নিবন্ধ

ম্যাজিকাল মিস্ট্রি: পটার-দুনিয়ার ক্রাইম ডায়রি

সৃজিতা সান্যাল July 31, 2022 at 9:43 am নিবন্ধ ৮৮

‘বিশ্বাসঘাতক’-এর প্রকাশককে নারায়ণ সান্যাল জানিয়েছিলেন গ্রন্থাগারিক কোন আলমারিতে বইটিকে স্থান দেন, তা জানার জন্য তিনি নিজেই নাকি কৌতূহলী। প্রটাগনিস্টের আবেগময় প্রেমের আখ্যানকে বিজ্ঞানবিষয়ক বই বলে চালালে বিজ্ঞানপ্রেমীদের উপহাসের পাত্র হতে হয়। এদিকে যদি উপন্যাস বলা হয়, তবে একদল সমালোচক ভুরু কুঁচকোতেই পারেন, কারণ উপন্যাসে ছবি এবং ফিজিক্সের তত্ত্বসমেত চেইন রিয়াকশনের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা থাকে বেশ কয়েক পাতাজুড়ে (পাতা বাদ না দেওয়ার সনির্বন্ধ উপরোধ সমেত) – এমন অদ্ভুত কথা কে কবেই বা শুনেছে!

আসলে যে কোনও টেক্সটকে সুনির্দিষ্ট সংরূপের নামে নামাঙ্কিত করতে চাওয়ার কিছু সমস্যাজনক দিক আছে। বহু তথাকথিত ‘গল্প’ কবিতা’ ‘উপন্যাস’ ‘আখ্যান’-কেই কোনও একক মনোলিথিক সংজ্ঞার আওতায় ফেলা যায় না। এবং লেখক সচেতনভাবে বিচিত্র ঘরানার যে ‘জগাখিচুড়ি’টি তৈরি করেন তা অনেকক্ষেত্রেই সেই টেক্সটের দুর্বলতার বদলে হয়ে ওঠে তার শক্তির জায়গা। হয়ে ওঠে পাঠকের দরবারে প্রবল জনপ্রিয়তা পাওয়ার অন্যতম চাবিকাঠি। আজকের দুনিয়াজুড়ে কিশোরসাহিত্য হিসেবে কিংবদন্তী হয়ে-ওঠা হ্যারি পটার সিরিজের ক্ষেত্রেও ঠিক এই কথাগুলো প্রযোজ্য। 

এই যে এইমাত্র ‘কিশোরসাহিত্য’ হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া হল হ্যারি পটার সিরিজের উপন্যাসগুলিকে, এর মধ্যেও কিন্তু রয়ে গেছে সেই চিহ্নিতকরণের প্রবণতা। যে প্রবণতা থেকে অনেকেই ‘ফ্যান্টাসি’ নভেলের আওতায় ফেলতে চান হ্যারির অ্যাডভেঞ্চারকে। কিন্তু হ্যারি পটার শুধুই কি ফ্যান্টাসি? রোলিংয়ের জাদু দুনিয়ায় বাস্তবের আলোআঁধারির এত বেশি আনাগোনা যে রূপকথার খোপে তাকে এঁটে দিলে অতিসরলীকরণ হয়ে যায়। প্রায় ‘মহাকাব্যিক’ ব্যাপ্তিকে ছুঁতে চাওয়া এই উপন্যাস-সিরিজে  অ্যাডভেঞ্চার, হরর, ইয়ং এডাল্‌ট ফিকশন থেকে শুরু করে একাধিক সংরূপের নির্যাস মিলেমিশে রয়েছে আর অবশ্যই রয়েছে রহস্য ও গোয়েন্দাগল্পের বেশ কিছু উপাদান। 

