উপন্যাস

টেরাকোটা টালমাটাল

প্রবীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় May 1, 2022 at 4:15 am উপন্যাস ১৩৩৬

প্রথম পর্ব

.....................

‘কিপলিং সাহেবের লেখা পড়ে মনে হচ্ছে গিরিডি ভ্রমণ আপনার বৃথা যাবে না, লালমোহনবাবু।’ 

জটায়ুর মাথাটা মাঝে মাঝেই ওঁর বুকের কাছে নেমে আসছিল, সম্ভবত গত আধঘণ্টা ধরে সমানে শালবন ছাড়া আর কিছু না দেখতে পাওয়ার কারণে। ফেলুদা মনে হল ভদ্রলোককে জাগিয়ে রাখার জন্যই কথাটা বলেছে। হরিপদবাবু যদিও ওস্তাদ ড্রাইভার, কিন্তু লম্বা ড্রাইভে পাশের সিটে বসে কেউ ঘুমিয়ে পড়লে ঘুমটা ছোঁয়াচে হয়ে যেতে পারে।   

‘কী নাম বললেন মশাই? এদিককার জায়গাগুলোর নাম মনে রাখতে বেশ মেহনত করতে হচ্ছে।’ লালমোহনবাবুর চোখ খুলেছে বটে, কিন্তু বোঝাই গেল ফেলুদার কথাটা ঠিক শুনতে পাননি। গাড়িতে এলেও ভদ্রলোক সঙ্গে করে রেলের একটা ট্র্যাভেল গাইড নিয়ে এসেছেন আর থেকে থেকেই কাছেপিঠের স্টেশনগুলোর নামে চোখ বোলাচ্ছেন। মিহিজাম, জামতাড়া অবধি ভদ্রলোকের সমস্যা হয়নি। কিন্তু তারপর ভাণ্ডারিডি, মদন কাট্টা এইসব নাম যেভাবে বিড়বিড় করছিলেন, তাতে মনে হয় মেহনত করাটা নেহাত কথার কথা নয়।  

ফেলুদা বাক্যব্যয় না করে বইটাই ধরিয়ে দিল লালমোহনবাবুর হাতে। গিরিডি আসা ঠিক হওয়ার পর থেকেই কিপলিং-এর ‘লেটারস ফ্রম দ্য ইস্ট’ বইটা কাছছাড়া করছে না ফেলুদা, যদিও বইটা ওর নয়, সিধুজ্যাঠার। 

বইয়ে মিনিটখানেক চোখ বুলিয়ে লালমোহনবাবু যেভাবে সটান হয়ে বসলেন, বোঝা গেল ওঁর ঝিমুনিটা গেছে, ‘কী কাণ্ড! সাহেব পুরো অঞ্চলটাকেই যে ভূতুড়ে বলছেন।’ 

‘সেই কথাই বলছি। পিঠাপুরমের পিশাচ-এর পর আর কোনও ভূতের গপ্পো তো লেখেননি। প্রখর রুদ্রকে এ বছরটা রেহাই দিয়ে আর-একটা জমজমাটি ভৌতিক উপন্যাস লিখে ফেলুন। কিপলিং সাহেব যদিও ১৮৯৯ সালে এ বই লিখেছেন, তবে এক-দুটো পোড়ো বাড়ি কি আর খুঁজলে পাওয়া যাবে না? ‘ 

লালমোহনবাবু অবশ্য জানালেন প্রখর রুদ্র সিরিজের নতুন বই ‘নাইরোবির নরখাদক’ পয়লা বৈশাখ ডিউ। এবং সে বইয়ে্র পাণ্ডুলিপি পড়ে জটায়ুর পরিচালক বন্ধু পুলক ঘোষাল জানিয়েছেন আফ্রিকার জঙ্গলের ব্যাপারটা না থাকলে এ বই বম্বে এখনই লুফে নিত। 

ফেলুদা চারমিনারের একটা ফাঁকা প্যাকেটে সিগারেটের ছাই ঝাড়তে ঝাড়তে বলল, ‘পরের এডিশনে তাহলে জঙ্গলটাকে বাদ দিন। পুলকবাবুরও সুবিধা হবে, আপনার নরখাদকেরও। মানুষ যদি খেতেই হয় তাহলে নাইরোবির মতন জনবহুল শহরে ঘাঁটি গেড়ে থাকলেই সুবিধে।’  

লালমোহনবাবু মাথা চুলকে বললেন, ‘আসলে একটা গোড়ায় গলদ হয়েছে, রেফারেন্সিং-এ। যে বই পড়ে লিখতে বসেছিলাম সেটা মনে হয় ওই কিপলিং সাহেবের সময়কারই বই। নাইরোবি যে অ্যাদ্দিনে এত জমজমাট শহর হয়ে গেছে সেটা ঠিক জানতুম না।’ 

আমাদের গাড়ি গিরিডি শহরে ঢুকছে, এক ঝলক দেখে মনে হল কিপলিং-এর বই পড়ে গিরিডি নিয়ে লিখতে বসলে একই ভুল হবে। আমি যে কয়েক পাতা পড়েছিলাম তাতে দেখেছি গিরিডির বন্য সৌন্দর্য নিয়ে কিপলিং বেশ মোহিত ছিলেন। কিন্তু যে গিরিডি এখন দেখছি সেটা বেশ ঘিঞ্জি। আমাদের মধ্যে একমাত্র হরিপদবাবু এর আগে গিরিডিতে এসেছেন, উনি বললেন উশ্রী নদীর অন্য দিকে এখনও বেশ কিছুটা জঙ্গল রয়েছে। আর যে তল্লাটে এককালে বাঙালিরা বসতবাড়ি বানাতেন সেই বারগণ্ডার দিকটা আর-একটু খোলামেলা।

বারগণ্ডা নামটা চেনা চেনা ঠেকল। ফেলুদাকে বললাম, ‘তোমার বন্ধুর বাড়ি ওখানেই, না?’  

