নিবন্ধ

খ্যাতির লোভে খুন : মার্জার থেকে মানুষ

সায়নদীপ গুপ্ত June 5, 2021 at 8:42 am নিবন্ধ

১ মিনিট ২৭ সেকেন্ডের একটা ভিডিও। পুঁচকে দুটো বিড়াল খেলা করছে স্ক্রিন জুড়ে। ফেসবুক, ইন্সটাগ্রামে হামেশাই এরকম দেখি আমরা; দেখি আর ‘লাভ রিয়্যাক্ট’ দিই। তাই ২০১০-এ ক্রিসমাসের কদিন আগেই যখন ইউটিউবে “ওয়ান বয়, টু কিটেন্‌স” নামে এমন একটা ভিডিও শেয়ার করা হল, প্রথমে সবাই খুশি মনেই দেখতে শুরু করেছিল। একজন লোক, মুখাবয়ব স্পষ্ট বোঝা যায় না, বিড়াল দুটোকে বিছানায় নিয়ে খেলতে থাকে, খেলাচ্ছলে তাদের ঢুকিয়ে দেয় প্লাস্টিকের ভ্যাকুয়াম ব্যাগে। ব্যাগের মুখ আটকে, একটু একটু করে ভ্যাকুয়াম পাম্পের মাধ্যমে হাওয়া বের করে নিতে থাকে, মরে শক্ত হয়ে যায় ছানা দুটো।

২০১২ সালের মে মাস, ইন্টারনেটে প্রকাশ পেল “ওয়ান লুনাটিক, ওয়ান আইস-পিক” ভিডিও। বিছানা জুড়ে রয়েছে হাত-পা বাঁধা একটি মানুষ। আরেকটি লোক, অবয়ব দেখলেই মনে পড়ে যায় দু’বছর আগের একটি ভিডিওর কথা, এসে অচিরেই একটা আইস-পিক দিয়ে বারংবার আঘাত করতে থাকে বিছানায় বাঁধা শরীরটার উপর। একসময় সব প্রতিরোধ শেষ হলে, ধারালো ছুরি দিয়ে ফালাফালা করতে থাকে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। 

কম্পিউটারের পোকা বলতে যা বোঝায়, ডিয়ানা থমসন আদতে ঠিক তাই। কর্মসূত্রে সে লাস ভেগাসের এক ক্যাসিনোর ডেটা অ্যানালিস্ট, অবসর কাটায় কুকুর আর কম্পিউটার নিয়ে। ২০১০-এর ডিসেম্বরে অনেকের মতোই সেও দেখেছিল ভিডিওটা, বুক-পেট গুলিয়ে উঠেছিল তার। এত নৃশংস হতে পারে মানুষ? সেই সঙ্গে কেন জানি তার মনে হয়েছিল, এটা শুধুই ট্রেলার। সকলের মতো সেও এত রেগে ছিল, আসল দোষীকে খুঁজে বের করার একটা ফেসবুক গ্রুপে নাম লেখাতে দুবার ভাবেনি। ছদ্মনাম অবশ্য। 

আর পাঁচটা গ্রুপের মতো এখানকার সদস্যরা মিম শেয়ারে সময় নষ্ট করতে রাজি ছিল না, তাদের একটাই লক্ষ্য– যেভাবে হোক, খুনির সম্পর্কে তথ্য জোগাড় করা। হোক না বিড়াল, এত অনায়াসে প্রাণ নিতে পারার কোনও শাস্তি নেই? দেখা গেল, এই কাজে সর্বাধিক উদ্যম আর দক্ষতা দুজনের– লাস ভেগাসের ডিয়ানা আর লস অ্যাঞ্জেলিসের জন গ্রিন। তারা মানুষ ছেড়ে নজর দিল ভিডিওর মধ্যে থাকা অন্যান্য জিনিসে। বিছানার চাদর, বেডসাইড টেবিল, দরজার হাতল– সবকিছু নিয়ে চলল চুলচেরা বিশ্লেষণ। নির্দিষ্ট প্রিন্টের একইরকম চাদরের খোঁজ পাওয়া গেল কেনাকাটার ওয়েবসাইটে, বিক্রি হয়েছে মাত্র একটি! কিন্তু ক্রেতার হদিশ অধরা। ভিডিওর মধ্যে ভেসে আসা কথাবার্তার আওয়াজ ঘেঁটে জনৈক সদস্য উদ্ধার করল রাশিয়ান বাক্যালাপ। তবে কি...? না, অচিরেই বোঝা গেল, তদন্তকে বিপথে চালাতে রাশিয়ান টিভি প্রোগ্রাম চালিয়ে রেখেছে খুনি। এবার উপায়? 

