে উঠল তাঁর ঠোঁটের কোণে। যুবক সেটা লক্ষ করল। মিসোর মনোভাব আন্দাজ করে সে বলল, “অবশ্য আপনার কথা আলাদা। আপনি নিজে একজন যাজক। আপনি শয়তান বা দুষ্ট আত্মাকে ভয় করেন না। আপনি চাইলে এখানে থেকে যেতেও পারেন। তবে, আবারও আপনাকে বলছি, সাধারণ কেউ কিন্তু আজ রাতটা এখানে কাটাতে চাইবে না।” 


ঠোঁটের হাসি ধরে রেখেই মিসো জবাব দিলেন, “আপনাদের আন্তরিক আতিথেয়তা পেয়ে আমি কৃতজ্ঞ। ধন্যবাদ জানানোর ভাষা নেই আমার। তবে আমি খুশি হতাম যদি আমি আসামাত্র আপনার কাকার মৃত্যুসংবাদটা আমায় দিতেন। আমি এতটাও ক্লান্ত ছিলাম না যে অন্ত্যেষ্টিকাজের দায়িত্ব পালন করতে আমার অসুবিধা হত। যাজক হিসেবে সেটা তো আমার কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। আপনারা তখনই যদি আমায় জানাতেন, আপনাদের যাবার আগেই আমি সৎকারের সমস্ত কাজকর্ম সেরে ফেলতাম। যাই হোক, আমি আমার মতো করে কিছু রীতি পালন করে নেব। আর সকাল অবধি আমি এখানেই থাকব, মৃতদেহের পাশে। আমি জানি না আপনি কী ধরনের বিপদের কথা বলছেন। তবে ভূত-প্রেত-পিশাচে আমি ভয় পাই না। আর আপনি যেটা বললেন, আমি নিজেই যাজক। ফলে আমায় নিয়ে দুশ্চিন্তা করবেন না।” 


যুবক মিসোর কথায় একটু ভরসা পেল। গ্রামের সবাই তৈরি হয়ে ঘরের বাইরেই দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল। যুবক তাদের মিসোর সিদ্ধান্তের কথা জানাতে তারা সকলেই খুশি হল। তারা সমবেতভাবে মিসোকে ধন্যবাদ জানাতে এল। 

বিদায় সম্ভাষণ জানিয়ে গ্রামের প্রধান মিসোকে বললেন, “আপনাকে একা রেখে যেতে মন সায় দিচ্ছে না। কিন্তু আমরা নিরুপায়। প্রথা অনুযায়ী আমাদের কেউই আজ রাতে গ্রামে থাকতে পারবে না। নিজের খেয়াল আপনাকে নিজেকেই রাখতে হবে। কাল সকালেই আমরা ফিরে আসব। আপনি সাবধানে থাকবেন। আর মাঝরাতের পর কোনও অস্বাভাবিক ঘটনা দেখতেই পারেন। মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকবেন।” 


গ্রামবাসীরা রওনা হয়ে গেলে মিসো মৃতদেহের ঘরে গেলেন। 


মৃতদেহের সামনে কয়েকটি থালায় কিছু অর্ঘ্য সাজানো ছিল। আর সামনে জ্বলছিল বৌদ্ধ-ধাঁচের একটি সুদৃশ্য ছোটো লন্ঠন, যাকে জাপানি ভাষায় তাম-য়ো বলা হয়। আলো-আঁধারিতে ঘরটাকে কেমন রহস্যময় দেখাচ্ছে।  

আরও পড়ুন : সৎ মানুষের গল্প / ইতালো ক্যালভিনো / অনুবাদ : কৌশিক মজুমদার

মৃতদেহের সামনে বসে প্রথমে মিসো প্রথামাফিক অন্ত্যেষ্টি-মন্ত্র উচ্চারণ করলেন। 


জনহীন গ্রামে কোনও শব্দ নেই। থমথমে একটা নিস্তব্ধতা যেন ছোটো জনপদটির গলা টিপে ধরে আছে। মিসো অবশ্য কোনওরকম অস্বস্তি বোধ করছেন না। তিনি শান্ত মনে ধ্যানে বসলেন। 

 

ধ্যানমগ্ন অবস্থায় কতক্ষণ কেটে গেছে কে জানে, আচমকা একটা অজানা অস্বস্তি মিসোর ইন্দ্রিয়গুলোকে এক ঝটকায় সজাগ করে দিল। ঘরে কোনও দ্বিতীয় ব্যক্তির উপস্থিতি টের পাওয়া যাচ্ছে। মিসো চোখ মেলে তাকালেন। আপনা থেকেই চোখ চলে গেল মৃতদেহের দিকে। লন্ঠনের অল্প আলোয় যে দৃশ্য তাঁর চোখে পড়ল, সেটা যে কারও হৃদ্‌যন্ত্র বন্ধ করে দেবার পক্ষে যথেষ্ট।