ক্রাইম থ্রিলার, মিস্ট্রি বা ডিটেকটিভ গল্প বা উপন্যাসের কাঠামোয় প্রায় সর্বদাই কেন্দ্রীয় সমস্যা হিসেবে উঠে আসে এক বা একাধিক রহস্যজনক ঘটনা বা অপরাধের বৃত্তান্ত। তাকে ঘিরে ‘কে করল’, ‘কী উদ্দেশ্যে করল’ –- এই জাতীয় একাধিক প্রশ্ন ঘরাফেরা করে পাঠকের মনে। সেই প্রশ্নগুলোর উত্তরই পাঠক খুঁজে চলে গোটা গল্প/উপন্যাস জুড়ে। হ্যারি পটার সিরিজে আলাদা আলাদা করে প্রতিটি খণ্ডে এক বা একাধিক রহস্যের জালে জড়িয়ে পড়েছে হ্যারি-রন-হারমাইওনিরা। আর সেসব রহস্যের জাল খুলেছে উপন্যাসের শেষদিকে এসে। ছোট ছোট রহস্যের সঙ্গে রয়েছে গোটা সিরিজ-ব্যাপী বিস্তৃত একাধিক বড়ো রহস্য। খুব দক্ষতার সঙ্গে সাতটি খণ্ড জুড়ে একাধিক রহস্য বুনে চলা ও তাদের জাল উন্মোচন করা কিন্তু নিতান্ত সহজ কথা নয়! সেই দুঃসাধ্য কাজটিই রোলিং করে দেখিয়েছেন। যেমন, প্রথম খণ্ডে রহস্য দানা বাঁধে ফিলজফার্স স্টোনকে কেন্দ্র করে। গ্রিনগটস  থেকে হগওয়ার্টসে কী এনে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তাবলয়ের মধ্যে লুকিয়ে রাখা হয়েছে, কেনই বা তা অমূল্য, কে তা চুরি করার চেষ্টা করছে, কেনই বা হ্যারির মাথার ক্ষতচিহ্নে এতদিন পর যন্ত্রণা হচ্ছে – এইসব রহস্যের সমাধান করতে গিয়েই শেষপর্যন্ত ভলডেমর্টের মুখোমুখি হয় অতি-কৌতূহলী হ্যারি। দেখা যায়, তার দুই বন্ধুও রহস্য উন্মোচনে যথেষ্ট তৎপর। দ্বিতীয় খণ্ডে রহস্যের কেন্দ্রবিন্দু চেম্বার অফ সিক্রেটস। মিথ হয়ে যাওয়া ‘চেম্বার অফ সিক্রেটস’-এর অস্তিত্ব কি সত্যিই আছে? থাকলে এতদিন পর কে তা খুলতে চাইছে? ‘Heir of Slytherin’ আদতে কে? হগওয়ার্টসের বাসিন্দাদের ওপর একের পর এক আক্রমণ আর রক্ত দিয়ে দেওয়ালে হুমকি-বার্তা লেখার জন্য দায়ী কে বা কারা? এই প্রশ্নগুলি নিয়ে রহস্য ঘনীভূত হয়। ‘প্রিজনার অফ আজকাবানে’ ছায়া ফেলে হ্যারির অতীত। জাদুদুনিয়ার কারাগার থেকে পালানো অপরাধী সিরিয়াস ব্ল্যাককে খুঁজে বের করতে গিয়েই নতুন রহস্যের সম্মুখীন হয় হ্যারি ও তার বন্ধুরা। ‘গবলেট অফ ফায়ার’-এ কে কীভাবে এবং কেন ট্রাইউইজার্ড টুর্নামেন্টের গবলেটে নাবালক হ্যারির নাম ঢুকিয়ে দিল – এই প্রশ্নকে ঘিরেই আবর্তিত হয় গোটা উপন্যাস। ‘হাফ ব্লাড প্রিন্স’-থেকেই হরক্রাক্স রহস্যের সূত্রপাত। সঙ্গে ‘হাফ ব্লাড প্রিন্স’-এর পরিচয় উদ্ঘাটনের রহস্য। শেষ খণ্ডে ভলডেমর্টের হরক্রাক্সগুলি খুঁজে বের করাই হয়ে দাঁড়ায় গোল্ডেন ট্রিও-র অন্যতম চ্যালেঞ্জ।

অপরাধের কী ও কেন  

ফিফথ ইয়ারে ম্যাড-আই-মুডির ক্লাসে হ্যারিরা জেনেছিল তিনরকম ‘Unforgivable Curse’এর কথা, যারা সংক্ষেপে চিনিয়ে দেয় জাদু দুনিয়ার অপরাধ মানচিত্র। Imperious Curse, Cruciatus Curse এবং Death Curse. প্রথমটির সাহায্যে যে কোনও ব্যক্তিকে জাদুকর নিজের নিয়ন্ত্রণে এনে ফেলতে পারেন। তাকে দিয়ে আক্রমণ বা খুনের মতো কাজও করিয়ে নিতে পারেন। দ্বিতীয়টি জাদুরাজ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী টর্চার ডিভাইস। এই কার্স যার ওপর প্রয়োগ করা হচ্ছে সে অবর্ণনীয় যন্ত্রণা ভোগ করে। বিরোধী পক্ষের লোকের মুখ থেকে কথা বের করতে এর জুড়ি নেই। শেষটির কাজ, বলা বাহুল্য, হত্যা। 