উপায় এল, তবে চরম আঘাত নিয়ে। নতুন ভিডিওতে দেখা গেল, মরে যাওয়া বিড়ালছানা নিয়ে খেলা করছে এক পুরুষের অবয়ব, প্রযুক্তিগত ভাবে মুখ অস্পষ্ট করা। গা ঘিনঘিন করে উঠলেও গ্রুপের সদস্যরা হাল ছাড়ল না। আবার ভিডিওর ফ্রেম ধরে ধরে এক-একটা ক্লু বিশ্লেষণ করা শুরু হল, নজরে এল বিছানায় পড়ে থাকা এক প্যাকেট মার্লবোরো সিগারেট। ধূমপায়ী মাত্রেই জানেন, দেশভেদে সিগারেটের ধরন বদলায়; মার্লবোরোর প্যাকেটের গায়ের বিধিসম্মত সতর্কীকরণ দেখাল, এ জিনিস খাঁটি উত্তর আমেরিকান। ঘরের কোণে পড়ে থাকা হলুদ ভ্যাকুয়াম ক্লিনার দেখে অনলাইনে সার্চ করতেই ডিয়ানা পেয়ে গেল তার ছবি, মডেল নম্বর, দোকানের খোঁজ আর সেই সঙ্গে একটা তথ্য– এই নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড শুধু উত্তর আমেরিকাতেই বিক্রি হয়! অন্যদিকে শুরু হয়েছে একের পর এক জাল প্রোফাইলের উৎপাত। অবস্থা এমন জায়গায় গেল, নামিবিয়ার এক তরুণকে আসল খুনি ঠাউরে বসল অনেকেই। আশ্চর্যের বিষয়, এরকমই এক জাল অ্যাকাউন্ট থেকে ভাসিয়ে দেওয়া হল সম্ভাব্য একটা নাম– লুকা ম্যাগনোটা। 

লুকা ম্যাগনোটা – নামটা লিখে গুগল করতেই সব ঘেঁটে গেল ডিয়ানার। এ যেন তথ্যের পারমাণবিক বিস্ফোরণ! একের পর এক ছবি, গসিপ কলাম, ফ্যান পেজ– সবকিছু জুড়ে লুকা ম্যাগনোটা। কখনও সে আইফেল টাওয়ারের নিচে আইসক্রিম খাচ্ছে, কখনও ভিয়েতনামের হ্রদে সাঁতার কাটছে, এইমাত্র দামি গাড়ি থেকে নামছে তো পরমুহূর্তেই মডেলিং-এর পোজ দিচ্ছে– মানুষ না পেজ-থ্রি, বোঝা দায়! ডিয়ানা আর জন নাওয়াখাওয়া ভুলে লেগে গেল হাবিজাবি খড়গাদায় সত্যের সুচ খুঁজতে। গুগলে গিয়ে ‘রিভার্স ইমেজ সার্চ’ করতেই ধরা পড়ে গেল ইন্টারনেটের গলিঘুঁজি থেকে নেওয়া বিভিন্ন ছবিতে লুকার মুখ বসিয়ে দেওয়ার কারসাজি। একের পর এক ফ্যান-সাইট আর গসিপ কলাম ঘেঁটে ডিয়ানা দেখল মোটামুটি শ-খানেক জাল প্রোফাইল– প্রত্যেকের বক্তব্য এক, বাক্যগঠনের ধরন এক, এমনকি যতিচিহ্নের প্রয়োগও এক! অর্থাৎ সবকিছুর পিছনে একটিই মাথা– লুকা। দেখতে যদিও ভ্যাকুয়াম-কিলারের মতোই, তবু লুকা খুনি কি না সে ব্যাপারে নিঃসংশয় হওয়া গেল না। না গেলেও তার প্রচারসর্বস্ব, খ্যাতি-বুভুক্ষু ছবিটা সামনে এল। সে ছবি আরও স্পষ্ট হল ২০০৭-এ লুকার এক সাক্ষাৎকারে, যেখানে সে সাংবাদিক জো ওয়ার্মিংটনকে দাবি করে সবাই নাকি তাকে কার্লা হোমোলকা-র প্রেমিক বলে গুজব রটাচ্ছে, সেই চক্করে তার মডেলিং কেরিয়ার ক্ষতির গ্রাসে। 

