নিবন্ধ

শহুরে পচন, সাদাসিধে মফস্বল ও প্রান্তিক ভবঘুরে: শীর্ষেন্দুর ‘এক আশ্চর্য ফেরিওয়ালা’

বিপ্রনারায়ণ ভট্টাচার্য্য Aug 7, 2022 at 7:17 am নিবন্ধ ১৮৫

গত কয়েক দশক ধরে পূজাবার্ষিকী আনন্দমেলার পাতায় ছোটদের জন্য এক বিশেষ জগৎ তৈরি করছেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। তাঁর অদ্ভুতুড়ে সিরিজ আজ কালজয়ী। নিঃসন্দেহে বাংলা শিশু-কিশোর সাহিত্যের ইতিহাসে এক বিশেষ আসন এর জন্য বরাদ্দ থাকবে। ছিয়াশি বছর বয়সেও তিনি শিশু-কিশোর পাঠকদের জন্য পুজোয় টাটকা উপন্যাস লিখে চলেছেন, এ আমাদের পরম প্রাপ্তি। এবারের ‘আনন্দমেলা’ পূজাবার্ষিকীতে প্রকাশিত শীর্ষেন্দুর ‘এক আশ্চর্য ফেরিওয়ালা’ উপন্যাসের কিছু বিষয় নিয়েই এই আলোচনা।

প্রথমেই যা নজর কাড়ে তা হল বরাবরের মত মফস্বল বা গ্রামের পটভূমিকায় নয়, এই উপন্যাস শুরু হয়েছে খাস কলকাতার আধুনিক পরিমণ্ডলে। শহুরে আধুনিক যুবক জিম থেকে বেরোচ্ছে, তার নামখানাও পাশ্চাত্যসুলভ - শ্যাডো সেনগুপ্ত। নিউ মার্কেট থেকে এক রহস্যময় লোক তাকে বাইকে তুলে ফ্যান্সি লেনের এক রেস্তরাঁয় নিয়ে আসে। শীর্ষেন্দুর কিশোর কাহিনিতে শহুরে মানুষ সাধারণত সুবিধের লোক হয় না - অধিকাংশই ধান্দাবাজ ব্যবসায়ী অথবা খুনে গুণ্ডা। তারা মূল গল্পে খুব একটা জায়গা পায় না, কাহিনির আশেপাশে ঘোরাফেরা করে ছায়ার মতো - শেষ বোঝাপড়ার আগে তারা রঙ্গমঞ্চে সেভাবে আসে না বললেই চলে। তবে কিছু ব্যতিক্রম আছে, যেমন বনি বা বক্সার রতন। উল্লেখযোগ্যভাবে, এই গল্পে শহুরে আবু ও হরিশ শয়তান হলেও শ্যাডোর চরিত্র যথেষ্ট জটিল। চিরাচরিত ঈশ্বরপ্রীতি না থাকলেও তার নীতিবোধ যথেষ্ট প্রখর, অন্যায় কাজ করবার আগে তার বিবেক ভালোরকম প্রতিবাদ জানায়। শ্যাডো পরিস্থিতির শিকার। পড়াশোনায় আহামরি নয়, খেলাধুলো করলেও অসামান্য প্রতিভাবান নয়। চাকরি না পেয়ে অসুস্থ বাবার খরচ চালানোর জন্য তাকে গোলমেলে কাজে নামতে হয়। বর্তমান বাংলা তথা ভারতবর্ষে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ভয়ানক রকম বেড়ে চলেছে। মানুষকে আধুনিকতার নামে শহুরে জীবনযাপনে অভ্যস্ত করে তাকে নির্বিঘ্নে আনন্দে বাঁচবার সুযোগ দেয় না যে রাষ্ট্র, সে বিশ্বাসঘাতক ছাড়া আর কী? শীর্ষেন্দুর কিশোর কাহিনিতে আধুনিকতার প্রতি বীতশ্রদ্ধা প্রকাশ পায় সাধারণত গ্রামীণ পটভূমির মাধ্যমে। এই উপন্যাসে কিন্তু তিনি শহুরে পচনের আরো গভীরে প্রবেশ করেছেন। শ্যাডোর বাবার অসুস্থতার প্রসঙ্গে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার আকাশছোঁয়া খরচের কথা এসেছে, যা গত দু-বছর কোভিড পরিস্থিতিতে বারবার আলোচনায় উঠে এসেছিল। শ্যাডো সেই শত-শত শিক্ষিত বেকারের প্রতীক যারা পাশ করে আমাদের আশেপাশেই কোনো একটা কাজের সন্ধানে ঘুরে বেড়ায়, কিন্তু ছায়ার মত তাদের আমরা দেখেও দেখি না, নিজেদের সুখস্বাচ্ছন্দ্যে মজে থাকি। 