এই তিনটি কার্সের ব্যবহারই ম্যাজিকাল আইনে নিষিদ্ধ। এবং তিনটি কার্সই নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য অন্যকে নিয়ন্ত্রণ, অত্যাচার এবং খুন – ভলডেমর্ট ও তার সাঙ্গপাঙ্গেরা এই তিনরকম অপরাধই করেছে একাধিকবার এবং অবলীলায়। ফোর্থ ইয়ারে হ্যারি যখন প্রথমবার সশরীর ভলডেমর্টের মুখোমুখি হয় তখন তার ওপর ক্রুসিয়াটাস কার্স প্রয়োগ করা হয়েছিল। একইভাবে গ্রিফিনডোরেরতরোয়াল হ্যারিরা কোথা থেকে পেল তা জানার জন্য বেলাট্রিক্স হারমাইওনির ওপর প্রয়োগ করেছিল এই কার্স। বেলাট্রিক্সের ক্রুসিয়াটাস কার্সই দায়ী ছিল নেভিলের বাবা-মায়ের করুণ পরিণতির জন্য। 

টম রিডল অর্থাৎ ভোলডেমর্টের প্রথম জীবনেই একাধিক খুনের ইতিহাস জড়িয়ে আছে। খুন হয়েছেন টম রিডল সিনিয়ার ও তাঁর পরিবার। খুন হয়েছেন মধ্যবয়স্কা উইচ হেপজিবাহ্‌ স্মিথ, মিনিস্ট্রি কর্মচারী বার্থা জরকিন্স, হ্যারির একাধিক মাগল। টম রিডলের প্রথম খুন তার ছাত্রজীবনেই। নির্ভুল প্ল্যানমাফিক সে ব্যসিলিস্ক সাপকে কাজে লাগিয়ে হত্যা করেছিল মোনিং মার্টলকে এবং হ্যাগ্রিডকে দোষী সাব্যস্ত করেছিল। মেধাবী, সুদর্শন, শিক্ষকদের নেকনজরে থাকা টমকে ডাম্বলডোর ছাড়া কেউ সন্দেহমাত্র করেননি। একের পর এক নরহত্যার পথ বেয়ে টম রিডল ক্রমশ হয়ে উঠেছিল লর্ড ভোলডেমর্ট। একাধিক হরক্রাক্স বানিয়ে নিজেকে অক্ষয়-অবিনশ্বর করার চূড়ান্ত লালসাই ছিল এতগুলো খুনের প্রধানতম মোটিভ। 

কিন্তু টম রিডল তথা ভোলডেমর্টকে নিছক একরঙা ভিলেন করে রাখেননি তার স্রষ্টা। বিলেতমুলুকের আগাথা ক্রিস্টি থেকে বাংলার ফেলুদা প্রায়শই ডিটেকশনের রাস্তা ধরে অপরাধ-মনস্তত্ত্বকেও ছুঁয়ে ফেলেন। তেমনি, টম রিডলের পিতৃমাতৃহীনতার ইতিহাস, তার জন্মের কাহিনি, অনাথ আশ্রমে স্নেহবঞ্ছিত রুক্ষ জীবনের গল্প কোথাও যেন পরবর্তী পাশবিকতার পটভূমি তৈরি করে দেয়। পাঠকের সামনে ছুঁড়ে দেয় এই প্রশ্ন, ভালোবাসার স্পর্শহীন এক জন্ম ও জীবনই কি তবে ভিলেনকে ঘিরে থাকা যাবতীয় অন্ধকারের উৎস?  