কার্লা হোমোলকা? কানাডার কুখ্যাত সিরিয়াল কিলার, যে কিনা স্বামীর সঙ্গে জুটি বেঁধে খুন করেছিল বোন সমেত চারজন কিশোরীকে? এমনতর পছন্দ দেখে সন্দেহ আরও গাঢ় হল। অন্যদিকে কানাডিয়ান টিভি শো ‘কভার গাই’-এর অডিশন ভিডিওতে লুকাকে দেখে বোঝা গেল, কানাডা-ই এর সাকিন। জন গ্রিন আরও এক ধাপ এগিয়ে ইন্টারনেটে প্রাপ্ত লুকার প্রতিটা আসল ছবির EXIF ডেটা খুঁড়ে বের করল ভৌগোলিক অবস্থান। তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে লুকার ছবিতে পাওয়া প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয়– গ্যাস স্টেশন, বাস স্টপ– সবকিছুকে নজর করে গুগল ম্যাপের সাহায্যে জন বের করে ফেলল টরন্টো শহরে লুকার আবাসনের ঠিকানা!   

অতঃকিম? টরন্টো পুলিশকে জানিয়ে রাখা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না শখের গোয়েন্দাদের। পুলিশ অবশ্য লুকার খোঁজ করেছিল; সত্যিই ওই আবাসনে লুকা থাকত, কিন্তু সম্প্রতি নাকি সে রাশিয়া চলে গেছে। সেটা ছিল ২০১১ সালের মার্চ মাস। দীর্ঘ বেশ কিছুকাল লুকার আর কোনও খোঁজ মেলেনি। 

ডিসেম্বর ২০১১; মোটামুটি যখন সবকিছু ঝিমিয়ে এসেছে, একের পর এক ভিডিও আছড়ে পড়ল ইন্টারনেটে। প্রথম ভিডিওতে একটা বিড়ালছানাকে বাথটবের জলে ডুবিয়ে মারা হল আর দ্বিতীয় ভিডিওতে আরেকটি বিড়ালকে ছেড়ে দেওয়া হল একটা পাইথনের মুখে! ক্ষোভ, কষ্ট আর ঘেন্না যেন পিত্তি পাকিয়ে উঠে এল সবার গলায়। লুকার অবয়ব বোঝা গেলেও হাত কামড়ানো ছাড়া কিচ্ছুটি করার ছিল না তখন। ব্রিটেনের ‘দ্য সান’ পত্রিকায় এই সংবাদ প্রকাশিত হলে কেউ একজন খবর দেয়, লুকা আছে লন্ডনেরই এক হোটেলে। সাংবাদিক অ্যালেক্স ওয়েস্ট তার সঙ্গে দেখা করলে সে সব অভিযোগ অস্বীকার করে, কিন্তু অ্যালেক্সের মতে, “প্রতিবার অস্বীকার করার সময় লুকার চোখেমুখে ছিল এক অদ্ভুত পরিতৃপ্তি”। দুদিন পর, পত্রিকার দফতরে এল এক হুমকি চিঠি, যাতে লেখা ছিল– হাজার চেষ্টা করলেও কিছুই হবে না, পরের বার মার্জারের জায়গা নেবে মানুষ। স্বাক্ষর, জন কিলব্রাইড। 