‘হুঁ, বারগণ্ডায় ভরদ্বাজদের তিন পুরুষের বাড়ি। ভরদ্বাজের ঠাকুর্দা ছিলেন কলকাতা হাইকোর্টের বিখ্যাত ব্যারিস্টার, পশ্চিমে হাওয়া বদলাতে এত ঘন ঘন আসতেন যে এখানে একটা বাড়িই বানিয়ে ফেলেছিলেন।’  

এখানে বলে রাখা ভালো ভরদ্বাজ মৈত্র ফেলুদার কলেজের বন্ধু, এবং প্রায় বছরখানেক ধরে বলে বলে ফেলুদাকে গিরিডি আসার ব্যাপারে রাজি করাতে পেরেছে। যদিও বেশ কয়েকটা কেসের গতি করার পর ফেলুদা যখন সময় বার করে উঠতে পারল ঠিক তখনই কাজের সূত্রে ভরদ্বাজ দেশের বাইরে। বন্ধু যেতে পারবে না শুনে ফেলুদা শুরুতে কিছুটা দোনামনা করছিল বটে, কিন্তু ফেব্রুয়ারি শেষ হলেই পঁয়ত্রিশ ডিগ্রির বেশি গরম পড়তে পারে শুনে ওর নিমরাজি ভাবটা কেটে গেল। 

বারগণ্ডার দিকে যেতে যেতে খেয়াল করলাম দোতলা-তিনতলা বাড়ি বেশি না থাকলেও এদিককার অধিকাংশ বাড়িই অনেকটা জায়গা জুড়ে তৈরি। ফলে প্রায় প্রত্যেক বাড়িতেই বাগান আছে। বাংলো ধাঁচের বাড়িগুলোর পাঁচিল বেশ নিচু বলে রাস্তা থেকে গাছগুলো তো বটেই, বাড়িগুলোও দিব্যি দেখা যায়। একটা অর্ধেক গোলাকৃতি বাড়ির বাগানে দেখলাম সারি সারি ইউক্যালিপটাস গাছ লাগানো। সন্ধ্যার মুখে হাতে গোনা যে কয়েকটা বাড়িতে আলো জ্বলে উঠছে তার মধ্যে এই বাড়িটাও আছে, এক ঝলক দেখে মনে হল দোতলায় ঘরের দেওয়ালের অনেকটা জুড়ে আলোআঁধারির চমৎকার সব নকশা তৈরি হয়েছে।

‘জমিদার যদি নাও হন, বাড়ির মালিক এককালে বেশ অর্থবান ছিলেন বলেই মনে হচ্ছে’, ফেলুদাও দেখলাম বাড়িটা খেয়াল করেছে।

‘কী করে বুঝলে? বাড়ির সাইজ দেখে?’

‘শুধু সাইজ নয়। আলোর যা খেল দেখলাম, খান দু-এক ঝাড়লন্ঠন না থাকলে হয় না। আর খান দু-এক ঝাড় মানে সম্ভবত জলসাঘর জাতীয় কিছু ছিল, হয়তো এখনও আছে।’ 

ভরদ্বাজ মৈত্রদের বাড়ি দেখেও অবশ্য চোখ টেরিয়ে গেল। মেন গেট থেকে বেশ কিছুটা নুড়িছড়ানো পথ ধরে এগিয়ে এসে আমাদের গাড়ি পোর্টিকোর নিচে থামল। গাড়ি থেকে নামতে নামতে দেখি বাড়ির ভেতর থেকে এক বয়স্ক ভদ্রলোক বেরিয়ে আসছেন, হাতে বেশ নকশাদার এক ছড়ি। চেহারায় একটা সাবেকি বনেদিয়ানা আছে। লালমোহনবাবু এক ঝলক দেখে বললেন ভদ্রলোককে টালিগঞ্জের কোনও অভিনেতার মতন দেখতে। কার মতন সেটা অবশ্য মনে করতে পারলেন না। 

‘সাহেবি কায়দায় মিস্টার মিটার নাকি বাঙালি কেতায় প্রদোষবাবু, কোনটা বলি বলুন তো?’ ভদ্রলোক অবশ্য সাহেবি কায়দায় হ্যান্ডশেক করার জন্যই হাত বাড়িয়েছেন। ফেলুদা নমস্কার ফিরিয়ে বলল, ‘আপনি নিশ্চয় সুধাংশুবাবু? ভরদ্বাজ যখন আপনার ভাইপো, আপনি আমাকে নির্দ্বিধায় প্রদোষ বলেও ডাকতে পারেন।’ 

সুধাংশুবাবুর ঠোঁটের কোণে হাসি, ‘ভরদ্বাজের কল্যাণে আমিও আপনাদের সবাইকে না দেখেই চিনে গেছি। আর হ্যাঁ, মাস্টার তপেশের লেখা পড়া হয়নি বটে, তবে শ্রীযুক্ত লালমোহন গঙ্গোপাধ্যায়ের আমি কিন্তু বড়ো ভক্ত। আমার আবার পাল্প ফিকশন নিয়ে ইন্টারেস্ট সেই কলেজলাইফ থেকে।’ 