 

মিসো দেখলেন, মৃতদেহের মাথার কাছে, মিসোর ঠিক উল্টোদিকে একটা কালো ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে আছে। মিসোর শ্বাস বন্ধ হয়ে এল, আর ঠিক সেই মুহূর্তে তিনি আবিষ্কার করলেন তিনি নড়াচড়া করতে পারছেন না। গলা দিয়ে কোনও শব্দও বেরোচ্ছে না তাঁর। 


ছায়ামূর্তি অবশ্য মিসোকে গুরুত্ব দিল না। সে ঝুঁকে পড়েছে মৃতদেহের ওপর। যেন ভালো করে গোটা দেহটা পরীক্ষা করছে। তারপর মিসোর চোখের সামনেই ছায়ামূর্তিটা এক হাতে মৃতদেহের চুল টেনে ধরে কচর-মচর শব্দে মৃতদেহটা খেতে শুরু করল। 


আতঙ্কে কাঠ হয়ে মিসো বসে থাকলেন। তাঁর কিছুই করার ক্ষমতা নেই। মস্তিষ্কও সেভাবে কাজ করছে না। 


পিশাচটা গোটা মৃতদেহটা আপাদমস্তক চিবিয়ে খেল। হাড়গোড়, চুল-নখ কিছুই বাদ দিল না। তারপর মৃতদেহের সামনে রাখা সমস্ত অর্ঘ্য খেল। খাওয়া শেষ করে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল ঘরের কোণে জমাট বাঁধা অন্ধকারের দিকে। অন্ধকারের গর্ভে মিলিয়ে গেল নিঃসাড়ে।    


পরদিন ভোরে, গ্রামবাসীরা ফিরে এসে মিসোকে সেই ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল। তাঁকে অক্ষত দেখে সবাই আশ্বস্ত হল। মিসো ততক্ষণে অনেকটা ধাতস্থ হয়েছেন। কিন্তু বিভ্রান্তি যায়নি তাঁর। সকলে তাঁকে অভিবাদন জানাল। ঘরে ঢুকে মৃতদেহের কোনও চিহ্ন না পেয়ে তারা কিন্তু বিন্দুমাত্র অবাক হল না। গ্রামের প্রধান মিসোকে বললেন, “আপনি নিশ্চয়ই রাতে অস্বস্তিকর কোনও দৃশ্য দেখেছেন। আমরা সকলেই আপনাকে নিয়ে চিন্তায় ছিলাম। যাক, আপনার যে কোনও ক্ষতি হয়নি সেটাই বড় কথা। আপত্তি না থাকলে, আপনি কি আমাদের বলবেন যে আপনি ঠিক কী দেখেছেন?” 

মিসো রাতের ভয়ঙ্কর ঘটনা সবিস্তারে বললেন। শুনে কেউই চমকাল না, বা বিচলিত হল না। যেন এটাই হবার ছিল। 

গৃহস্বামী যুবক, অর্থাৎ মৃত ব্যক্তির ভাইপো মিসোকে বলল, “আপনি যা যা বললেন, ঠিক সেরকমই আমরা শুনেছি আমাদের পূর্বপুরুষদের মুখে। আমাদের গ্রামে বংশপরম্পরায় এমনই চলে আসছে।” 


“একটা কথা জিজ্ঞেস করি,” মিসো বললেন, “পাহাড়ে যে পুরোহিত থাকেন তিনি কখনও আপনাদের গ্রামে মৃতদের অন্ত্যেষ্টিকাজ করেন না?” 


“কোন পুরোহিত?” যুবকের ভুরু কুঁচকে গেল। 


“পাহাড়ের ওপর যে পুরোহিত থাকেন,” মিসো বললেন, “এখান থেকে দক্ষিণে মাইল দুয়েক হাঁটলেই পাহাড়ের ওপর যাঁর আঞ্জিৎসু। তিনিই তো আমাকে এই গ্রামের সন্ধান দিলেন।” 


যুবক অবাক মুখে গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠদের দিকে তাকাল। তাঁরাও জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে একে অপরের দিকে তাকাচ্ছেন। গ্রামবাসীদের সকলেরই চোখে-মুখে বিস্ময়। 


গ্রামের প্রধান মিসোকে বললেন, “কিন্তু পাহাড়ে তো কোনও পুরোহিত নেই। কোনও আঞ্জিৎসু-ও নেই। বহু বছর ধরেই এই অঞ্চলে বা আশেপাশে কোনও আবাসিক পুরোহিত নেই।” 


