বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

জন মিশেল : যিনি প্রথম বলেছিলেন ব্ল্যাক হোলের কথা

অর্পণ পাল 27 days ago বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ৪৩

প্রায় আড়াইশো বছর আগের কথা। সাল ১৭৮৩। জন মিশেল নামে ইংল্যান্ডের এক ব্রিটিশ ভদ্রলোক চেষ্টা করছিলেন তারাদের ভর কীভাবে হিসেবপত্তর কষে বের করা যায় তা নিয়ে। তারও একশো বছর আগে আইজ্যাক নিউটন নামে আর এক ব্রিটিশ ভদ্রলোক বলেছিলেন যে আলো আসলে এক ধরনের অত্যন্ত ছোট্ট কণা দিয়ে তৈরি, যে কণার নাম তিনি দিয়েছিলেন ‘করপাসল’। এই ধারণাতেই আস্থা ছিল মিশেলেরও, তাই তিনি ধরে নিলেন যে কোনো তারার দেহ থেকে আলো অর্থাৎ এই কণার স্রোত বেরিয়ে আসে, তখন ওই কণাগুলিকে তারাটি পিছনের দিকে মহাকর্ষীয় আকর্ষণ বলে টেনে রাখে। অনেকটা পৃথিবী থেকে কোনো বলকে ওপরের দিকে ছুঁড়ে দিলে তার ওপর যেমন পৃথিবীর টানের জন্য তার বেগ কমে যেতে থাকে, সেইরকমই। এবার মিশেল ভাবলেন, যদি ওই কণার বেগ হ্রাসের পরিমাণ কোনোভাবে হিসেব কষে বের করা যায়, তবে হয়তো তারাটির ভর কত, সেটাও বের করে ফেলা যাবে।



কিন্তু কীভাবে সে হিসেব কষা যাবে? মিশেল ভেবে দেখলেন, ওই তারাটির বুকে কোনো বস্তুর মুক্তিবেগ কত, সেটা আগে জেনে নেওয়া দরকার। এখন ‘মুক্তিবেগ’ (বা Escape velocity) হল কোনো তারা বা গ্রহের ওপর থেকে একটা বস্তুকে যে বেগে ছুঁড়ে দেওয়া হলে সেই বস্তুটি ওই গ্রহ বা তারার মহাকর্ষীয় আকর্ষণ বল ছিন্ন করে চিরতরে বেরিয়ে যায়। আমাদের পৃথিবীর বেলা এই মুক্তিবেগের মান হিসেব করে দেখা গিয়েছে সেকেন্ডে ১১.২ কিলোমিটার। এই বেগের মান নির্ভর করে দুটো জিনিসের ওপর— ওই গ্রহ বা তারাটির ভর আর ওর ব্যাসার্ধ অর্থাৎ ওটা কত বড় বা ছোট। মিশেল এবার ভাবলেন, যদি কোনো তারার ভর এমন হয় যে ওর মুক্তিবেগের মান আলোর বেগের চেয়েও বেশি হয়ে গেল? তখন কী হবে? 
তাহলে তো নিউটন বর্ণিত আলোর ওই কণাদের আর তারাটির বুক থেকে মুক্তি পেয়ে হারিয়ে যাওয়াই হবে না কোনোদিন। এমনিতে ততদিনে আলোর বেগ বিজ্ঞানীদের জানা হয়ে গিয়েছে। সুতরাং মিশেল আলোর ওই বেগের মান নিয়ে কিছু হিসেবপত্তর করে দেখলেন যে কোনো তারার ভর যদি সূর্যের ভরের চেয়ে প্রায় পাঁচশো গুণ বেশি হয়, আর ঘনত্ব প্রায় সূর্যের ঘনত্বের সমান বলেই ধরে নেওয়া হয়, তবে ওই তারার মুক্তিবেগ আলোর বেগের চেয়ে বেশি হয়ে যাবে। আর তখনই ঘটবে সেই বিশেষ ব্যাপারটি— আলোর কণারা আর তারাটির আকর্ষণ বল কাটিয়ে বেরিয়ে আসতেই পারবে না। ওরা রয়ে যাবে তারাটির বুকেই। আর যেহেতু ওই তারার দেহ থেকে কোনো আলোই বাইরে আসতে পারবে না, তারাটি বাইরের জগতের কাছে রয়ে যাবে অদৃশ্য হয়ে! 