জটায়ুর সামান্য অপ্রস্তুত হাসি দেখে মনে হল আমার মতন উনিও পাল্প ফিকশন কথাটা বোধহয় বোঝেননি। ফেলুদার থেকে পরে জেনে নিতে হবে।

সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠতে উঠতে সুধাংশুবাবু জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনারা হপ্তা দু-এক মতন আছেন তো? গাড়ি যখন নিয়েই এসেছেন তখন মধুপুর-দেওঘর-পচম্বা সবই ঘুরে নিতে পারবেন। আমি হিতেনকে বলে দেব, ওই নয় আপনাদের লোক্যাল গাইড হয়ে যাবে।’ 

‘দিন সাতেক তো আছিই, তারপর দেখা যাক।’ 

সুধাংশুবাবু আকাশ থেকে পড়লেন, ‘বলেন কী মশাই? সাত দিন পর আপনাকে যেতে দিচ্ছে কে? আর যেতে দিলে ভরদ্বাজ যে তার খুড়োর সঙ্গে নাহক রাগারাগি করবে, সেটাও ভাবুন। তা ছাড়া এতদিন পর কলকাতা থেকে অতিথি পেলাম, গল্প শুনতে হবে না?’

ভদ্রলোকের আন্তরিকতা বেশ লাগল। ফেলুদাও হাসিমুখে বলল, ‘গিরিডির গল্প শোনার জন্য আমরাও অবশ্য মুখিয়ে রয়েছি। যাঁর কথা বললেন, সেই হিতেনবাবু কি আপনার সেক্রেটারি?’ 

‘সেক্রেটারিও বলতে পারেন, কেয়ারটেকারও বলতে পারেন। তবে বাড়ির কেয়ারের কথা বলছি না কিন্তু, এই বুড়োর কেয়ারের কথা বলছি। হিতেনের জন্ম বারগণ্ডাতেই, বয়সে ভরদ্বাজের কাছাকাছি হবে। ছোটো থেকেই চিনতাম, বুঝলেন? কলকাতায় আমার জ্যাঠতুতো দাদা অর্থাৎ ভরদ্বাজের বাবাও মারা গেলেন, আমিও রিটায়ার করে গিরিডি চলে এলাম। এত বড়ো বাড়ি সামলানোরও তো লোক দরকার, ভাগ্যক্রমে ওকে পেয়ে গেছি। শিক্ষিত ছেলে কিন্তু। আমাকে প্রতিদিন স্টেটসম্যান পড়ে শোনানোর দায়িত্ব হিতেনের। কাল সকালেই তো আসবে, আলাপ হয়ে যাবে আপনাদের সঙ্গে।’    

ডিনারে গাদাখানেক পদের ব্যবস্থা করেছিলেন সুধাংশুবাবু। প্রত্যেকটা পদই সুস্বাদু। রাঁধুনির এলেম তো আছেই, কিন্তু এখানকার শাকসবজিই হোক কি মুরগি, কোয়ালিটি যে কলকাতার তুলনায় বেশ ভালো সে কথাও মানতে হবে। খাওয়াদাওয়ার পর সেই কথাই হচ্ছিল। সুধাংশুবাবু হাসতে হাসতে বললেন, ‘মশাই, ওই কারণেই তো একশো বছরের বেশি সময় ধরে ড্যাঞ্চিবাবুরা এখানে এসে আস্তানা গাড়তেন। ড্যাঞ্চিবাবু কারা, জানো তো মাস্টার তপেশ?’

ফেলুদার কল্যাণে এই শব্দটা আমার জানা ছিল অবিশ্যি। গিরিডি আসার ঠিক আগে আগেই জেনেছি। কলকাতা থেকে বাবুরা পশ্চিমে হাওয়াবদল করতে আসতেন, আর বাজারে গিয়ে বলতেন ‘ড্যাম চিপ’। সেই ড্যাম চিপ থেকে হয়ে গেল ড্যাঞ্চি। 

‘এই বারগণ্ডায় যত বাড়ি দেখছেন তার বোধহয় ষাট শতাংশ এই ড্যাঞ্চিবাবুদের বানানো। তখনকার দিনের পয়সাওলা লোকজন সব, বুঝলেন না? উকিল-হাকিম-ডাক্তার-ব্যবসায়ী, কাকে পাবেন না? আমার বাবার কথা তো ভরদ্বাজের থেকে নিশ্চয় শুনেছেন। একটু এগিয়ে উশ্রী নদীর কাছেই ডাক্তার নীলরতন সরকারের বাড়ি দেখতে পাবেন। আসার পথে রায়দের বাড়ি আপনাদের চোখে পড়েছে কি না জানি না, তবে জিতেন্দ্রনাথ রায়ের টাকা এককালে লন্ডনের রয়্যাল স্টক এক্সচেঞ্জে খাটত বলে শোনা যায়। ওঁর ছেলে রণবীর রায় আমার বিশেষ পরিচিত, কাল নিয়ে যাব আপনাদের। এখনও দু-একটা শেভ্রোলে-ব্যুইক রয়ে গেছে।’  

ফেলুদা চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছিল। এবার কাপটা নামিয়ে রেখে বলল, ‘ইউক্যালিপটাসওলা বাড়িটার কথা বলছেন কি?’ 