এরপর গল্প চেনা বাঁক নেয়, আমরা চলে আসি অতিপরিচিত মফস্বল এলাকায়। সরল বৈজ্ঞানিক, অবসরপ্রাপ্ত পুলিশকর্তা, দজ্জাল গিন্নি, ধান্দাবাজ কাজের লোক, মিচকে চোর প্রভৃতি চেনা চরিত্ররা এসে উঁকি দিয়ে যায়। আর আসে এক বিচিত্র ফেরিওয়ালা, যে বিভিন্ন ডাইমেনশনে ভ্রমণ করে বেড়ায়। ইউরোপীয় সাহিত্যের ইতিহাসে এই ভবঘুরে বা flaneur চরিত্র এসেছে বিভিন্ন সময়ে, যেমন প্রাচীন অ্যাংলো স্যাক্সন কাব্য ‘দ্য ওয়ান্ডারার’ বা টমাস ন্যাশ রচিত ষোড়শ শতাব্দীর ইংরেজি গদ্য ‘দ্য আনফরচুনেট ট্র্যাভেলার’। কিন্তু flaneur চরিত্রটি ইংরেজি সাহিত্যে একটি বিশেষ ধারাবাহিকতা লাভ করে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষদিক থেকে, যেখানে নাগরিক জীবনের বৈভব ও সমৃদ্ধির মাঝে এক ভবঘুরে রাতের অন্ধকারে, জনসমক্ষের আড়ালে আবডালে আপাত উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়িয়ে সেই শহরের এক নৃশংস, অন্ধকার রূপ আবিষ্কার করে। এ ধরনের চরিত্র আমরা সেই রোমান্টিক যুগের প্রাক্কালেই দেখি উইলিয়াম ব্লেকের ‘লন্ডন' কবিতায় :

I wander thro' each charter'd street,

Near where the charter'd Thames does flow.

And mark in every face I meet

Marks of weakness, marks of woe.