রহস্য উন্মোচনের পদ্ধতি

হ্যারি, রন এবং হারমাইওনি বারবার রহস্যে জড়িয়ে পড়ার পর সাধারণত একসঙ্গেই তাদের সমাধানের চেষ্টা করে বটে, কিন্তু তিনজনের ডিটেকশনের পদ্ধতিতে বিস্তর ফারাক আছে। হ্যারির রহস্যের সমাধান করতে চায় মূলত ইনটিউশন এবং কিছুটা পর্যবেক্ষণের ওপর ভিত্তি করে। ড্রেকো ম্যালফয় যে ডেথ ইটার হিসেবে নিযুক্ত হয়েছে, তার এই সন্দেহ সিক্সথ ইয়ারে শেষপর্যন্ত সত্যিও হয়ে যায়। 

হারমাইওনির ডিটেকশন মূলত রিসার্চনির্ভর। সে চলে নিখুঁত যুক্তির বাঁধা পথে। কেবল স্কুলের পরীক্ষা নয়, সামনে কোনও রহস্য এলেও লাইব্রেরিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে, মোটা মোটা বই পড়ে, কখনও প্রোফেসরদের জিজ্ঞেস করে সমাধানসূত্র খুঁজতে চাওয়া তার অভ্যেস। এ বাবদে তার দুই বন্ধুর তার ওপর অকুণ্ঠ বিশ্বাস আর নির্ভরতা। তেমনি তাদের সস্নেহ উপহাসেরও পাত্র হয় সে। লাইব্রেরিতে বসেই হারমাইওনি আবিষ্কার করেছিল চেম্বার অফ সিক্রেটসের রহস্য। ‘King of Serpents’ ব্যাসিলিস্কের মারণদৃষ্টির শিকার হওয়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তেই বইয়ের পাতায় সে খুঁজে পেয়েছিল রহস্য উন্মোচনের চাবিকাঠি। সেই বইয়ের ছেঁড়া পাতা আর হারমাইওনির রেখে যাওয়া ক্লু ধরে রহস্যের বাকিটুকু ধরে ফেলতে বেশি সময় লাগেনি হ্যারি আর রনের। এইলিন প্রিন্সের সন্ধান পেয়ে ‘হাফ ব্লাড প্রিন্সে’র রহস্য সমাধানেরও খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছিল হারমাইওনি। তার কাছ থেকেই হ্যারিরা জানতে পারে হরক্রাক্সের যাবতীয় খুঁটিনাটি তত্ত্ব। বইপড়া জ্ঞানকে যারা তাচ্ছিল্য করে থাকেন, তাদের আদ্যন্ত ভুল প্রমাণ করে বহুবার হ্যারিদের বিপদ থেকে বাঁচায় হারমাইওনির বিপুল পড়াশোনা। তার অবসারভেশনের ক্ষমতাও মন্দ নয়। ফার্স্ট ইয়ারে তিনমাথাওয়ালা কুকুর ফ্লাফি আসলে যে একটা ট্র্যাপডোর পাহারা দিচ্ছে তা সেই-ই প্রথম লক্ষ করেছিল।       

রনের কাজ মূলত তার দুই বন্ধুর রহস্য সমাধান পদ্ধতির মধ্যে সামঞ্জস্য আনা। অপরাধ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জেরা করা যে কোনও গোয়েন্দা গল্পের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। এই তিন বন্ধু মিলে জেরার কাজেও কখনোসখনো দিব্যি মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছে। ফার্স্ট ইয়ারে হ্যাগ্রিডকে জেরা করে ফ্লাফিকে ঘুম পাড়ানোর উপায় জেনে নেওয়া, কিংবা সেভেন্থ ইয়ারে ক্রেচারকে জেরা করার কথা এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে যেতে পারে।  

অপরাধের মোকাবিলা 

অপরাধ নির্ণয়ের জন্য হামেশাই গোয়েন্দারা নানা উপকরণ বা পদ্ধতি ব্যবহার করেন, সে ফিকশনাল গোয়েন্দা হোক, বা রিয়েল লাইফ। শার্লক হোমসের নানা ইলাসট্রেশনে চুরুট আর ডিয়ারস্টকারের মতোই অনিবার্যভাবে দেখা দেয় তাঁর আতশকাচ। ফিঙ্গার প্রিন্ট বাস্তবের পাশাপাশি গল্পেও অপরাধীকে শনাক্ত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। 

ঠিক তেমনি জাদুদুনিয়াতেও আছে অপরাধ শনাক্ত করার নিজস্ব পদ্ধতি। জন্মদিনে রনের থেকে হ্যারি উপহার পেয়েছিল স্নিকোস্কোপ। এই বস্তুটি যে-কোনও ডার্ক ম্যাজিকের সম্ভাবনা চিহ্নিত করে আগে থেকেই তার আভাস দিতে পারে। ফো-গ্লাস এমন এক আয়না যেখানে ছায়া পড়ে সম্ভাব্য শত্রুদের। আর ভেরিটাসেরাম যেন মাগল দুনিয়ার লাই-ডিকেক্টর। এই পোশন একবার গলাধঃকরণ করিয়ে দিলে সত্যি কথা বলা ছাড়া আর কোনও উপায় থাকে না অপরাধীর। 