সুধাংশুবাবুর চোখে একটা ঝিলিক দেখতে পেলাম, ‘এই না হলে গোয়েন্দার চোখ! হ্যাঁ হ্যাঁ, ওই বাড়িই। কয়েকদিন যাবৎ আবার শুনছি এক সাহেব এসে রয়েছেন। কাল নয় তাঁর সঙ্গেও আলাপ করে আসা যাবে।’ 


ব্রেকফাস্ট টেবিলে এসে দেখি ব্যাকব্রাশ করা, মোটা ফ্রেমের চশমা পরা এক ভদ্রলোক অপেক্ষা করছেন। আমাদের দেখে নমস্কার করে বললেন, ‘আমি হিতেন সান্যাল। আপনারা এসেছেন শুনে আর তর সইল না, একটু আগেই চলে এলাম। তা ছাড়া সুধাংশুবাবু বললেন আপনাদের উশ্রীর দিকটা ঘুরিয়ে দিতে, রোদটা চড়া হওয়ার আগে পৌঁছে গেলেই ভালো।’ 

ফেলুদা নমস্কার ফিরিয়ে ওঁর হাতে ধরা ম্যাগাজিনটা দেখে বলল, ‘দেশ মনে হচ্ছে? দেখতে পারি?’ 

‘সার্টেনলি, এটা অবশ্য সুধাংশুবাবুর কপি। গতকালই এসে পৌঁছেছে।’  

ফেলুদা ম্যাগাজিনটা দেখতে দেখতে বলল, ‘পদবি সান্যাল বললেন?’

‘আজ্ঞে?’ ভদ্রলোক ফেলুদার প্রশ্নে একটু থতোমতো খেয়ে গেলেন।

‘দেশে দেখছি বাংলার টেরাকোটা মন্দির নিয়ে একটা লেখা বেরিয়েছে। লেখকের নাম হিতেন্দ্রনাথ সান্যাল। আপনিই নাকি?’

ভদ্রলোককে বেশ হতভম্ব দেখাল, ‘কই, না তো! আমি আসলে ম্যাগাজিনটা খোলার সময়ও পাইনি। একই নাম দেখাচ্ছে?’

‘তাই তো দেখছি। এরকম নেমসেক চট করে দেখা যায় না অবিশ্যি!’ 

হিতেনবাবু ঘাড় নাড়লেন, ‘তা যা বলেছেন। শুধু নাম নয়, একেবারে পদবি অবধি মিলে যাচ্ছে। আমি যদিও মন্দিরের ব্যাপারে বিশেষ কিছু জানি না। উশ্রীর ওপারে জঙ্গলের মধ্যে শুনেছি একটা ভাঙা মন্দির আছে। আপনারা ইন্টারেস্টেড হলে নিয়ে যেতে পারি আজকেই।’ 

লালমোহনবাবু উত্তেজনার চোটে আমার কনুইটা খামচে ধরলেন, ‘বলেন কী! জঙ্গলের মধ্যে ভাঙা মন্দির! এরকম থ্রিলিং ব্যাপার মিস করা যায় নাকি! বাঘ-টাঘ না থাকলেই হল।’

হিতেনবাবু হেসে ফেললেন, ‘না, গিরিডির জঙ্গলে বাঘ আছে বলে তো কোনোদিন শুনিনি। জঙ্গল পেরিয়ে ওদিকে সাঁওতালদের ছোটো ছোটো কিছু গ্রাম আছে, সেখানে ছোটোবেলায় শুনতাম বুনো শুয়োর বেরোত। সেও আজকাল আর দেখা যায় বলে মনে হয় না।’

বুনো শুয়োরের খবরটা জটায়ুকে মনে হয় খুব একটা স্বস্তি দিল না। তবে তাৎক্ষণিক হকচকানিটা দিব্যি কাটিয়ে উঠে ভদ্রলোক খুব স্মার্টলি ‘তবে আর দেরি কেন মশাই, শীঘ্রস্য শুভম’ বলে হাঁটা লাগালেন। 

সুধাংশুবাবুদের বাড়ি থেকে উশ্রী নদী গাড়িতে বোধহয় মিনিট পাঁচেকও লাগে না। নদীর থেকেও অবশ্য আমার বেশি ভালো লাগল উশ্রী জলপ্রপাত। শুনে ফেলুদা বলল, ‘সেটা স্বাভাবিক। একটা ঝরনাকে তুই প্রায় পঞ্চেন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করতে পারবি, নদীর ক্ষেত্রে সবসময় সেটা হয় না।’ 

লালমোহনবাবু পঞ্চেন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করবেন বলেই কি না কে জানে, দেখি নদীর মধ্যে থেকে উঠে থাকা কালো পাথরগুলোর ওপর পা রেখে রেখে ঝরনার কাছে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। উশ্রী জলপ্রপাতের কাছে এই মুহূর্তে আমরা ছাড়া আর একজনকেই দেখা যাচ্ছে। তিনিও সম্ভবত ট্যুরিস্ট, কারণ বেশ অনেকক্ষণ ধরেই জলের মধ্যে দাঁড়িয়ে ক্যামেরা বার করে একের পর এক ছবি তুলে চলেছেন। লালমোহনবাবু তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে সেই ভদ্রলোককে প্রায় ধাক্কা মারতে যাচ্ছিলেন। শেষ সময়ে সামলে নিয়ে মনে হল জিভ কেটে সরি বললেন। 

হিতেনবাবু সবে বলেছেন ‘এই একশিলা পাথরগুলো বেশ পিছল হয় কিন্তু’, বলতে বলতেই দেখি লালমোহনবাবু বেসামাল হয়ে পেছনে পড়ে যাচ্ছেন। শেষ মুহূর্তের একটা প্রাণান্তকর চেষ্টায় কিছু আঁকড়ে ধরার জন্যই যেন ওঁর ডান হাতটা সটান ওপরে উঠে গেল। 