ক্রোধের আগুন জ্বলছিলই, এই ভয়ের ঘি-টুকুই যা বাকি ছিল। গ্রুপের সদস্যদের আশঙ্কা সত্যি করে খুনি এবার জঘন্যতম অপরাধের পথে পা বাড়াচ্ছে। সবাই আবার কাজে লেগে গেল, এক ইঞ্চিও জমি ছাড়া হবে না। কে এই জন কিলব্রাইড? ডিয়ানা আর জন গ্রিন খেয়াল করল নতুন ক্যাট-কিলিং ভিডিও যে প্রোফাইল থেকে পোস্ট করা হয়েছিল তার নামটা– লেসলি অ্যান ডাউনি। কিলব্রাইড ও ডাউনি, কেমব্রিজের কুখ্যাত সিরিয়াল কিলার জুটি ইয়ান ব্র্যাডি-মাইরা হিন্ডলির হাতে খুন হওয়া বাচ্চাদের মধ্যে দুজন। আত্মসর্বস্ব সিরিয়াল কিলার-প্রীতি আবারও সামনে নিয়ে এল একটাই নাম– লুকা ম্যাগনোটা। আবার শুরু হল সাম্প্রতিক ছবি ধরে ধরে বিশ্লেষণ। একটি ছবিতে গাছের নতুন পাতা বুঝিয়ে দিল বসন্ত এসে গেছে, আরেকটি ছবিতে বাতিস্তম্ভের এক বিশেষ আকার খোঁজ দিল মন্ট্রিল শহরের, সব শেষে গুগল স্ট্রিট ভিউ জানাল লুকা আছে মন্ট্রিলেই।

এরপর তিনমাস সব চুপচাপ।

অবশেষে সেই ২০১২-এর অভিশপ্ত মে। “ওয়ান লুনাটিক, ওয়ান আইস-পিক”। এত চেষ্টা করেও বাঁচানো গেল না একটা মানুষের প্রাণ! অথচ ইন্টারনেট যখন তোলপাড়, মন্ট্রিল পুলিশ তখনও কিছুই টের পায়নি। টের পেল তার কদিন বাদে, যখন ডিক্যারি স্ট্রিটের বহুতলের পিছন থেকে পাওয়া গেল দুর্গন্ধযুক্ত একটি স্যুটকেস ও ছোট-বড় মিলিয়ে খান-তিরিশেক জঞ্জালের বস্তা। বস্তাগুলো থেকে বেরোল ছুরি, জুতো, ইলেকট্রিক করাত, রক্তমাখা চাদর, ‘ক্যাসাব্লাঙ্কা’ সিনেমার পোস্টার, আর একটা মৃত কুকুর। স্যুটকেস খুলে যা পাওয়া গেল তা নিয়ে অবশ্য পুলিশের বিড়ম্বনা বাড়ল, কারণ তার না ছিল মাথা, না ছিল হাত বা পায়ের পাতা। ছিল শুধু একটা ক্ষতবিক্ষত মানবশরীর। ঝুলি থেকে আরও বেরোল, লুকা ম্যাগনোটার ড্রাইভিং লাইসেন্স আর তার নামে হোটেলের রসিদ। হায় মন্ট্রিল পুলিশ, লুকাকেই ভিক্টিম ভেবে হোটেলের ঘরে উঁকি দিল। সবকিছু সুন্দর সাজানো-গোছানো, কিন্তু কী যেন একটা অস্বাভাবিক! ঘরময় রাসায়নিকের গন্ধ কেন? তবে কি মুছে ফেলা হয়েছে কোনও কুকর্মের চিহ্ন? সিকিউরিটি ক্যামেরার ফুটেজে হোটেলের ময়লা ফেলার জায়গায় আগের দিন রাত পৌনে তিনটের সময় একের পর এক জঞ্জাল ফেলতে দেখা গেল এক ব্যক্তিকে; মাথায় টুপি, সহজে মুখ বোঝার উপায় নেই, কিন্তু আদলটা খানিক চেনা-চেনা! 