ডার্ক ম্যাজিকের হাত থেকে বাঁচার এবং তার মুখোমুখি দাঁড়ানোর জন্য জাদুবিশ্বে রয়েছে অজস্র প্রোটেকটিভ চার্ম, স্পেল, হেক্স ইত্যাদি। অপরাধীদের মোকাবিলা করার জন্য মাগল পুলিশবিভাগের মতোই রয়েছে কর্মদক্ষ অররের দল। কিন্তু এই সিরিজ যত এগোয় তত স্পষ্ট হতে থাকে অন্ধকারের সঙ্গে লড়াই করার সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র বোধহয় ভালোবাসা, যার অমোঘ শক্তি আমাদের চরম দুর্বিপাকেও বেঁধে বেঁধে থাকতে শেখায়।      

রেড হেরিং’  

গোয়েন্দাগল্পে অনেকসময় সমাধানসূত্র থাকে চোখের সামনেই। তবে এত বেশি সামনে যে তা প্রাথমিকভাবে দৃষ্টি এড়িয়ে যায় গোয়েন্দার। প্রথম বর্ষের প্রথমেই চকলেট ফ্রগের সঙ্গে পাওয়া কার্ডে নিকোলাস ফ্ল্যামেলের নাম হ্যারির চোখে পড়েছিল। কিন্তু তা ভুলে যাওয়ায় হারমাইওনির বিস্তর বই ঘাঁটার পরেও তারা নিকোলাস ফ্ল্যামেলের পরিচয় উদ্ধার করতে পারেনি। ম্যাড আই মুডির ছদ্মবেশে বার্টি ক্রাউচ জুনিয়র চোখের সামনে ঘুরে বেড়ালেও ধরতে পারেনি কেউ।  এছাড়া, বহু গোয়েন্দাগল্প তার প্লটকে জটিল আর আকর্ষণীয় করে তুলতে বেশ কিছু ‘রেড হেরিং’ ছড়িয়ে রাখে। হ্যারিরাও এধরনের False Lead-এ বিভ্রান্ত হয়েছে অজস্রবার। 

আরও পড়ুন: ডিটেক্ট IT

দ্বিতীয় বর্ষে টম রিডলের ডায়রি বিভ্রান্ত করে হ্যারিদের। অল্পসময়ের জন্য হলেও তাদের সন্দেহ গিয়ে পড়ে হ্যাগ্রিডের ওপর। গোয়েন্দার কাছে কোনও লোকই সন্দেহের বাইরে নয়, গোয়েন্দাগল্পের এই পরিচিত ছকের আনাগোনা দেখা যায় এই সিরিজেও। শেষ খণ্ডে স্বয়ং ডাম্বলডোরকে ঘিরেই ঘনিয়ে ওঠে নানা কূট সন্দেহ। দ্বিতীয় খণ্ডে ড্রেকো ম্যালফয়ের অপরাধ সম্পর্কে একপ্রকার নিঃসন্দেহ ছিল হ্যারি। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে পলিজুস পোশন তৈরি করে স্লিদারিন কমনরুমে ঢোকার পর বোঝা যায়, তাদের সব আয়োজন বৃথা। তৃতীয় বর্ষে গোটা গল্পের ভরকেন্দ্র গড়ে ওঠে সিরিয়াস ব্ল্যাকের অপরাধ নিয়ে, অথচ শেষে দেখা যায় সে নিরপরাধ। আসল অপরাধী অন্যজন। চতুর্থ খণ্ডে আসল কালপ্রিটের বদলে প্রাক্তন ডেথ-ইটার কারকারফের দিকে সঙ্গত কারণেই ধেয়ে যায় সকলের সন্দেহ। রেগুলাস ব্ল্যাকের ক্ষেত্রেও প্রায় একই ভুল হয়েছিল হ্যারিদের। পঞ্চম বর্ষে হ্যারির স্বপ্নকে ব্যবহার করে মিনিস্ট্রিতে ফাঁদ পাতে ডেথ-ইটাররা। 