বেশ বড়োসড়ো একটা দুর্ঘটনা ঘটতে যাচ্ছিল। কিন্তু সেটা ঘটল না কারণ জলে দাঁড়িয়ে থাকা ট্যুরিস্ট ভদ্রলোক অসম্ভব দ্রুততায় খান দু-এক পাথর একবারে টপকে গিয়ে জটায়ুকে পিছন থেকে ধরে ফেললেন। জটায়ুকে পড়ে যাচ্ছেন দেখা মাত্র ফেলুদা দৌড়োতে শুরু করেছিল, কিন্তু আমরা বেশ কিছুটা পেছনে থাকায় মনে হয় না ও ঠিক সময়ে পৌঁছে উঠতে পারত।

আমি আর হিতেনবাবু যতক্ষণে গিয়ে পৌঁছলাম, ততক্ষণে ফেলুদা আর ট্যুরিস্ট ভদ্রলোক প্রায় মুহ্যমান জটায়ুকে দুদিক থেকে ধরে এনে জলের ধারে একটা পাথরের ওপর বসিয়েছে। এতক্ষণে ভদ্রলোককে ভালো করে দেখার সুযোগ পাওয়া গেল, এবং প্রথমেই যেটা যেটা চোখে পড়ল সেটা হল ভদ্রলোকের চোখের মণির উজ্জ্বল নীল রং। ছিপছিপে চেহারা, চুল কালো, গায়ের রঙেও একটা তামাটে ভাব আছে। কিন্তু ওই চোখ জানিয়ে দেয় ভদ্রলোক এ দেশের নন। 

জটায়ু ঠিক আছেন কি না জেনে নিয়ে ফেলুদা ভদ্রলোককে ইংরেজিতে ধন্যবাদ দিতে যাচ্ছিল, আর ঠিক সেই সময়ে ভদ্রলোক স্পষ্ট বাংলায় বলে উঠলেন, ‘চুন-হলুদ লাগবে কি?’ 

সাহেবের মুখে চুন-হলুদ শুনেই বোধহয় লালমোহনবাবুর ঘোরটা কেটে গেল। ওঁর মতন চক্ষু ছানাবড়া অবস্থা না হলেও ফেলুদাও একটু অবাক হয়েছে বলে মনে হয়, তবে সেটা প্রকাশ না করে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনিই কি রায়দের বাড়িতে উঠেছেন?’ 

ভদ্রলোক সম্মতিসূচক মাথা নাড়লেন, আর এর পরের কথোপকথনের পুরোটাই হল ইংরেজিতে। আমি যদিও বাংলাতেই লিখছি। 

সাহেবের নাম ডেভিড ম্যাককালাম। ফেলুদা ঠিকই ধরেছে, এঁর কথাই সুধাংশুবাবু শুনেছিলেন। ইনি অধ্যাপক, ইংল্যান্ডের মানুষ হলেও শান্তিনিকেতনে আর্ট-হিস্ট্রি পড়ান। বললেন ছুটিছাটা পেলেই পশ্চিমের দিকে ঘুরতে চলে আসেন। পুরোনো মন্দিরের ইতিহাস খুঁজে বেড়ানো ওঁর একটা হবি বিশেষ। রায়বাড়ির কর্তা রণবীর রায় ওঁর পুরোনো বন্ধু, এ যাত্রা তাঁর কাছেই উঠেছেন। 

ডেভিড ইতিহাসের অধ্যাপক শোনা ইস্তক লালমোহনবাবু উশখুশ করছিলেন। মন্দিরের কথা শুনে আর থাকতে না পেরে ডেভিডকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘গিরিডির জঙ্গলেও মন্দির আছে জানেন তো?’

 ‘শিবমন্দিরের কথা বলছেন কি? টেরাকোটার? না, ওটা এখনও দেখা হয়নি।’ 

লালমোহনবাবুর মুখ দেখে খেয়াল হল মন্দির যে শিবের সেটা হিতেনবাবু আমাদের বলেননি। হিতেনবাবু মাথা নাড়লেন, ‘হ্যাঁ, ডেভিড ঠিকই বলেছেন। জোড়বাংলা শিবমন্দিরই বটে।’ 

ফেলুদা হিতেনবাবুর সঙ্গে ডেভিডের আলাপ করিয়ে দিতে ডেভিড বিস্মিত স্বরে বললেন, ‘আপনিই হিতেন্দ্রনাথ সান্যাল, যিনি বাংলার টেরাকোটা মন্দির নিয়ে এবারের দেশে লিখেছেন?’ 

‘ওহ হো, আপনিও পড়েছেন বুঝি? না না, ইনি অন্য কেউ। মন্দির নিয়ে আমার কোনও ইন্টারেস্টই নেই। আমি গিরিডিতেই জন্মেছি বলে শুধু এই মন্দিরটার কথা জানি।’ 

‘আই সি!’ ডেভিডকে যেন একটু অন্যমনস্ক শোনাল। তারপর অবশ্য হেসে বললেন, ‘ঠিক আছে। সন্ধ্যাবেলা তাহলে দেখা হচ্ছে আবার, আপনারা রায়বাড়িতে আসছেন বললেন তো। টেক কেয়ার মিস্টার গাঙ্গুলি!’

