ফিল্ম/ওয়েব সিরিজ রিভিউ

রকেট্রি: সেলুলয়েডে রকেট ওড়ার এক রূপকথা অথবা বিতর্কের ইতিবৃত্ত

অর্পণ পাল Aug 30, 2022 at 6:49 am ফিল্ম/ওয়েব সিরিজ রিভিউ ২৯

এখন থেকে আঠাশ বছর আগের কথা৷ সাল ১৯৯৪, তারিখ অক্টোবরের কুড়ি। দক্ষিণ ভারতের  কেরালা রাজ্যে মরিয়াম রশিদা নামে মালদিভের মহিলাকে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করতে করতে ক্রমশ বেরিয়ে আসতে থাকে বিরাট বড় এক ষড়যন্ত্রের খবর৷ ওই মহিলাকে গ্রেপ্তার করা হয়, এবং তার থেকে পাওয়া খবর আর নথিপত্রের সূত্রে পরের মাসে ত্রিবান্দ্রমের বাড়ি থেকে জিজ্ঞাসাবাদের নামে তুলে আনা হয় ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থার তিপ্পান্ন বছর বয়সী এক উচ্চপদস্থ বিজ্ঞানীকে। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হল, তিনি নাকি ভারতের এক রকেট নির্মাণ প্রোজেক্টের গোপন ফরমুলা বা ডিজাইন বিক্রি করে দিয়েছেন দুই মালদিভবাসীর কাছে, এবং তারপর সেই ডিজাইন পাচার হয়ে গিয়েছে পাকিস্তানে। দেশদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত হতে আর কী লাগে!

 ব্যস, কয়েক ঘন্টার মধ্যে দেশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল বিজ্ঞানীর গ্রেপ্তারের খবর, আর শুরু হল তাঁর বিরুদ্ধে আন্দোলন, তাঁকে নানাভাবে কাদা-ছোঁড়ার পালা। আর কেরালা পুলিশ থেকে তদন্তের ভার তুলে দেওয়া হল সিবিআইয়ের হাতে। 

একটানা এগারো দিন তিনি থাকলেন বিচার-বিভাগীয় হেফাজতে৷ একাধিক ধারায় তাঁর বিরুদ্ধে মামলা শুরু হল, যার মধ্যে ছিল দুর্নীতি, তথ্য পাচার বা দেশের সঙ্গে শত্রুতার মতো কড়া অভিযোগ। সব মিলিয়ে বিজ্ঞানীর খ্যাতি বা সামাজিক মর্যাদা তখন পুরোপুরি মাটিতে মিশে গিয়েছে। শুধু তাই না, পুলিশ হেফাজতে তাঁর ওপর বেশ শারীরিক নির্যাতনও করা হয়। তাঁকে বিছানায় বেঁধে একটানা তিরিশ ঘন্টা ধরে জেরাও চলে। 

ওঁদের সঙ্গে তদন্ত চলাকালীন জড়িয়ে পড়ে তৎকালীন কেরালার খোদ মুখ্যমন্ত্রী এবং আরও বেশ কয়েকজন উঁচু স্তরের অফিসিয়ালও। দেশ জুড়ে প্রবল আলোড়ন শুরু হয়। 

বিজ্ঞানীটি জামিন পেলেন প্রায় দু-মাস পর। কিন্তু এর পরে ঘটতে থাকল আরও আশ্চর্য সব ঘটনা। আঠেরো মাস ধরে তদন্ত করে সিবিআই শতাধিক পৃষ্ঠার যে রিপোর্ট তৈরি করল তাতে পরিষ্কার বলা হল, এই পুরো বিষয়টাই সাজানো। বা ষড়যন্ত্র। নকল নথিপত্র তৈরি করে কয়েকজনকে ফাঁসানোর মূল উদ্দেশ্য নিয়েই নাকি সাজানো হয়েছিল এই পুরো ঘটনাটা। 