কানাডার কনজারভেটিভ পার্টির সদর দফতরে সকালের দিকে তেমন ব্যস্ততা নেই। একটা পার্সেল এল, খোদ দফতরের নামেই। যাচাই করার জন্য এক কর্মচারী সেটা খুললেন, পরমুহূর্তেই চিৎকার করে পিছিয়ে এলেন। থরথর করে শরীর কাঁপছে। মুখ ফ্যাকাশে। আর আধখোলা পার্সেল থেকে উঁকি মারছে একটা মানুষের কাটা পায়ের পাতা। পুলিশ দফতরে নিয়ে যাওয়ার পর অবশ্য পাওয়া গেল আরও একটি জিনিস। চার লাইনের কবিতা– 

“Roses are red/ violets are blue/ police will need dental files/ To identify you. 

Bitch”

এ যে খোদ সরকারকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া! যে পোস্ট অফিস থেকে পাঠানো হয়েছিল পার্সেল, তা খুঁজে বের করে ক্যামেরা-ফুটেজ দেখা হল। সেই হোটেলের ব্যক্তি, এবার আরও স্পষ্ট, আর কোনও ভুল নেই। লুকা ম্যাগনোটা। কিন্তু ও কী? ওর হাতে দুটো প্যাকেট না? 

পরের দিনই দ্বিতীয় প্যাকেট চলে এল লিবারাল পার্টির সদর দফতরে। উদ্ধার হল কাটা হাত। কিন্তু কে খুন হল, তাই তো বোঝা যাচ্ছে না! বোঝা গেল, ডিয়ানা-জনের বদান্যতায়। টরন্টো পুলিশের মারফত তারা মন্ট্রিল পুলিশকে পাঠাল সাম্প্রতিক ভিডিও লিংক। সভয়ে পুলিশ দেখল সেই হোটেলের ঘর, সেই খুন আর সবশেষে বাথটবের মধ্যে রাখা নিহতের কাটা মুন্ডু। এই প্রথম লাশ পেল তার পরিচয়– অভিবাসী এশিয়ান, জুন লিন। হোটেলের ফুটেজ থেকে সহজেই জুন লিন আর লুকাকে একসঙ্গে ঢুকতে দেখা গেল। ঘর তল্লাশি করে পাওয়া গেল জুন লিনের রক্ত, ব্লিচিং দিয়ে প্রমাণ লোপাটের স্বাক্ষর। লুকার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হল দ্রুত। 