‘থ্যাঙ্ক ইউ ডেভিডবাবু, সো কাইন্ড অফ ইউ!’ জটায়ুর একগাল হাসি দেখে বেশ বোঝা গেল এরকম সহৃদয় সাহেব দেখে তিনি বেশ ইমপ্রেসড।  



লালমোহনবাবু সামান্য খোঁড়াচ্ছিলেন বলে আমরা জঙ্গলের মধ্যে না ঢুকে উশ্রী নদীর তীরে গিয়ে বসলাম। উশ্রীর বালির চর একেবারে ধবধবে সাদা। আমরা যেখানটা বসেছি সেখান থেকে আবার একটা তারের পুল দেখা যাচ্ছে। 

‘বর্ষার সময় কিন্তু এই উশ্রীকে চিনতে পারবেন না। বন্যার তোড়ে কতবার যে এই পুল ভেঙেছে তার ইয়ত্তা নেই।’ জানালেন হিতেনবাবু। 

‘বাব্বা! বন্যা কি ফি-বছর হয় নাকি? এত মনোরম পরিবেশ, দেখে মনে হয় বিপদের কোনও সম্ভাবনাই নেই।’

লালমোহনবাবুর কথা শুনে একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন হিতেন সান্যাল।

‘দুনিয়ার কোন জায়গায় বিপদ আসে না বলুন তো! ইন ফ্যাক্ট, একটি বিশেষ বিপদের কথা প্রদোষবাবুকে না বললেই নয়।’ 

ফেলুদা সোজা হিতেন সান্যালের দিকে তাকিয়ে আছে, ‘বিপদটা কার? আপনার?’

‘আজ্ঞে না, আমার নয়। তবে যার বিপদ আপনারা তাঁকে চেনেন।’ ভদ্রলোক হাত কচলাচ্ছেন, আসল কথাটা যেন বলি বলি করেও বলে উঠতে পারছেন না।

ফেলুদার ভুরু কুঁচকে উঠেছে, ‘সুধাংশুবাবুর কথা বলছেন কি?’

ভদ্রলোক একটু ফ্যাকাশে হাসলেন, ‘ঠিক ধরেছেন। সুধাংশুবাবুর কথাই বলছিলাম। জানি উনি আপনাদের নিজে থেকে কিছু বলেননি, কিন্তু আমার অন্নদাতা তো, একটা গ্র্যাটিচিউড ফ্যাক্টর কাজ করে বুঝতেই পারছেন। তাই জন্যই ভাবছিলাম আপনাকে জানাই।’ 

‘আপনি নিশ্চিন্তে বলুন হিতেনবাবু। সুধাংশুবাবু ভরদ্বাজের কাকা, তা ছাড়া আমাদের হোস্ট-ও বটে। তাঁর কোনও বিপদ ঘটে থাকলে সাহায্য তো করতেই হবে।’ 

‘বিপদ ঘটে গেছে কি ঘটতে চলেছে সেটাই অবশ্য বুঝতে পারছি না। আজ থেকে মাসখানেক আগে আমি ওঁর অফিসে ঢুকেছিলাম একটা ফাইল আনতে। ওঁর টেবিলের ড্রয়ার থেকে ফাইল বার করতে গিয়ে আমার হাতে একটা কাগজ উঠে আসে। কাগজটায় একটা চিঠি লেখা হয়েছে আর সেই চিঠিতে…’, হিতেন সান্যালের গলাটা একটু শুকনো লাগছে কি? ‘সেই চিঠিতে স্পষ্টতই ওঁকে ব্ল্যাকমেল করা হয়েছে!’

‘সর্বনাশের মাথায় বাড়ি, গিরিডিতেও ব্ল্যাকমেল! কে লিখেছে সেই চিঠি?’ লালমোহনবাবু্র গলাতে উত্তেজনার ছোঁয়া, সেটা অবশ্য নতুন রহস্যের আবির্ভাবে না এই মনোরম পরিবেশে বিপদের কথা শুনে সেটা ধরতে পারলাম না। 

‘কী করে বলি বলুন তো কে লিখেছে সে চিঠি। আমার জ্ঞানত সুধাংশুবাবুর কোনও শত্রু নেই বলেই জানি।’

‘চিঠির বয়ানে কী ছিল?’ জিজ্ঞেস করল ফেলুদা। 

‘চিঠি বলা বোধহয় উচিত হবে না, একটা লাইন মাত্র লেখা ছিল– যে ভুল করেছ তার সাজা পাওয়ার জন্য তৈরি হও।’ 

ফেলুদা একমনে ওর পায়ের বুড়ো আঙুলটা দিয়ে বালি খুঁড়ছে, ‘সুধাংশুবাবু বোধহয় জানেন না যে আপনি চিঠিটা দেখেছেন?’

‘না। আর সেইজন্যই ইয়ে, মানে বুঝতে পারছিলাম না আপনাকে বলাটা উচিত হবে কি না। কিন্তু পরে ভাবলাম ওঁর সত্যি কোনও বিপদ হয়ে গেলে নিজেকে ক্ষমা করতে পারব না।’  

অনেকটা দূরে রেলপুলের ওপর দিয়ে ট্রেন গেল বোধহয়, একটা গুমগুম শব্দ শুনতে পেলাম। ফেলুদা সামান্য অন্যমনস্ক ভাবে সেদিকে তাকিয়ে ছিল, তারপর সংবিৎ ফিরে পেয়ে বলল, ‘আপনি বলে ভালোই করেছেন হিতেনবাবু। হ্যাঁ, ব্যাপারটা একটু ট্রিকি, বিশেষত সুধাংশুবাবু নিজে যখন এ ব্যাপারে কোনও কথা আমাকে বলেননি। দেখি এ রহস্য কিছু উদ্ধার হয় কি না।’ 