মাস কয়েক পরে কেরালা সরকারের তরফে নতুন করে আবার তদন্ত করা হয়, তবে এবারে ওই বিজ্ঞানী নিজেই পালটা মামলা করেন তাঁর সম্মানহানি হয়েছে এই অভিযোগে। এই মামলা চলতে থাকে বেশ কয়েক বছর, অবশেষে ২০১২ সালে কেরালার হাই কোর্ট সরকারকে নির্দেশ দেয়, ওই বিজ্ঞানীকে দশ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য। এরপরে সুপ্রিম কোর্টও তাঁকে আরও পঞ্চাশ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে বলে। 

তবে এই পুরো ঘটনায় একটা ব্যাপার পরিষ্কার, ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরোর নাম কলঙ্কলিপ্ত করতে, এবং পিএসএলভি রকেট উৎক্ষেপণকে বাধা দিতে কিছু বিদেশী শক্তি, দেশের উচ্চপদস্থ  কয়েকজন আমলা এবং সরকারি কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে এই কাণ্ডটি ঘটাতে চেয়েছিল। 

এই পুরো ব্যাপারটি নিয়ে বছর খানেক আগে আবার নতুন করে তদন্ত শুরু হয়েছে এর পিছনে আসলে কাদের হাত ছিল তা জানবার জন্য; আর এরই মধ্যে ওই বিজ্ঞানীর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই পুরো বিষয়টাই সদ্য উঠে এল এক সিনেমার আকারে। 'রকেট্রি: দ্য নাম্বি স্টোরি' নামে সিনেমাটি হলে মুক্তি পাওয়ার পর এখন ওটিটি প্ল্যাটফর্মে দেখা যাচ্ছে। 

ইসরো-র জ্বালানি ক্রায়োজেনিকস বিভাগের প্রধান ওই বিজ্ঞানী নাম্বি নারায়ণন এই সিনেমার মুখ্য চরিত্র। মেধাবী নাম্বি ছোট থেকেই পড়াশুনোয় ছিলেন দারুণ, আর তখন থেকেই ভেবে রেখেছিলেন আকাশে উড়তে হবে একদিন। যে কারণে অন্য চাকরি পেলেও সেটা ছেড়ে দিয়ে তিনি ঢোকেন ইসরোতে। সেখানে একটা স্কলারশিপ জিতে বছরখানেকের জন্য চলে যান আমেরিকার প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে, রকেটের জ্বালানি ব্যবস্থা নিয়ে পড়াশুনোর জন্য। 

 সে সময় ইসরোর সর্বোচ্চ স্তরে আছেন স্বয়ং বিক্রম সারাভাই, আর সতীশ ধাওয়ান। এখানে নাম্বি সহকর্মী হিসেবে পেয়েছিলেন মহাকাশবিজ্ঞানী আর পরবর্তীকালে ভারতের রাষ্ট্রপতি আব্দুল কালামকেও। 

এসব এমন এক সময়ের কথা যখন ভারতের নিজস্ব রকেট তৈরির পরিকাঠামো পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। আমেরিকা বা ফ্রান্সের রকেট কিনে নিজেদের যন্ত্রপাতি তাতে জুড়ে মহাকাশে পাঠানো হত। ওই সময়ে নাম্বি চেষ্টা করে গিয়েছিলেন কীভাবে এ দেশেই তৈরি হতে পারে রকেট, যা ভারতের তরল জ্বালানি নির্ভর রকেট-পরিকাঠামোকে অনেকটাই এগিয়ে দিয়েছিল। 