এতকিছুর ধাক্কা সামলে উঠতে আমাদের ফেসবুক-ডিটেকটিভদের একটু সময় লেগেছিল। তা ছাড়া খুনি ধরার কাজ পুলিশই ভালো পারে। কিন্তু খুনি ধরা না হোক, খুনিকে খুঁজে পাওয়ার ব্যাপারে তারা সাহায্য তো করতেই পারে! গা-ঝাড়া দিয়ে উঠল ডিয়ানা, মন্ট্রিলের অনলাইন বিজ্ঞাপনের জায়গা থেকে খুঁজে বের করল কুকুর আর পুরুষ-সঙ্গী চেয়ে আলাদা দুটো দাবি। নামে আলাদা, কিন্তু লেখায়? তুখোড় ডেটা অ্যানালিস্ট ডিয়ানা এক লহমায় ধরে ফেলল দুই বিজ্ঞাপনের লেখার ধরন হুবহু এক, এমনকি লুকার বিভিন্ন জাল প্রোফাইলের সঙ্গেও প্রচুর সাদৃশ্য! জন গ্রিন আর তার সঙ্গীরা দেখাল বিখ্যাত সিরিয়াল-কিলার মুভি ‘আমেরিকান সাইকো’-এর শুরুর দৃশ্যের আবহে বাজছে একটি গান, ‘ট্রু ফেইথ’– যেমনটা বাজছিল লুকার মানুষ খুনের ভিডিওতে। লুকার মাত্রাতিরিক্ত খ্যাতির লোভ আর সিরিয়াল-কিলার সম্পর্কে নেশার ঘোর তাকে বাধ্য করেছে জায়গায় জায়গায় ক্লু ছড়িয়ে রাখতে। সে যেন চিৎকার করে বলতে চায়, “এসো, আমায় দ‍্যাখো, আমার শিল্প প্রত্যক্ষ করো”। এই সুযোগ ছাড়ল না জন, খুঁজতে লাগল আরও কোনও সিনেমার উল্লেখ। পেয়েও গেল, ‘ক্যাসাব্লাঙ্কা’র পোস্টার। সিনেমার শুরু আর শেষ দেখে আতঙ্কে পুলিশকে ফোন করল তারা– দু জায়গাতেই একটাই নাম। প্যারিস। 

মন্ট্রিল বিমানবন্দরে খবর পাঠানো হল। দেরি হয়ে গেছে, লুকাকে দেখা গেল দৃপ্ত পদক্ষেপে প্যারিসের ফ্লাইটে উঠতে। খবর গেল ইন্টারপোলে, আন্ডারকভার এক এজেন্টকে কাজে লাগিয়ে খুঁজে পাওয়া গেল লুকার প্যারিসের হোটেলের ঠিকানাও, কিন্তু পৌঁছনোর আগেই পাখি ফুড়ুৎ। পাওয়া গেল তার ফেলে যাওয়া পরিচয়পত্র আর ক্রেডিট কার্ড, জানা গেল হোটেলে পরিচয় দিয়েছে কে. ট্রামেল। অর্থাৎ পরিচয় মুছে ফেলার রাস্তায় কয়েক কদম এগিয়ে গেছে সে। পিছনে থেকে গেছে ইন্টারপোল।  

সবাই যখন মোটামুটি ভাগ্যের হাতে বিচারের দায় ছেড়ে চাপা ভয়ে দিন কাটাচ্ছে, ইন্টারনেটে আছড়ে পড়ল উল্লাসের জোয়ার। কয়েক সেকেন্ডের ছোট্ট ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে বার্লিনের এক ঘুপচি ইন্টারনেট ক্যাফে। একদল পুলিশ ঢুকল, একটু পরে পিছমোড়া করে বেঁধে আনল লুকা ম্যাগনোটাকে। সেই সকালে কম্পিউটারের স্ক্রিনে খবর দেখতে দেখতে ক্যাফের মালিক কাদিরের চোখে পড়ে কানাডিয়ান খুনির গল্প। পড়তে পড়তে চোখ তুলেই দেখেন সামনে অবিকল সেই চেহারা! কোনোমতে ভিরমি খাওয়া আটকে তাকে ক্যাফেতে বসালেন কাদির, তারপর খবর দিলেন পুলিশে। 