লালমোহনবাবু কিছু একটা বলার জন্য মুখ খুলছিলেন, ফেলুদা মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘আমার বন্ধুটির যা অবস্থা দেখছি, মনে হয় না আজ আর বিশেষ কিছু করা যাবে। আপনি বরং বারগণ্ডায় ফিরে যান হিতেনবাবু। আমরা আরও কিছুক্ষণ উশ্রীর ধারে বসে মকৎপুরের বাজারটা ঘুরে বাড়ি ফিরব।’

হিতেনবাবু একটু কিন্তু কিন্তু করছিলেন, তবে ফেলুদার অনীহা দেখে আর জোর করলেন না। যাওয়ার সময় বলে গেলেন আগামী কাল উশ্রীর অন্য দিকটা ঘুরিয়ে দেখাবেন। আর ওঁর বাড়ির ফোন নম্বরটাও দিয়ে গেলেন। 


‘আমি কিন্তু মশাই একেবারে ফিট। পায়ে আর কোনও ব্যথা নেই।’ এতক্ষণে মুখ খুলতে পেরেছেন লালমোহনবাবু।

‘জানি, এবার উঠে পড়ুন।’ ফেলুদা নিজেও উঠে দাঁড়িয়েছে। 

‘উঠে পড়ব?’ জটায়ু হকচকিয়ে গেছেন, ‘এই যে বললেন উশ্রীর ধারে আরও বসব কিছুক্ষণ?’ 

‘উশ্রীর ধারে বসে বালি খোঁড়ার থেকে একবার জঙ্গলে ঢুকলে ভালো হয় না? নীল আকাশের নিচে এই কটকটে আলোয় আর কতই বা রহস্য-রোমাঞ্চের উপাদান পাবেন?’

লালমোহনবাবুর চোখ জ্বলজ্বল করছে, ‘সাসপিশাস কিছু খুঁজে পেলেন নাকি ফেলুবাবু?’

‘সাসপিশাস কি না জানি না, তবে একটা জিনিস মিলছে না। আর সেটা মেলানোর জন্য একবার মন্দিরটা দেখে আসা দরকার।’ 

তারের পুলে ওঠার পরেই অবশ্য লালমোহনবাবুর উৎসাহে একটু ভাটা পড়ল, ‘এ তো বিস্তর নড়বড় করছে। ভাই তপেশ, তুমি একটু পাশে পাশে থাকো দিকিন। নিতান্তই যদি ভেঙে পড়ে তাহলে অন্তত হাতটা ধরার সুযোগ পাব।’ 

ফেলুদা সামান্য এগিয়ে গেছিল, কিন্তু লালমোহনবাবুর কথাটা ওর কানে গেছে। মাথা ঘুরিয়ে বলল, ‘বন্যা না এলে চিন্তা নেই আপনার। নড়বড় করছে না, নড়ছে। আর নড়ছে মানে পুলটা ফ্লেক্সিবল আছে, সেটা না থাকলেই বরং বিপদ।’

‘বোঝো! বিজ্ঞান কী জিনিস মশাই!’ মুখে বললেও জটায়ু বিজ্ঞানের ওপর খুব যে ভরসা রাখতে পারলেন তা নয়। পুলের বাকি পথটা চোখ বুজে পার হচ্ছেন দেখে আমাকে বাধ্য হয়েই ওঁর একটা হাত ধরে থাকতে হল। পুলের ওপর হোঁচট খেয়ে পড়লে কেলেঙ্কারির একশেষ হত। 

পুল পার হওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই জঙ্গল শুরু হয়েছে। অবশ্য এ জঙ্গল ডুয়ার্সের জঙ্গল নয়। নিকষ অন্ধকার ব্যাপারটা এখানে নেই। তা ছাড়া জঙ্গলের মধ্যেই চড়াই-উতরাই হয়েছে। গাছগুলোও বেশ কিছু চিনতে পারলাম। শাল বা পলাশ না চেনার তো কোনও কারণ নেই। ঝুপসি হয়ে ওঠা আর-একরকম গাছে থোকা থোকা ফল কলার কাঁদির মতন ঝুলছে। ফেলুদা বলল এটা মহুয়া গাছ।

জটায়ু এতক্ষণ চুপ করে জঙ্গলের সৌন্দর্য উপভোগ করছিলেন। মহুয়া শুনে বললেন, ‘এই গাছের ফল খেতেই ভাল্লুকরা আসে না? ফল কি মশাই মাটি থেকে কুড়িয়ে খায় না গাছখানা ঝাঁকিয়ে?’

‘ফল পড়ে না থাকলে ঝাঁকিয়েই খায় নিশ্চয়’, ফেলুদা একবার আড়চোখে লালমোহনবাবুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ঝাঁকিয়েও না পেলে শুনেছি গাছেই উঠে পড়ে।’  

‘প্রাণ বাঁচানোর তো কোনও পথই খোলা নেই দেখছি’, লালমোহনবাবু খানিকটা জোর করে হাসতে গিয়ে সামনে কিছু একটা দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। ফলে ওঁর ‘হেঁহ্’টা কীরকম ‘এঁহ’-এর মতন শোনাল। আমরা একটা সুঁড়িপথ ধরে এগোচ্ছিলাম, সেটা এবার শেষ হয়েছে। আর সামনেই দেখা যাচ্ছে একটা মন্দিরের ভগ্নাবশেষ।  