এই সিনেমাটি দিয়েই মাধবন পরিচালক হিসেবে যাত্রা শুরু করলেন। নাম্বির চরিত্রেও তিনি। সিনেমায় নাম্বির বিভিন্ন বয়সের লুক মেক আপ আর প্রস্থেটিকের সাহায্যে এমনভাবে তৈরি করেছেন তিনি, দেখলে বোঝবার কিছুমাত্র উপায় নেই আসল নাম্বির সঙ্গে তাঁর ফারাক। সেই সঙ্গে বিভিন্ন বয়সোচিত চেহারা তৈরি করতে ওজন কমিয়ে বাড়িয়ে নিজেকে যেভাবে সাজিয়েছেন, তাতে কোনো কুর্নিশ যথেষ্ট নয়। আর অভিনয়েও তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন কেন তাঁকে সিরিয়াস অ্যাক্টর হিসেবে বিশেষ সম্মান দেওয়া হয়। বারো বছরের বেশি আগের থ্রি ইডিয়টস নামে সেই বিখ্যাত সিনেমায় তাঁর অভিনয় যাঁরা দেখেছেন, তাঁরা অবশ্যই জানবেন, মাধবন নিজের লুক আর অভিনয়ে বয়সের ছাপ পড়াকে কীভাবে লুকিয়ে ফেলতে জানেন। নাম্বি চরিত্রের অল্পবয়সী রূপটিতেও মাধবনকে দেখলে কেউ বলবেই না যে তিনি এখন বাহান্ন। 

সিনেমার শুরু থেকে শেষ অবধি মাধবনই। গল্প শুরু হয়েছে নাম্বির অ্যারেস্ট দেখিয়ে। তারপর ফ্ল্যাশব্যাকে তাঁর ইসরো পর্ব। বিদেশগমন, গবেষণা, দেশে ফেরা, রকেট নির্মাণে হাত লাগানো, এবং তারপর আস্তে আস্তে এক ষড়যন্ত্রে জড়িয়ে পড়া। 

মাধবন এই সিনেমার জন্য নিজেকে যেভাবে তৈরি করেছেন গত প্রায় সাত আট বছর ধরে, তা অবিশ্বাস্য। আর সিনেমাটি দর্শক এবং সমালোচকদের প্রশংসাও পেয়েছে যথেষ্ঠ। যদিও ইসরোর কয়েকজন অফিসিয়াল সম্প্রতি দাবী করেছেন নাম্বিকে এই সিনেমায় অতিরিক্ত মহান করে তোলবার চেষ্টা করা হয়েছে। তাঁদের দাবীকে মান্যতা দিয়েও এটা বলা উচিত যে বায়োপিক সিনেমায় নাটকীয় মূহুর্ত আর জমজমাট ব্যাপারটা আনতে গেলে সেই মানুষটিকে একটু অতিরঞ্জিত করে দেখাতেই হয়। অবশ্য প্রকৃত ঘটনার গতিধারাকে ক্ষুণ্ণ করাটাও কাম্য নয় মোটেই। 

নাম্বি নারায়ণন এখন আশি ছাড়িয়েছেন, সাদা গোঁফ দাড়িতে ঢাকা সৌম্য প্রশান্ত এই ভদ্রলোক ইসরো থেকে অবসরের পর (ওই পুলিশ কেস মিটে যাওয়ার পর তিনি ইসরোর চাকরি আবার ফিরে পেয়েছিলেন) এখন থাকেন তামিলনাড়ুর ত্রিবাঙ্কোরে। এক ছেলে আর এক মেয়ে তাঁর। জামাইও ইসরোর বিজ্ঞানী, জড়িয়ে আছেন মঙ্গল অভিযানের সঙ্গে। 

    ২০১৯ সালে নাম্বি ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান পদ্মভূষণ পেয়েছেন। জীবনকালে যতই বিতর্কে জড়িয়ে পড়ুন, তাঁর অবদানকে কোনোভাবেই অস্বীকার করা চলে না। তাঁর দীর্ঘ জীবন অবশ্যই কামনা করি আমরা। আর সিনেমাটি এখন অ্যামাজন প্রাইমে দেখা যাচ্ছে, ভারতের মহাকাশ-কর্মকাণ্ডের একটা যুগের ইতিবৃত্ত জানতে 'রকেট্রি দ্য নাম্বি এফেক্ট' অবশ্যই সকলে দেখতে পারেন। 


 ............ 

#Rocketry: The Nambi Effect # R. Madhavan #Nambi Narayanan #Indian Space Research Organisation #silly পয়েন্ট

Leave a comment

All fields are required. Comment will appear after it is approved.

trending posts

newsletter

Connect With Us

today's visitors

50

Unique Visitors

121575