ফার্স্ট ইয়ারে কুইডিচ খেলার সময় হ্যারির ঝাঁটার দিকে স্নেপের তাকিয়ে থাকা আর তাঁর পায়ের ক্ষতচিহ্ন থেকে তিনবন্ধু প্রায় নিশ্চিত হয়েছিল আসল অপরাধী আসলে স্নেপ। পরে সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়। সিভারাস স্নেপই নিঃসন্দেহে গোটা সিরিজের সেরা ‘রেড হেরিং’। তাঁকে ঘিরে থাকা যাবতীয় সন্দেহ আর ঘৃণার আবহ বেমালুম ঘেঁটে যায় শেষ খণ্ডের ‘প্রিন্সেস টেল’ অধ্যায়ে এসে।  

কিন্তু গোয়েন্দাগল্পের তথাকথিত গোয়েন্দাদের মতো এইসব বিভ্রান্তি সবসময় এড়িয়ে যেতে পারে না হ্যারিরা। ‘Cozy Mystery’-র ধারায় সচরাচর একজন গোয়েন্দাই তাঁর একক চেষ্টায় সমাধান করে ফেলেন যাবতীয় রহস্যের। তাঁর সহকারী অনেকসময়েই তাঁর বুদ্ধিদীপ্ত চরিত্রকে আরও উজ্জ্বল করার উপকরণমাত্র। হ্যারি পটার সিরিজে কিন্তু তিন বন্ধুর অবদান প্রায় সমান-সমান। তিনজনে একত্রে রহস্যের সমাধান করতে চেষ্টা করে। তবু সবসময় পারে না নির্ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছতে। তিনজনে মিলে অ্যাডভেঞ্চারে সামিল হলেও মাঝেসাঝে তাদের ডিটেকশনের ব্যর্থতাই বোধহয় তাদের আলাদা করে দেয় সিক্রেট সেভেন বা ফেমাস ফাইভের মতো অ্যাডভেঞ্চার কাহিনি থেকে। 

ধাঁধাঁর ব্যবহার 

ফেলুদার গল্পের ‘মুড়ো হয় বুড়ো গাছ’ই হোক বা শার্লক হোমসের ‘মাসগ্রেভ রিচুয়াল’, রহস্যরোমাঞ্চ গল্পে প্রায়ই রহস্যের ক্লু লুকিয়ে থাকতে দেখা যায় কোনও ছড়া বা সাংকেতিক বাক্যবন্ধে। রোলিংয়ের কলমেও একাধিকবার উঠে এসেছে এ জাতীয় ধাঁধা। ফিলজফার্স স্টোনকে সুরক্ষিত করতে একের পর এক কঠিন বাধা সাজিয়ে দিয়েছিলেন হগওয়ার্টসের প্রবাদপ্রতিম শিক্ষকেরা। আগুনের বলয় দিয়ে ঘেরা আসল ঘরটিতে পৌঁছনোর ঠিক আগের মুহূর্তে এক বিশেষরকম জাদু পানীয় পান করতে হত। সেই জাদু পানীয়ের বোতলের সঙ্গে মেশানো ছিল আরও কয়েকটি অকাজের বোতল, তাদের কোনোটায় জল, কোনোটায় আবার বিষ। বাইরে থেকে দেখে তাদের আলাদা করে চেনার কোনও উপায় ছিল না। শেষতম হার্ডল হিসেবে সমাধান করতে হত একটি ধাঁধার, যেখানে সারি দিয়ে সাজানো কোন আকারের কোন মাপের বোতলে কী তরল আছে তার ক্লু ছিল। এই ধাঁধার সমাধানে হারমাইওনির ‘লজিকাল রিজনিং’-এর সহজাত ক্ষমতা কাজে এসেছিল আশ্চর্যভাবে। ফোর্থ ইয়ারে ‘মারপিপল’দের গানে ছিল ট্রাইউইজার্ড টুর্নামেন্টের আসন্ন দ্বিতীয় টাস্কের সূত্র। শেষ টাস্কের সময়ে প্রবল মানসিক চাপের মধ্যেও স্ফিংক্সের জিজ্ঞেস করা ধাঁধার ঠিক উত্তর দিয়ে উপস্থিত বুদ্ধির পরিচয় দিয়েছিল হ্যারি। র‍্যাভেনক্ল হাউসের কমনরুমে ঢুকতে গেলে পাসওয়ার্ডের বদলে যে প্রশ্নের উত্তর দিতে হত, তাকেও ধাঁধাই বলা চলে। অপরাধের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ না থাকলেও পাঠককে মাথা খাটানোয় উসকে দিয়েছে এইসব ধাঁধা।     