আর-একটু এগোতে বোঝা গেল মন্দিরের যেটুকু দাঁড়িয়ে আছে তারও বেশ জরাজীর্ণ অবস্থা। মন্দিরের বাইরের দেওয়াল প্রায় ধ্বসে পড়েছে, মূল দরজার চারপাশে অগুনতি আগাছা। মন্দিরের ভেতরে ঢুকে বোঝা গেল ভেতরেও অজস্র শেকড় গজিয়ে আছে, অন্ধকারের মধ্যে যেটুকু দেখা যায় তাতে মনে হচ্ছে ভেতরের দেওয়ালগুলোর রং নিকষ কালো। এতটাই কালো ভেতরের দিকে যে ঠিক কতটা যাওয়া যায় সেটাও বোঝা যাচ্ছে না। 

এত অন্ধকারের মধ্যে লালমোহনবাবু একটু ঘাবড়ে গেছিলেন। আমাকে ফিসফিস করে বললেন, ‘তোমার দাদা আবার কোথায় গেলেন তপেশ? উনি থাকলে, বুঝলে কিনা, একটু ভরসা পাই।’

সত্যি তো, ফেলুদা গেল কোথায়! আমাদের সঙ্গে তো ঢোকেনি। বাইরে এসে বার দু-এক ডাকডাকি করার পর দেখি মন্দিরের পেছনে একটা ঢিবি বেয়ে নেমে এল। জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিলাম ঢিবির ওদিকটায় কী আছে, দেখি ফেলুদা উলটে আমাকেই প্রশ্ন করছে, ‘অঙ্কগুলো ধরতে পারলি?’ 

এখানেও অঙ্ক! 

‘ফলকগুলো দেখিসনি বোকচন্দর? সব প্যাটার্নে বসানো, খাপে খাপ। একেবারে ওপর থেকে দেখতে শুরু কর।’

তাই তো! যেরকম লম্বাটে ইট আমরা দেখে থাকি সেরকম কিছু আছে বটে, কিন্তু চৌকো, তেকোনা ইট-ও রয়েছে। এমনকি গোলচে ইটও চোখে পড়ল। মন্দিরের দেওয়ালে নকশা ফুটিয়ে তোলার জন্য শিল্পীরা যেন কঠিন সব অঙ্ক কষে এক সাইজের সঙ্গে আর-এক সাইজ, এক আকারের সঙ্গে আর-এক আকার জুড়েছেন।  

ইটের কথা বলতে ফেলুদা ছোট্ট করে একটা গাঁট্টা মেরে বলল, ‘টেরাকোটা আর ইট কিন্তু এক নয়। টেরাকোটার ইট বলে বটে কিন্তু মেটেরিয়ালটা আলাদা।’

লালমোহনবাবু এর মধ্যে আমাদের খুঁজতে ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন। ফেলুদার কথা শুনে বললেন, ‘টেরা কি আমাদের ট্যারা-র অপভ্রংশ ফেলুবাবু?’ 

‘এই টেরা লাটিন শব্দ লালমোহনবাবু। টেরা মানে মাটি আর কোটা, সেটাও একটা লাটিন শব্দের অপভ্রংশ বটে, মানে পোড়া। অর্থাৎ?’

‘পোড়ামাটি! পোড়ামাটির মন্দির তো ছোটো থেকে শুনছি মশাই, তাকেই যে টেরাকোটা বলে তা কি আর জানতুম!’ লালমোহনবাবুর মুখ উদ্ভাসিত, ‘কিপলিং সাহেবের বইয়ে পড়লেন বুঝি?’

ফেলুদার মুখটা সামান্য গম্ভীর, ‘কিপলিং সাহেব টেরাকোটা নিয়ে কিছু বলেননি, তবে মনে হচ্ছে রহস্য সন্ধানে ভদ্রলোক কাজে আসবেন।’

লালমোহনবাবুর মুখ হাঁ হয়ে গেল, ‘বলেন কী! সুধাংশুবাবুর ব্ল্যাকমেল রহস্যের চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে কিপলিং সাহেবের বইয়ের পাতায়?’

ফেলুদা আরও অবাক হয়ে তাকাল, ‘ব্ল্যাকমেল? আরে না মশাই, সে চিঠির কথা ভুলেই গেছিলাম।’ বলেই কীরকম অন্যমনস্ক হয়ে পড়ল।

আমি জানি ওর মনের মধ্যে গভীর কিছু চিন্তাভাবনা চলছে। তাই ইচ্ছে থাকলেও আর জিজ্ঞাসা করা গেল না ঢিবির ওদিকে কী দেখতে গেছিল। লালমোহনবাবু আমার কানে ফিসফিস করে বললেন, ‘এবারে কি ডবল রহস্যে জড়িয়ে পড়ছি তপেশ?’

আমিও বুঝতে পারছি না ফেলুদা ঠিক কী ভাবছে। আপাতত ও একটা ডায়রি বার করে কীসব নোট নিতে শুরু করেছে। কী যে লিখছে সেটা আর সাহস করে দেখে উঠতে পারলাম না। 


[ক্রমশ]


........................ 

অলংকরণ : অভীক কুমার মৈত্র 



#ফেলুদা #সত্যজিৎ রায় #প্রবীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় #টেরাকোটা টালমাটাল #উপন্যাস #প্যাস্টিশ #silly পয়েন্ট #ওয়েব পোর্টাল

Leave a comment

All fields are required. Comment will appear after it is approved.

trending posts

newsletter

Connect With Us

today's visitors

44

Unique Visitors

121567