শরীর ও মন

চারদিকে বিচারকের হাতুড়ি : একটি ‘জাজমেন্টাল’ সমাজ ও আমরা

দোয়েল ঘোষ Jan 30, 2022 at 9:02 am শরীর ও মন ২৭৩

আবছায়া সংকীর্ণ পথ ধরে ছুটে চলা। দুপাশের দেওয়ালগুলো চেপে ধরছে। শ্যাওলায় স্যাঁতস্যাঁতে দেওয়াল বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে কত আর ছোটা যায়! চারদিকে জোড়া জোড়া চোখ। অশরীরী, নিষ্পলক। অনবরত দেখে যাওয়ায় কোনও ক্লান্তি নেই তাদের। ক্লান্তি যত শুধু আমার। একটু বিরাম চায়। এ জীবদ্দশায় কি এরা বিশ্রাম দেবে?

জন্ম থেকে মানুষ মা, বাবা, বন্ধু, আত্মীয়-পরিজনের সঙ্গে পায় একগুচ্ছ বিচারকমণ্ডলী। সার সার দিয়ে তারা বসে আমাদের সামনে। আমরা প্রত্যেকে যেন এক মুক্তমঞ্চে স্পটলাইটের নিচে।  আমাদের রং, ত্বক, চুল, উচ্চতা, লিঙ্গ, অঙ্গভঙ্গি, প্রেম-অপ্রেম, ক্ষমতা, যোগ্যতা - সর্বস্ব নিয়ে চুলচেরা বিচার হচ্ছে। এত দৃষ্টি, এত ক্যামেরার ঝলকে আমরা কুঁকড়ে যাচ্ছি। গ্লানি, জড়তা, কুণ্ঠা, ভয় ঘিরে ধরছে। প্রতি মুহূর্তে ভালো-মন্দের dichotomy-তে এক পায়ে দাঁড়িয়ে ক্লান্ত। ক্লান্তিরও ক্ষমা নেই। তারও বিচার আছে। কতটা ক্লান্তি উচিত আর কতটা হলে বাড়াবাড়ি? কতটা সহ্য করার পর থামা যায়? থামা কি আদৌ উচিত? এসব প্রশ্নের কোনও উত্তর নেই। উত্তর হয় না। জেগে থাকে শুধু দ্বন্দ্ব। জমতে থাকে নিজের ওপর অবিশ্বাস, অনাস্থা। 

অদ্ভুত ক্ষমতা এই বিচারবাদের। সমস্ত সত্তা দিয়ে এই মানুষগুলোকে ঘৃণা করতে ইচ্ছে করবে। তবু এরাই তো আমার আপনজন। নিজের অজান্তেই কখন ‘ওদের’ দলে নাম লিখিয়ে ফেলি। ‘ওরা’ আর তখন ওরা থাকে না। ওদের চোখ-মুখগুলো বদলাতে বদলাতে আমার মতো হয়ে যায়। আমার দুটো চোখ ‘ওদের’ মতো জ্বলে। মেপে নিই পাশের বাড়ির চাকরি পেতে দেরি হওয়া যুবক বা তিরিশ পেরোনো, বিয়ে না-হওয়া যুবতীকে, কিংবা বাচ্চা না-নেওয়া দম্পতিকে। জন্ম ইস্তক সবকিছুর জন্য একটা নির্ধারিত সময়সীমা মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। সেই সময় পেরোলেই আমরা হাততালি দিয়ে উঠি। উচিত-অনুচিতের যে দুর্দম শিক্ষা নিজেদের ভিতরে নিয়ে দগ্ধে দগ্ধে বাঁচছি, তার কিছুটা আঁচ ওদের সঙ্গেও ভাগ করে নিতে চাই। ওদেরও দহনজ্বালা দিতে চাই। ওদের মনে তৈরি হওয়া অস্বস্তি, কষ্ট, হীনমন্যতা, আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি - এসবই তো সেই মুহূর্তে আমার খাদ্য, আমার পরিতৃপ্তি। কাল আমি যে মহিলাকে বলেছি, “চেহারার যা হাল হয়েছে! যোগ ব্যায়াম আর ডায়েট করো। আর হাজব্যান্ডকে একটু নজরে নজরে রেখো” - আজ সে তার চাকরি করা বউদিকে আচ্ছা করে কথা শুনিয়েছে। ছেলেমেয়ে কী করে মানুষ করতে হয়, কাজের লোকের হাতে সংসার ছেড়ে চাকরি করলে সংসার ভেসে যায়, বৃদ্ধা মা-কে শেষ বয়সে বিনা সেবা-শুশ্রূষায় মরতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। এভাবেই আমরা দলে দলে বেড়ে উঠি। রক্তবীজের মতো বাড়তে থাকে বিচারকমণ্ডলী। 