২/ 
ব্ল্যাক হোল কী, তা আমাদের প্রায় সকলেরই জানা এখন। অতি-ঘনত্ববিশিষ্ট এই মহাজাগতিক বস্তুর মহাকর্ষীয় আকর্ষণ বল কাটিয়ে বেরিয়ে যেতে পারে না এমনকি আলোও, যে কারণে এরা বাইরের জগতের দর্শকদের কাছে হয়ে থাকে অদৃশ্য। মাত্রই পঁয়তাল্লিশ বছর আগে নামকরণ হওয়া এই ধরনের বস্তুর কথা যদিও ইতিহাসের পাতায় আমরা দেখতে পাই এর অনেক কাল আগে থেকেই। সেই আঠেরো শতকেই জন মিশেল নামে এই ব্রিটিশ বিজ্ঞানী ব্ল্যাক হোলের ধারণা অন্তত খাতায়কলমে করে দেখাতে পেরেছিলেন। এবার তাঁর জীবনের কিছু-কিছু কথা বলব। 
জন মিশেল-এর জন্ম ১৭২৪ সালে, ইংল্যান্ডের নটিংহ্যাম শহরে। পড়াশুনো করেন কেমব্রিজে। শিখেছিলেন হিব্রু আর গ্রিক ভাষা, গণিত, ভূতত্ত্ব। পরে তিনি কেমব্রিজেরই কুইনস কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন। এখানে তিনি বেশ অনেকরকমেরই বিষয় পড়াতেন, যেমন জ্যামিতি, হিব্রু ভাষা, ধর্মতত্ত্ব বা গ্রিক ভাষাও। কেরিয়ারের শেষ দিকে পড়াতেন ভূতত্ত্বও। তবে শেষ অবধি অধ্যাপনা ছেড়ে দেন ১৭৬৩ সালে, তারপর বিয়ে করে সংসার শুরু করেন। 
জন মিশেল বহু বিষয়ে নিয়ে সারা জীবন নিজের মতো করে গবেষণা চালিয়ে গিয়েছেন, যার মধ্যে কয়েকটায় সফল হয়েছেন, কিছু ক্ষেত্রে আবার ভুল সিদ্ধান্তও প্রকাশ করেছেন। তবু সে আমলের পক্ষে তাঁর কাজ বেশ যুগান্তকারীই বলা উচিত। যেমন ১৭৫০ সালে প্রকাশিত একটি বইয়ে তিনি প্রথম বলেন যে চুম্বকের দুটো মেরুর মধ্যে ক্রিয়াশীল আকর্ষণ বা বিকর্ষণ বল বিপরীত বর্গের সূত্র মেনে চলে। অনেকটা দুটো চার্জ বা আধানের মধ্যে যেরকম আকর্ষণ বা বিকর্ষণ বল কাজ করে, সেইরকমই। ১৭৬০ সালে তিনি ব্রিটেনের রয়াল সোসাইটির সদস্য নির্বাচিত হন। আর ওই বছরেই তিনি বই আকারে লিখে শেষ করেন ভূমিকম্প নিয়ে তাঁর পাঁচ বছরের গবেষণার ফল। তিনি দেখিয়েছিলেন যে ১৭৫৫ সালে লিসবনে ঘটে যাওয়া ভূমিকম্পের কারণ ছিল আটলান্টিক সাগরের নিচে তৈরি হওয়া কিছু ভূত্বকজনিত আলোড়ন। আবার জ্যোতির্বিদ্যাতেও বেশ কিছু কাজ করেছিলেন, তাঁর বাড়ির বাগানে একটি দশ ফুট ফোকাস দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট টেলিস্কোপ লাগিয়েছিলেন, যেটা দিয়ে রাতের অনেকটা সময় কাটাতেন আকাশের দিকে চোখ রেখে। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর এই টেলিস্কোপটি কিনে নেন আর একজন বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ উইলিয়াম হারশেল। জন মিশেল আরও একটা ব্যাপারে অনেক চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু সফল হননি, তা হল পৃথিবীর ওজন পরিমাপ করা। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর ওই সংক্রান্ত যন্ত্রপাতি কিনে নেন তাঁরই বন্ধু শখের বিজ্ঞানী হেনরি ক্যাভেন্ডিশ, যিনি ১৭৯৭-৯৮ সালের দিকে এই পরীক্ষাই সফলভাবে করে পৃথিবীর ওজন এবং গড় ঘনত্ব বের করেন। 
এটাই স্বাভাবিক ছিল সেই আমলে। আজকের মতো বিশেষজ্ঞের জমানা তো ছিল না, তাই একই মানুষ যেমন খুব ভালো জ্যোতির্বিদ্যা জানতেন, তেমনই দক্ষ ছিলেন গণিতের নানা সমস্যার সমাধানে, আবার তিনিই হয়তো রসায়নাগারে বসে বানিয়ে ফেলতেন একাধিক নতুন যৌগ। তবে আজ আমাদের দুর্ভাগ্য, এই জন মিশেল-এর কোনো ছবি পর্যন্ত পাওয়া যায় না, তবে একটা বর্ণনা পাওয়া যায় তাঁর চেহারার— ছোটখাটো, গায়ের রঙ একটু চাপা, আর চেহারা একটু মোটামতো। 
জন মিশেল ব্ল্যাক হোলের নাম দিয়েছিলেন ‘ডার্ক স্টার’, কিন্তু তিনি কখনওই জেনে যেতে পারেননি, তাঁর মৃত্যুর এত বছর পর সেই ব্ল্যাক হোল খবরের শিরোনামে উঠে আসবে নিয়মিত। একেই বলে নিয়তি। 