এবার মিসোর চমকাবার পালা। তাঁর বয়েস হলেও এতটা ভীমরতি ধরেনি যে পুরো বিষয়টা কল্পনায় দেখবেন। আবার এটাও সত্যি যে, এরকম একটা মিথ্যে বলে এই মানুষগুলোর কোনও লাভ নেই। মিসো মুখে অবশ্য কিছু বললেন না। তবে গ্রামবাসীদের থেকে বিদায় নিয়ে তিনি ঠিক করলেন, একবার সেই আঞ্জিৎসুর সন্ধান করবেন। সত্যিই তাঁর এত বড় ভুল হল? নাকি পুরো ঘটনাটাই কোনও মায়াশক্তির প্রভাবে ঘটল? 

আরও পড়ুন : বন্ধ জানলা / অ্যামব্রোজ বিয়ার্স / অনুবাদ : মৃণালিনী ঘোষাল

 পাহাড়ের কোলে সেই ভাঙাচোরা কুঁড়েঘর খুঁজে পেতে মিসোর কোনও অসুবিধাই হল না। তবে? এই রহস্যময় বৃদ্ধ যাজক কি হঠাৎ উড়ে এসে জুড়ে বসা কেউ? কিন্তু আঞ্জিৎসু তো আর রাতারাতি আকাশ থেকে পড়বে না। অথচ গ্রামবাসীরা এই অঞ্চলে কোনও আঞ্জিৎসুর অস্তিত্বই স্বীকার করল না। 

 

 বিভ্রান্ত মিসো এগিয়ে গেলেন আঞ্জিৎসুর দিকে। আর এবার, তাঁকে খানিকটা অবাক করেই বৃদ্ধ যাজক তাঁকে ভিতরে স্বাগত জানালেন। 


 বৃদ্ধের আচরণ কিছুটা অসংলগ্ন। তিনি মিসোকে অভিবাদন জানিয়ে বারবার মাথা নেড়ে দুঃখের সঙ্গে বলতে লাগলেন, “আমি খুবই লজ্জিত! খুবই লজ্জিত!” 


“আমাকে আশ্রয় দিতে না পারার জন্য আপনি দয়া করে লজ্জিত হবেন না,” মিসো বললেন, “আপনিই তো আমাকে সামনের গ্রামের পথ বলে দিয়েছিলেন। সেখানে আমি চমৎকার আতিথেয়তা পেয়েছি। সেজন্য আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ।” 


“কোনও মানুষকে আশ্রয় দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়,” বৃদ্ধ সখেদে বললেন, “কিন্তু আমার লজ্জিত হবার কারণ সেটা না। আমি লজ্জিত কারণ আপনি আমাকে আমার আসল চেহারায় দেখেছেন।” 

 

 “মানে?” মিসো বুঝতে পারলেন না।


 বৃদ্ধ বিষণ্ণভাবে হাসলেন, “আমিই কাল রাতে আপনার চোখের সামনে মৃতদেহটা খেয়েছি।”


 মিসো সামান্য কেঁপে উঠলেন, “আপনি?”

 

 “আজ্ঞে হ্যাঁ,” বৃদ্ধ জবাব দিলেন, “আমি হচ্ছি জিকিনিঙ্কি। আমি মানুষের মৃতদেহ খাই। জ্যান্ত মানুষও খাই। মানে, আমাকে খেতে হয়।” 


 মিসো বৃদ্ধের চোখ থেকে চোখ সরালেন না। জাপানের বৌদ্ধ শাস্ত্রে যে নানা ধরনের পিশাচের কথা বলা আছে, তাদের মধ্যে সম্ভবত ভয়ঙ্করতম এই জিকিনিঙ্কি। হিন্দুশাস্ত্রগুলোয় যাকে প্রেত বলা হয়, জাপানে তারই নামান্তর ‘গাকি’ বা ‘জিকিনিঙ্কি’। অতিরিক্ত লোভী বা স্বার্থান্বেষী, অথবা পাপিষ্ঠ মানুষ মৃত্যুর পর অভিশাপগ্রস্ত হয়ে জিকিনিঙ্কিতে পরিণত হয়। এরা অতি হিংস্র, নরমাংসভোজী। মিসো বুঝতে পারছিলেন না, প্রেত তাঁকে আক্রমণ করবে কিনা। তবে আক্রমণ করলেও সুবিধা করতে পারবে না। কারণ তিনি পিশাচকে প্রতিহত করার মন্ত্র জানেন। 