এটাই মজা এই খেলার। আপনি যদি ভাবেন কুকথা, বঞ্চনা, discrimination, judgement আপনাকে সহানুভূতিশীল করবে এবং তাতে আপনি অন্যের দুঃখ-কষ্ট উপলব্ধি করতে পারবেন - তাহলে আপনি ভুল ভাবছেন। ওই judgement আপনাকে হীন বোধ করিয়েছে। তাতে আপনার রাগ হবে। সেই রাগ আপনি positively channelize করতে পারেন। কেউ কেউ তা করেও। রুখে দাঁড়ায়, advocacy করে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমরা সে রাগকে সুযোগমতো চাপিয়ে দিই অন্য মানুষের ঘাড়ে। আমি হীন? তুমি তবে হীনতর। তাহলে আমি একটু হলেও superior তো?  বিষয়টা আসলে ক্ষমতা অনুভব ও প্রদর্শনের। গায়ের রঙে টেক্কা দিলে কী হবে, চুলে তো আমি ওকে বলে বলে পাঁচ গোল দেব। ওর থেকে নোটস নিয়ে পরীক্ষায় পাস করতে হল আমায়? বেশ। পুজোর তিনদিন তিনজন বান্ধবীকে পাশে রাখব। শেষের দিন ছোট্ট করে শুনিয়ে দেব, “আমার সঙ্গে জিম জয়েন কর, পরের পুজোয় তোর একটা ব্যবস্থা করে দেব ঠিক”। এ মশাই এক নেশার মতো। পাশের লোকটার চেয়ে বড় দেখাতে হবে আমায়। ক্ষমতাবান দেখাতে হবে। 

আপনি ‘জাজমেন্টাল’? সবচেয়ে ক্ষতি হচ্ছে আপনার নিজেরই : জানাচ্ছে গবেষণা // শ্রীপর্ণা সেনগুপ্ত

আসলে এ এক অস্তিত্ব রক্ষার খেলা। আমি যদি ঠিক-বেঠিক নির্ধারণ না করতে থাকি তাহলে আমি যা যা করেছি, করে চলেছি, বিশ্বাস করে আসছি, সে সব ভুল প্রমাণ হয়ে যাবে। কী হবে আমার sacrifice-গুলোর? লেখার স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে দশটা-পাঁচটার চাকরি নিলাম, নিতে বাধ্য হলাম। সে কি ভুল? কিংবা চাকরি ছেড়ে সংসারে মন দিলাম, সে কি ভুল? প্রয়োজন ছিল না? চলতে পারতাম নিজের মনের মতো করে? এতগুলো রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করতে পারতাম? পারলাম না যে, এ অবসাদ রাখব কোথায়? জন্ম থেকে সমস্ত মেনে নেওয়া আর মানিয়ে নেওয়ার পাঠগুলোকে নস্যাৎ করে নিজের মতো একটা জগৎ তৈরি করে নিতে পারলাম না, এই কষ্ট আমি অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে না দিলে কীভাবে থাকব? এমন একটা জগত কে না চাইবে যেখানে মানুষের হাতে হাতে বিচারকের হাতুড়ি নেই, গা পুড়িয়ে দেয় না শ্লেষ! একটা হাত পেলে, চোখে দীপ্তি পেলে, আলোর আরাম পেলে হয়তো আমিও পারতাম এই আগ্রাসী অমানবিকতার আবর্ত থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে নিতে। সমাজ তো আমার সেই মেরুদণ্ডটাই তৈরি হতে দেয়নি যেখানে আমি আমার ভালো-মন্দ বেছে নিতে পারি নিজের মতো করে। চারপাশের সবার মেপে দেওয়া ঠিক বেঠিকের স্কেলেই তাই নিজেকেও মাপা, অন্যকেও।  

নিজের পছন্দ-অপছন্দগুলোও যে একটা সামাজিক নির্মাণ, এটা সমাজ বুঝতে দেয় কই? ফলে আমি সত্যিই অন্য কেউ নই, আমি সবাই। নিজের অজান্তেই আমরাও ঢুকে পড়ি চক্রব্যূহে। আমরা তো অভিমন্যু। বেরোনোর পথ জানা নেই। দেখা যাবে হয়তো নিজের ভেবে সমাজের থেকে উত্তরাধিকারে পাওয়া মাপযন্ত্রে অন্যকে মাপতে মাপতে আসলে দগ্ধ করছি নিজেরই আত্মাকে। বড় অদ্ভুত এ খেলা। এখানে নিজেও নিজের প্রতিপক্ষ। এ খেলায় কারও জিত নেই। 


#সমাজ #সামাজিক চাপ #মানসিক স্বাস্থ্য #শরীর ও মন #সিলি পয়েন্ট #societal pressure #discrimination #peer pressure #silly point #portal #দোয়েল ঘোষ #বাংলা পোর্টাল

Leave a comment

All fields are required. Comment will appear after it is approved.

trending posts

newsletter

Connect With Us

today's visitors

53

Unique Visitors

121577