ফিচার

কলকাতায় এসেছিলেন ক্যাপ্টেন হ্যাডক?

সায়নদীপ গুপ্ত 14 days ago ফিচার ৩৭

সদ্যই চলে গেল টিনটিনের জন্মদিন। ১৯২৯ সালের ১০ জানুয়ারি বেলজিয়ান দৈনিক ‘Le Petit Vingtieme’-এর হাত ধরে টিনটিনের প্রথম আবির্ভাব, তারপর থেকে নানান দেশ জুড়ে অসংখ্য পাঠকের মন জয়ের যাত্রা অব্যাহত। তবে বাঙালি পাঠক টিনটিন চিনেছে, তর্কযোগ্য ভাবেই, অ্যার্জের থেকেও বেশি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কলমে ভর করে। তিনি না থাকলে টিনটিনকে আমরা এত আপন করতে পারতাম কিনা, বলা মুশকিল। আর সিংহহৃদয় মেজাজি নাবিক আর্চিবল্ড হ্যাডক? রসিকমাত্রেই মানবেন, ক্যাপ্টেনের বুলি শুনে শেখা রকমারি গালাগালির মাধুর্য বন্ধুদের আড্ডায় শোনা চটুল খিস্তির চাইতে ঢের বেশি। বাঙালির সঙ্গে টিনটিন-বিশ্বের যোগ আরও নিবিড় হয়েছে যখন দেখা গেছে অ্যার্জে মূল ফরাসি রচনায় ‘ফ্লাইট ৭১৪’-তে প্রোফেসর ক্যালকুলাসের মুখে ‘চন্দননগর’ বসিয়েছেন। ফরাসি উপনিবেশের প্রভাব যে কদ্দুর, তা সহজেই বোধগম্য! অবশ্য আপাদমস্তক রাজনীতি-সচেতন অ্যার্জে কোনোদিনই টিনটিনকে ব্যক্তিগত বোধের প্রভাবমুক্ত রাখেননি, তা নিয়ে জলঘোলাও হয়েছে বিস্তর। আবার সেই বোধের হাত ধরেই টিনটিন ভারতের মাটিতে পা রেখেছে গল্পের খাতিরে। কিন্তু হ্যাডকও কি ঘুরে গেছেন এ কলকাতায়?

টিনটিনের প্রথম ভারত ভ্রমণ ‘ফারাওয়ের চুরুট’ গল্পে, গাইপাজামার মহারাজের প্রাণ সে যাত্রায় রক্ষা পেয়েছিল খুদে সাংবাদিকের বুদ্ধিতেই। ক্যাপ্টেনের ভারতে আগমন কিন্তু অনেক পরে, সেই ‘তিব্বতে টিনটিন’-এ চ্যাংকে খোঁজার অভিযানের সময়ে। সেবারেও দিল্লি ঘুরেই তিব্বত রওনা হয়েছিলেন তিনি। একমাত্র গেছোদাদার পথ না ধরলে তাদের পক্ষে কলকাতায় পা রাখা সম্ভব নয়। কিন্তু গল্পের সবকিছুকে যে গল্পেই সম্ভব হতে হবে, এমন মাথার দিব্যি কে কবে দিয়েছে? তাই আমরা বরং একবার চোখ বুলিয়ে নিই কলকাতার গোড়াপত্তনের ইতিহাসে। 

জোব চার্নক যখন সুতানুটিতে কোম্পানির ঝান্ডা পুঁতছেন, তখন তিনি নিজেও খুব একটা সুবিধাজনক অবস্থায় ছিলেন না। একে তো শায়েস্তা খাঁ-এর হাতে নাস্তানাবুদ হয়ে তবে ব্যবসার সনদ পেয়েছেন, তার উপর অনুমতি পেয়েছিলেন উলুবেড়িয়াতে বসতি স্থাপনের। কিন্তু তিনমাস সেখানে কাটিয়েও সেখানকার মশাদের সঙ্গে কোনও চুক্তি করে উঠতে পারেননি। পাটনা থেকে তাড়া খাওয়া, মাদ্রাজ থেকে বেরিয়ে আসা চার্নক তখন আক্ষরিক অর্থে জলেই অর্ধজীবন কাটিয়ে ফেলেছেন আর কী! গঙ্গার অন্যপারের সুতানুটিতেই তাঁর মন মজেছে, তাই কারও অনুমতির তোয়াক্কা না করে সেখানেই চালাঘর তুললেন। এই অবস্থায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মাদ্রাজ সদর থেকে সরেজমিন খতিয়ে দেখতে এলেন উইলিয়াম হিথ, সঙ্গে ১২০ জন সৈন্য এবং এক সফরসঙ্গী যিনি নিজের ভাইকে লেখা চিঠিতে পুরো যাত্রাপথের বিবরণ দিয়েছেন। সঙ্গীর নাম জোসেফ হ্যাডক। 