কী ভাবছেন? যবনিকা পতন? পিকচার আভি বাকি হ্যায়! কানাডা পুলিশের জেরার সময় দৃশ্যত ভাবলেশহীন, ভীতু ভীতু মুখের লুকা দাবি করে, দিনের পর দিন তার উপর নির্যাতন করে, জোর করে এই কাজ করিয়েছে তার পার্টনার ইম্যানুয়েল (ম্যানি) লোপেজ। লুকার মায়েরও দাবি তার সাদাসিধে ছেলেকে দিয়ে মার্জার, মানুষ দুই-ই খুন করিয়েছে ম্যানি। কিন্তু ম্যানি কে? তার নাম তো একবারও আসেনি তদন্তে। লুকার ইতিহাস ঘেঁটে পাওয়া গেল সেই নাম। ২০১১ সালে লুকা নিউ ইয়র্কের এক আইনজীবীর সঙ্গে দেখা করে ম্যানির অত্যাচারের কথা জানায়, ক্রমান্বয়ে তাকে নির্যাতনের ফিরিস্তি পাঠায়। এরপরে এক ধস্তাধস্তিতে আহত লুকাকে হসপিটালে দেওয়া হলে, সেখানেও সে আক্রমণকারীর নাম জানায় ম্যানি। কিন্তু এত যার নামডাক, তার চেহারা কেউ দেখেনি কখনও?

জন গ্রিন মেনে নিতে পারল না এই দাবি। কিছু একটা খটকা লাগছে, অথচ ঠিক বুঝতে পারছে না। ধাঁ করে মাথায় এল ওই আইনজীবী রোমিও সালতার একটা কথা। চেম্বারে ঢুকেই লুকা প্রথম বলেছিল, “আপনাকে একদম মাইকেল ডগলাসের মতো দেখতে”। ভয়ে, বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেল জন। এতদূর কুচক্রী হতে পারে কেউ? ভিডিও চালিয়ে দেখল তার সন্দেহ ঠিক, লুকার খুনের দৃশ্য প্রায় হুবহু টোকা বিখ্যাত ‘বেসিক ইন্সটিংক্ট’ সিনেমায় শ্যারন স্টোনের খুন করার দৃশ্য থেকে। সিনেমায় শ্যারনের চরিত্রের নাম ক্যাথরিন ট্রামেল, কে. ট্রামেল! আর ক্যাথরিনের নির্যাতনকারী প্রাক্তন সঙ্গীর নাম? ইম্যানুয়েল ম্যানি ভাস্কেজ! 

কেউ নেই, কেউ কোত্থাও নেই। শুধু আছে লুকা ম্যাগনোটা, তার দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া মানসিক স্থিতি আর সিরিয়াল কিলার-প্রীতি নিয়ে। দেড় বছর আগে থেকে যে চিত্রনাট্য সে লিখতে শুরু করেছিল, আজ তার মঞ্চাভিনয়, চারিদিকে ফ্ল্যাশবাল্‌বের মুহুর্মুহু ঝলকানি– এমনটাই তো সে চেয়েছিল। লুকাকে যাবজ্জীবনের সাজা শুনিয়ে আশ্বস্ত হয়েছিল পুলিশ। কিন্তু কোথাও গিয়ে লুকা নিজেও হয়তো আশ্বস্ত হয়েছিল। আর পালানোর তাড়া নেই, প্ল্যানিং নেই। শুধু বদ্ধ কুঠুরির মধ্যে বসে সদ্যোজাত কুখ্যাতি তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করা। 

এই কাহিনি সিনেমার মতো, কিন্তু ঘটনাগুলি ঘোর বাস্তব। সম্প্রতি নেটফ্লিক্সে এই নিয়ে একটি মিনি সিরিজও বানানো হয়েছে। লুকার মতো মানুষ থাকতে পারে আমাদের চারপাশেই, নির্যাতিত শৈশব আর অসুস্থ কৈশোরের শিকার হয়ে। জন-ডিয়ানার মতো কিছু ক্ষুরধার মস্তিষ্ক তবু বারবার আমাদের ভরসা জোগায়। কে বলে ব্যোমকেশ-মিতিনমাসিরা শুধু গল্পেই থাকেন? 



[পোস্টার: অর্পণ দাস]

#বাংলা #নিবন্ধ #ডিটেক্টit #সায়নদীপ গুপ্ত

Leave a comment

All fields are required. Comment will appear after it is approved.

trending posts

newsletter

Connect With Us

today's visitors

41

Unique Visitors

181444