এ পর্যন্ত হ্যারি পটার সিরিজে অপরাধ ও ডিটেকশনের যে যে দিক নিয়ে কথা বলা হয়েছে, তাতে মনে হতেই পারে, এই সিরিজের সাসপেন্সের উপাদানগুলি বুঝি আগাথা ক্রিস্টি প্রমুখের Cozy Mystery-র ধারাটিকে অনুসরণ করেছে। কিন্তু হ্যারি সিরিজের সব ঘটনা মোটেই পর্যবেক্ষণ আর যুক্তি দিয়ে অপরাধী ধরে ফেলার মতো নিরাপদ বলয়ে আটকে থাকেনি। এখানে হিংসা, খুন, অত্যাচার, অপটু বা অন্ধ-হয়ে থাকা সরকার, রোমান্টিক সাবপ্লট এবং কিশোর থেকে বয়স্ক সব ধরনের পাঠককে আকর্ষণ করার মতো কভার-ইলাস্ট্রেশন –-  পাল্প ক্রাইম-ফিকশনের এই সব উপাদান খুঁজে পাওয়া কঠিন নয়। বিশেষত গল্প যত এগোয়, হ্যারি ও তার বন্ধুরা যত বড়ো হয়, স্কুলের নিরাপত্তার আচ্ছাদনটুকু যত দুর্বল হয় – এই সিরিজ ততই যেন ‘হু ডান ইট’-এর ছক পেরিয়ে হার্ড বয়েলড ফিকশনের কোনও কোনও উপাদান আত্মস্থ করে নিতে থাকে। ভোলডেমর্টের রাজত্বে ডেথ ইটাররা শক্তিশালী হয়ে ওঠার পর হার্ড বয়েলড ধারার মতোই সংগঠিত অপরাধচক্রের মুখোমুখি হতে হয় ‘ডাম্বলডোর্স আর্মি’-কে। উপরন্তু যখন জানা যায় সপ্তম হরক্রাক্স হিসেবে হ্যারির মধ্যেই ঢুকে আছে ভোলডেমর্টের আত্মার একাংশ, তখন তার চরিত্রের আলো-অন্ধকারের দোলাচল, বয়ঃসন্ধির স্বাভাবিক অস্থিরতার সঙ্গে মিশে যাওয়া পরিস্থিতিগত রাগ-উত্তেজনা-ভয়-অসহায়তা যেন Noir ক্রাইম নভেলের সঙ্গেও Cormoran Strike সিরিজ-রচয়িতার এই সৃষ্টির ক্ষীণ সংযোগসূত্র তৈরি করে।  

আসলে রবার্ট গ্যালব্রেইথের Noir-ধর্মী হার্ড-বয়েলড গোয়েন্দা Cormoran Strike-কে গড়ে তোলার দক্ষতা ছিল বলেই হয়তো রোলিং রহস্যরোমাঞ্চ ও গোয়েন্দাসাহিত্যের উপাদানের এত সহজ সমাবেশ ঘটাতে পেরেছিলেন হ্যারি পটার সিরিজে। এই সিরিজ একেবারে শেষে যে রহস্যের সামনে এসে দাঁড়ায়, তার সঙ্গে অবশ্য অপরাধের যোগ নেই। জীবন-মরণের সীমানায় দাঁড়িয়ে হ্যারি বুঝতে পারে মৃত্যু যবনিকার ওইপারে কী আছে তা জানার সুযোগ মিলেছে তার। তবু কৌতূহল আর ক্লান্তি হার মানে জীবনের কাছে। শেষ অ্যাডভেঞ্চার অসমাপ্ত রেখে, রহস্যের সমাধান না করেই হ্যারি ফিরে আসে তার বন্ধুদের দিকে। নতুন পৃথিবীর দিকে। জীবনের দিকেও।      



 


#হ্যারি পটার #ক্রাইম #মিস্ট্রি #কিশোর সাহিত্য #গোয়েন্দা #ডিটেক্ট ইট #সিলি পয়েন্ট

Leave a comment

All fields are required. Comment will appear after it is approved.

trending posts

newsletter

Connect With Us

today's visitors

47

Unique Visitors

121570