রবার্ট লুই স্টিভেনসনের ‘দ্য স্ট্রেঞ্জ কেস অফ ডঃ জেকিল অ্যান্ড মিঃ হাইড’ গল্পে রাতের লন্ডনে ইতস্তত ঘুরে বেড়ানো মিঃ আটারসন, জেমস টমসনের ‘দ্য সিটি অফ ড্রেডফুল নাইট’ কবিতার কবি, পরবর্তীকালে আধুনিক কবি টি এস এলিয়টের ‘দ্য লাভ সং অফ জে অ্যালফ্রেড প্রুফ্রক’ এমনকি স্যর আর্থার কোনান ডয়েলের গল্পে রাতের আঁধারে ঘুরে বেড়ানো শার্লক হোমসও কোথাও না কোথাও এই flaneur চরিত্রের ধাঁচে পড়ে যায়। হেমেন্দ্রকুমার রায়ের ‘কলকাতার রাত্রি রহস্য’ এমন এক মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকেই লেখা।  Flaneur চরিত্রের অবস্থান বরাবরই প্রান্তিক, প্রচলিত ক্ষমতাবৃত্তের বাইরে তার বিচরণ। তাই সমাজব্যবস্থার অপ্রিয় লুকনো সত্যিগুলো চট করে তার চোখে পড়ে যায়। শীর্ষেন্দুর অদ্ভুতুড়ে সিরিজের কাহিনিতে বরাবর তথাকথিত ক্ষমতাহীন, দুর্বল মানুষেরা প্রাধান্য পায়, তাই flaneur চরিত্রের আকর্ষণীয় উপস্থিতি তাঁর লেখায় খেয়াল করার মতো। এই ভবঘুরেদের দল আপাতভাবে হতচ্ছাড়া, সাদাসিধে, ক্ষমতাহীন হলেও অসীম শক্তিধর, অলৌকিক বলে বলীয়ান। সাদাসিধে, ছন্নছাড়া, কখনও রীতিমত দরিদ্র জীবনযাপনে অভ্যস্ত এই চরিত্ররা অনেকটা গুপি-বাঘার মতো মার্কিন সুপারহিরোর এক বিকল্প সম্ভাবনা হাজির করে - অতিমানবিক শক্তি থাকলেও এরা একদম ছাপোষা, ঝাঁ চকচকে ঝলকানির লেশমাত্র এদের মধ্যে নেই, এবং শেষ মুহূর্ত অবধি এরা চেষ্টা করে হিংসার পথ এড়িয়ে চলবার। ‘গজাননের কৌটো’ গল্পের গজানন, ‘ছায়াময়’ গল্পে কেন্দ্রীয় চরিত্র, ‘নবাবগঞ্জের আগন্তুক’ গল্পের জ্ঞানপাগলা, এমনকি ‘ভুতুড়ে ঘড়ি’ এবং ‘আশুবাবুর টেলিস্কোপ’ গল্পের রামরাহা প্রত্যেকে কোনো না কোনোভাবে এই ধাঁচে পড়ে। ‘এক আশ্চর্য ফেরিওয়ালা’ গল্পের কালীচরণ, যার আরেক নাম জাবালি, এই ধরনেরই এক flaneur, যে এক ডাইমেনশন থেকে অন্য ডাইমেনশনে অবিরাম ঘুরে বেড়ায়। সে উলোঝুলো পোশাক পড়ে, ঝুপড়ির মত এক জায়গায় থাকে, তার বাসস্থান জনবসতির একেবারে প্রান্তে, ঝোপজঙ্গলের মধ্যে। সে অর্থ বা ক্ষমতা কিছুই চায় না। তার একমাত্র কাজ বিভিন্ন বিজাতীয় জিনিস মানুষকে দিয়ে তাদের সাহায্যের চেষ্টা করা। মার্কিন কল্পবিজ্ঞানের হিংস্র এলিয়েনের চেনা ছক ভেঙে সত্যজিৎ রায় ‘মহাকাশের দূত’, ‘প্রোফেসর শঙ্কু ও ইউ এফ ও’, ‘বঙ্কুবাবুর বন্ধু’ বা ‘অঙ্ক স্যর, গোলাপীবাবু আর টিপু’ গল্পে বন্ধুভাবাপন্ন অন্যগ্রহের প্রাণী দেখিয়ে বুঝিয়েছিলেন যে অপর মানেই শত্রু নয়। লীলা মজুমদারের ‘লিম্বো সাহেবের বাড়ি’ প্রভৃতি গল্পে একই জিনিস পাই। শীর্ষেন্দুর কাহিনি এই রীতি এর আগেও অনুসরণ করেছে ‘হরবাবুর অভিজ্ঞতা’ বা ‘লোকটা’-র মতো কল্পবিজ্ঞানমূলক গল্পে। ‘এক আশ্চর্য ফেরিওয়ালা’ সেই চেনা ব্যাকরণেই পুনরাবৃত্তি বলা চলে। তবে শ্যাডো সেনগুপ্তর চরিত্রায়ন ও তার মনোভাবের পরিবর্তন অবশ্যই শীর্ষেন্দুর অদ্ভুতুড়ে পৃথিবীতে নতুন সংযোজন। শ্যাডোর কাহিনিবৃত্তের বাস্তবধর্মী আবহের সঙ্গে গল্পের বাকি অংশের অদ্ভুতুড়ে ধাঁচ ঠিকঠাক খাপ খেয়েছে কিনা, এ নিয়ে অবশ্য প্রশ্ন উঠতে পারে। মাঝেমধ্যে মনে হয়েছে লেখক যেন একটু দ্বিধাগ্রস্ত, ঠিক কী ধরনের ভাষ্য তৈরি করতে চাইছেন বা কোন ধরনের পাঠককে লক্ষ্য করে লিখছেন সে বিষয়ে নিজেই ঠিক নিশ্চিত নন। কখনও কখনও এমনও মনে হয়েছে যে হার্ড-বয়েলড থ্রিলার আর শিশুপাঠ্য কমিক আবহের মাঝে এ কাহিনি দোদুল্যমান। কিন্তু এই বয়সে এসেও তিনি লেখায় নতুন উপাদান যোগ করবার চেষ্টা করছেন, এটাই বা কম কীসের?   

#সিলি পয়েন্ট # শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় # শিশু সাহিত্য # বিপ্রনারায়ণ ভট্টাচার্য্য # আনন্দমেলা # আশ্চর্য ফেরিওয়ালা #Shirshendu Mukhopadhyay # Bipranarayan Bhattacharya # silly point # web portal

Leave a comment

All fields are required. Comment will appear after it is approved.

trending posts

newsletter

Connect With Us

today's visitors

55

Unique Visitors

121579