জোসেফ হ্যাডক যে বংশের সন্তান তা আগাগোড়া জাহাজি আবহে ঢাকা। এসেক্সের আদি বাসিন্দা হ্যাডকদের পারিবারিক চিঠিপত্রের তত্ত্বাবধায়ক শ্রীযুক্ত এডওয়ার্ড থমসন (মানিকজোড়!) জানাচ্ছেন, সেই চোদ্দ শতকে রাজা তৃতীয় এডওয়ার্ডের সময় থেকেই হ্যাডকেরা ব্রিটিশ নৌবহর অথবা বাণিজ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এমনকি জোসেফের চিঠির প্রাপক যে ভাই, সেই রিচার্ড হ্যাডক ব্রিটিশ-পর্তুগিজ যুদ্ধে নৌবাহিনির এক খ্যাতনামা সমরনায়ক। পাঠক মনে করুন ক্যাপ্টেন হ্যাডকের সেই কিংবদন্তী পূর্বপুরুষ স্যর ফ্রান্সিস হ্যাডকের কথা, জলদস্যুদের একা হাতে যিনি নিকেশ করেছিলেন। পর্তুগিজ অর্থাৎ ভাইকিং, ভাইকিং অর্থাৎ জলদস্যু – চরিত্র চিত্রণে অ্যার্জে নেহাত কম মাথা খাটাননি! এখানেই শেষ নয়; ফরাসি লেখায় স্যর ফ্রান্সিস সম্রাট ষোড়শ লুইয়ের বাহিনির সদস্য হলেও, ইংরেজি ভাষান্তরে তিনি দ্বিতীয় চার্লসের আজ্ঞাবহ ইউনিকর্ন জাহাজের ক্যাপ্টেন। বাস্তবে স্যর রিচার্ডও দ্বিতীয় চার্লসের নৌবহরের সদস্য, এবং তাঁর পিতামহ, আরেক রিচার্ড হ্যাডক, যে জাহাজের ক্যাপ্টেন ছিলেন তার নাম এইচএমএস ইউনিকর্ন! 

আরও পড়ুন : ক্যাপ্টেন হ্যাডকের হুইস্কি বদল / সায়নদীপ গুপ্ত

মজার কথা, এত গূঢ় সংযোগের ব্যাপারে সম্ভবত অ্যার্জের সুস্পষ্ট ধারণা ছিল না। নৌবাহিনির কর্মকাণ্ডে হ্যাডকদের সুপ্রাচীন উপস্থিতি সম্পর্কে তিনি যদি বা অবগত থাকেন, কমিক্স লেখার সময়ে তাঁদের বংশতালিকার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ তিনি জানতেন না বলেই অনুমান করা হয়। প্রখ্যাত টিনটিন বিশারদ এবং অ্যার্জের জীবনীকার মাইকেল ফার জানাচ্ছেন, এমন ঘটনা নিছকই সমাপতন। অ্যার্জের লেখা সর্বশেষ টিনটিন অভিযানে ক্যাপ্টেনের প্রকৃত নাম জানা যায় আর্চিবল্ড, মূল হ্যাডক বংশের তালিকায় এমন নাম পাওয়া যায় না। কিন্তু সবুর করুন, আসরে আসবেন আরেক চার্নক। ইনি জন চার্নক, প্রভাবশালী নাবিকদের জৈবনিক অভিধান ‘বায়োগ্রাফিয়া নাভালিস’-এর রচয়িতা। সেই বইয়ে জোসেফ হ্যাডক আছেন, ঠাকুর্দা রিচার্ড ও নাতি স্যর রিচার্ড হ্যাডক আছেন, আর আছেন রিচার্ডের ছেলে নিকোলাস হ্যাডক। তার ঠিক কিছু পরেই আছে আরেক নাবিকের নাম, আর্চিবল্ড হ্যামিলটন। 

সমাপতন, তবে আকারেপ্রকারে প্রায় মহাজাগতিক! 

অ্যার্জের দিলদরিয়া নাবিকের অনুপ্রেরণা যে বংশের ছত্রছায়ায়, তাদেরই এক সন্তান তদানীন্তন মাদ্রাজ, বালাসোর হয়ে, গঙ্গা বয়ে পা রেখেছিলেন কলকাতার আদিভূমিতে। যতই হন মেজাজি মাতাল, এরপরেও কি ক্যাপ্টেনকে না ভালোবেসে থাকা যায়? 

............... 

তথ্যসূত্র

১) Captain Haddock in Calcutta (or, the story that Hergé did not write but history did), Sujan Mukherjee

২) The adventures of Herge: Creator of Tintin, Michael Farr

#Captain Archibald Haddock #Tintin #Hergé

Leave a comment

All fields are required. Comment will appear after it is approved.

trending posts

newsletter

Connect With Us

today's visitors

6

Unique Visitors

128279