৩/ 
তবে মিশেল ভুল করেছিলেন একটা জায়গায়। অবশ্য তাঁকে দোষও দেওয়া যায় না। তিনি কী করে জানবেন তাঁর মৃত্যুর দশ-পনেরো বছর পর আসবেন এক মহাপ্রতিভাধর বিজ্ঞানী, যিনি তাঁর আপেক্ষিকতাবাদের তত্ত্ব দিয়ে মহাবিশ্ব সম্বন্ধে নতুন নতুন সব বিষয় তুলে ধরবেন সকলের সামনে। হ্যাঁ, বিশ শতকের প্রথম দশকে আলবার্ট আইনস্টাইন তাঁর আপেক্ষিকতাবাদের বিশেষ তত্ত্বে জানালেন, আলোর বেগ মহাকর্ষীয় আকর্ষণের বাধা খুব একটা মানে না। সুতরাং আলোর কণাদের বেগ থেকে কোনো তারার ভর মাপবার তাঁর যে পদ্ধতি সেখানেই রয়ে গিয়েছিল ত্রুটি। আর মিশেলের এই অদৃশ্য তারার ব্যাপারটা সেই আমলে এতটাই অবাস্তব মনে হয়েছিল সকলের, যে কেউই এই তত্ত্বটিকে বিশেষ গুরুত্ব দেননি। যে কারণে তাঁর এই কথাগুলো অনেকগুলো বছর চাপাই পড়ে থাকে। 
অবশেষে ১৯১৬ সালে, অর্থাৎ মিশেলের মৃত্যুর একশো তেইশ বছর পর আলবার্ট আইনস্টাইনেরই আর এক যুগান্তকারী আবিষ্কার আপেক্ষিকতাবাদের সাধারণ তত্ত্ব থেকে আর একবার নতুন করে জেগে উঠল ব্ল্যাক হোল। জার্মান বিজ্ঞানী কার্ল শোয়ার্জচাইল্ড (Karl Schwarzchild, ১৮৭৩ – ১৯১৬ খ্রি) আইনস্টাইনের তত্ত্ব থেকেই হিসেব করে দেখালেন যে ব্ল্যাক হোলকে এমন এক ধরনের গোলক-আকার ঘনবস্তু হিসেবে ভাবা যেতে পারে, যাকে বাইরের জগত থেকে সম্পূর্ণ লুকিয়ে রাখা যায়। 
আরও পরে রবার্ট ওপেনহাইমার বললেন যে কোনো একটা ভারী তারা তার জীবদ্দশার শেষ ধাপে এসে এরকম ব্ল্যাক হোলে রূপান্তরিত হতে পারে। তবে ‘ব্ল্যাক হোল’— এই কথাটির প্রচলন করেন প্রিন্সটনের পদার্থবিজ্ঞানী জন হুইলার। এরপর ব্ল্যাক হোল নিয়ে আরও বহু কাজ হয়েছে, ইদানিং ব্ল্যাক হোলের ছবিও তোলা সম্ভব হয়েছে অত্যন্ত দক্ষ টেলিস্কোপের সাহায্যে, কিন্তু সেই যে আড়াইশো বছর আগে ব্রিটিশ ভদ্রলোকটি প্রথম ব্ল্যাক হোলের কথা মাথা খাটিয়ে বের করলেন, তাঁকে আমরা ভুলেই গিয়েছি। 
……………………… 

#John Michell #Blackhole #Science #silly point

Leave a comment

All fields are required. Comment will appear after it is approved.

trending posts

newsletter

Connect With Us

today's visitors

56

Unique Visitors

121579