 মিসোর মুখের ভাব বুঝতে পেরে বৃদ্ধ করুণ গলায় বললেন, “ভাববেন না। আপনার কোনও ক্ষতি আমি করব না। সে ক্ষমতাও আমার নেই। যদি থাকত, গত রাতে আপনি অক্ষত থাকতেন না। আপনার কাছে আমার একটা আর্জি আছে। আপনার কাছে আমার অপরাধভার স্বীকার করে আমি খানিকটা হালকা হতে চাই। কেন আমার এই পরিণতি, আপনাকে সমস্ত কথা খুলে বলতে চাই। আপনি দয়া করে অনুমতি দিন।” 


 “অবশ্যই,” মিসো বললেন, “আপনি বলুন।”


 বৃদ্ধ শুরু করলেন তাঁর অপরাধের আখ্যান, “বহু বহু বছর আগে, আমি এই অঞ্চলে পুরোহিত ছিলাম। বহু মাইল পর্যন্ত আর কোনও পুরোহিত ছিলেন না। তাই আমার এলাকায় কেউ মারা গেলে সে সময় মৃতদেহ এখানে বয়ে আনা হত। অনেকসময় অনেক দূর থেকেও মৃতদেহ নিয়ে আসত লোকজন। আমিই তাদের অন্ত্যেষ্টি করতাম। কিন্তু আমি ছিলাম লোভী। আমি এই অন্ত্যেষ্টিকাজকে একটা লাভজনক ব্যবসা ছাড়া আর কিছুই ভাবতাম না। মৃতের পরিজনদের থেকে বেশ চড়া পারিশ্রমিক আদায় করতাম। তাছাড়াও খাবার, কাপড় এসবও অনেক বেশি করে নিতাম। সেই পাপেই আমি মারা যাবার পরেই জিকিনিঙ্কি হয়ে গেলাম। সেই থেকে আমি এই অঞ্চলের সমস্ত মৃতদেহ খেয়ে আসছি। এখানকার সমস্ত মানুষের মৃতদেহ আমায় খেতে হবে। সেটাই আমার নিয়তি। আমি জানি না কবে এই অভিশাপ থেকে আমি মুক্তি পাব।” 

 

 এই পর্যন্ত বলে সামান্য বিরতি নিলেন বৃদ্ধ। তারপর সজল চোখে বললেন, “আপনি দয়া করে আমার জন্য একটা ‘সেগাকি’ (জাপানি ভাষায়, পিশাচ-অবস্থা থেকে উদ্ধারের জন্য প্রায়শ্চিত্ত অনুষ্ঠান) করুন, যাতে আমি তাড়াতাড়ি এই মর্মান্তিক অবস্থা থেকে মুক্তি পাই।” 


 এইটুকু বলেই বৃদ্ধ অদৃশ্য হয়ে গেলেন, আর সেই ভাঙাচোরা কুঁড়েঘরও সঙ্গে সঙ্গে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। মুসো নিজেকে আবিষ্কার করলেন খোলা আকাশের নিচে। তাঁর সামনে একটা বহু পুরনো শ্যাওলা-ধরা সমাধি-প্রস্তর, যেটাকে দেখে কোনও যাজকের সমাধি বলেই মনে হচ্ছিল।   


 

 (সম্পাদিত ও সংক্ষেপিত)   



[লেখক-পরিচিতি : লেখক-সাংবাদিক প্যাট্রিক লাফকাদিও হার্ন (১৮৫০-১৯০৪) জন্মসূত্রে ইউরোপীয় হলেও পরবর্তীকালে জাপানের নাগরিকত্ব নেন এবং নতুন নাম নেন কইজুমি ইয়াকুমো। আমেরিকায় বেশ কয়েক বছর কাজ করার পর তিনি ১৮৯০ সালে একটি সংবাদপত্রের প্রতিনিধি হিসেবে জাপান যান। তারপর জাপানি সংস্কৃতিকে ভালোবেসে বাকি জীবনটা পাকাপাকিভাবে সেখানেই থেকে যাবার সিদ্ধান্ত নেন। লেখক হিসেবে তাঁর পরিচিতি মূলত জাপানের মিথ ও লোককথা-ভিত্তিক ভৌতিক বা অলৌকিক কাহিনি রচনার জন্য। জাপানের মাতসু শহরে তাঁর নামাঙ্কিত ‘লাফকাদিও হার্ন মেমোরিয়াল মিউজিয়াম’ পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়]। 

...........................................

[ছবি : pinterest.com] 


#অনুবাদ #জাপান #zikininki # Lafcadio Hearn #corpse-eating spirit #human-eating ghosts #Japanese Buddhism #গল্প #ভূত #প্রেত #অলৌকিক #ভৌতিক গল্প #অলৌকিক গল্প #লোককথা #আহ্নিক বসু #সিলি পয়েন্ট

Leave a comment

All fields are required. Comment will appear after it is approved.

trending posts

newsletter

Connect With Us

today's visitors

52

Unique Visitors

121576